যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই হিজবুল্লাহসহ নিজেদের সমস্ত আঞ্চলিক মিত্রদের এক বৃহত্তর ও সর্বাত্মক সংঘাতের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে বলেছে ইরান। এর ফলে চলমান এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে এবার ইসরাইলেরও সরাসরি জড়িয়ে পড়ার এক তীব্র ও নজিরবিহীন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লেবাননের একটি প্রখ্যাত দৈনিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে এই তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। সম্প্রতি তেহরানে অনুষ্ঠিত তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ফাঁকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাদের সাথে উচ্চপর্যায়ের একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেইসব বৈঠক থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়েই মূলত এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনটি সামনে আনা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক সামরিক জোট ‘প্রতিরোধ বলয়’-এর শীর্ষ নেতারা তাদের মাঠপর্যায়ের সমস্ত মিত্রদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পালা এখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরণের সামরিক সংঘাতের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়াই এখন তাদের প্রধান ও একমাত্র অগ্রাধিকার। সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে দুই পক্ষের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র এক মাস পার হতে না হতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে এই ভয়াবহ লড়াই শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সতর্কবার্তাটি সামনে এল। এখন পর্যন্ত চলমান এই সর্বশেষ সংঘাতে ইসরাইল সরাসরি অংশ নেয়নি এবং তেহরানের পক্ষ থেকেও সরাসরি ইহুদি রাষ্ট্রটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। তবে ইরানের লেবাননভিত্তিক প্রধান ছায়াসঙ্গঠন হিজবুল্লাহ যদি এই লড়াইয়ে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে এবং ইসরাইলি ভূখণ্ডে তাদের রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুনরায় শুরু করে, তবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে ঘুরে যেতে পারে।
অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, যেকোনো চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য হিজবুল্লাহকে বিশেষ সামরিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাত অতীতের যেকোনো লড়াইয়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক, বিধ্বংসী ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী যুদ্ধের মাঠে বেশ কিছু বড় ধরণের সামরিক বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও, তেহরান এখনো লেবাননের হিজবুল্লাহকেই তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। গত ২ মার্চ ইসরাইলের অভ্যন্তরে আকস্মিক হামলা চালিয়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি মূলত এই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছিল। একই সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জেরুজালেম ও বৈরুতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টারও তীব্র বিরোধিতা করে আসছে তারা।
হিজবুল্লাহর ধারাবাহিক এসব হামলার জবাবে ইসরাইলি বিমান বাহিনীও লেবাননের অভ্যন্তরে ভারী ও পাল্টা বিমান হামলা চালায়। শুধু তাই নয়, নিজেদের সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখতে এবং সীমানা থেকে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের দূরে সরিয়ে রাখতে দক্ষিণ লেবাননের একটি বিস্তীর্ণ নিরাপদ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে তুলে নেয় ইসরাইল। এর আগে ২০২৪ সালের এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময়েও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল ইসরাইল। উল্লেখ্য যে, ইরান-সমর্থিত অপর এক প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়েমেনের হুতিরাও এর আগে বিভিন্ন সময়ে ইসরাইলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছিল। সব মিলিয়ে নতুন এই যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য হামলার বার্তাটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক চরম ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল