• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

যে কারণে সোহেলের সঙ্গে স্বপ্নারও মৃত্যুদণ্ড

Reporter Name / ৬ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের দেওয়া এই রায়ের পর একটি আইনি প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছিল—মূল ঘাতক সোহেল রানা নিজের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজে ধর্ষণ, হত্যা ও লাশ খণ্ডবিখণ্ড করার একক দায় নিলেও, স্ত্রী স্বপ্নাকে সরাসরি খুনি হিসেবে উল্লেখ করেননি। জবানবন্দিতে সোহেল শুধু বলেছিলেন, স্বপ্না তাকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন।

তবে ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ জন সাক্ষীর অকাট্য জবানবন্দি, দালিলিক প্রমাণ, জব্দকৃত আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং সর্বোপরি প্রযুক্তির সহায়তায় পাওয়া ভিডিও ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য (Circumstantial Evidence) পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে স্বপ্নার প্রত্যক্ষ অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, অপরাধের দায় স্বীকার না করলেও এই জঘন্যতম অপরাধের প্রতিটি ধাপে স্বপ্না সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন এবং অনুকম্পা পাওয়ার সমস্ত আইনি যোগ্যতা হারিয়েছেন।

বাথরুমের রহস্য ফাঁস রাজুর মোবাইলের ভিডিও ফুটেজে

এই মামলায় স্বপ্নার অপরাধ ও সম্পৃক্ততা প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং অকাট্য দালিলিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে মামলার ৯ নম্বর সাক্ষী এবং ভবনের প্রতিবেশী রাজুর ধারণ করা একটি মোবাইল ভিডিও। ঘটনার দিন সকালে শিশু রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে যখন তার মা-বাবা ও প্রতিবেশীরা সন্দেহবশত সোহেল-স্বপ্নার ফ্ল্যাটের দরজার লক (গোল হাতল) ভেঙে ফেলেন, তখন দরজার সেই গোল ছিদ্র দিয়ে রাজু তাঁর মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ভেতরের দৃশ্য ভিডিও করেন।

ডিজিটাল সেই ভিডিও এভিডেন্সে পরিষ্কার দেখা যায়, দরজার বাইরে যখন রামিসার মা-বাবা বুকফাটা আর্তনাদ করে দরজা খোলার জন্য অনুনয়-বিনয় করছেন, তখন ঘরের ভেতর স্বপ্না খাতুন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বারবার বাথরুমে ঢুকছেন এবং বের হচ্ছেন। বাথরুমের ভেতরেই তখন সোহেল রানা শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ এবং বালতির ভেতর কাটা মাথা লুকাতে ব্যস্ত ছিল এবং রক্ত ধুয়ে আলামত নষ্ট করছিল। এই ভিডিওটি আদালতে প্রমাণ করেছে যে, বাথরুমের ভেতরে চলা পৈশাচিক ঘটনাটি স্বপ্নার সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে এবং তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতেই ঘটছিল।

রায় শুনানিতে আদালতের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ

ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও নজির পর্যালোচনা করে স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পেছনে ৪টি মূল কারণ ও পর্যবেক্ষণ রায়ে উল্লেখ করেছেন:

  • যৌথ অপরাধকালীন উপস্থিতি: সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়ে স্বপ্না খাতুন ফ্ল্যাটের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। এই দুই ঘণ্টার ভেতরেই বাথরুমে ধর্ষণ, গলা কেটে হত্যা ও লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়, যা স্বপ্নার সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না।

  • আর্তনাদ উপেক্ষা ও দরজা না খোলা: ভুক্তভোগী শিশুটির মা-বাবা এবং প্রতিবেশীরা যখন বাইরে থেকে দীর্ঘ সময় ধরে অনবরত চিৎকার ও অনুরোধ করছিলেন, তখন স্বপ্না ইচ্ছে করেই ভেতর থেকে দরজা খোলেননি। দরজা আটকে রেখে তিনি ঘাতক স্বামীকে অপরাধ সম্পন্ন করার ও সময় ক্ষেপণের পূর্ণ সুযোগ করে দিয়েছেন।

  • আলামত বিনষ্টে নীরব ভূমিকা: সোহেল রানা যখন পানি দিয়ে বাথরুম ধুয়ে, নিহত শিশুর পরিধেয় বস্ত্রসহ অন্যান্য আলামত ও রক্ত বিনষ্ট করছিল, তখন স্বপ্না তা প্রতিরোধ করার বা বাধা দেওয়ার কোনো প্রকার চেষ্টাই করেননি। উল্টো আলামত ধ্বংসের এই প্রক্রিয়ায় তিনি নীরব অংশীদার ছিলেন।

  • পালিয়ে যেতে পরামর্শ ও সহায়তা: অপরাধ নিশ্চিত করার পর যখন বাইরে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়, তখন স্বপ্না তাঁর স্বামী সোহেল রানাকে দরজার দিকে না গিয়ে ঘরের জানালার লোহার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার বুদ্ধি দেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে পালাতে প্রত্যক্ষ সহায়তা করেন।

প্রমাণ করার আইনি দায়িত্ব স্বপ্নার ওপরই ছিল

আদালত তাঁর রায়ে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করেন। যেহেতু সোহেল ও স্বপ্নার নিজস্ব বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে ভুক্তভোগী শিশুর মস্তকবিহীন লাশ এবং বালতির ভেতর থেকে কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়েছে, তাই প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের ধারা অনুযায়ী স্বপ্না খাতুনের ওপরই এই আইনি দায়িত্ব বা দায় (Burden of Proof) বর্তায় যে—তিনি প্রমাণ করবেন এই জঘন্যতম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড তাঁর অজান্তে হয়েছে কিংবা এতে তাঁর কোনো হাত ছিল না। কিন্তু স্বপ্না আদালতের কাছে নিজের নির্দোষিতার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

আদালত চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে বলেন, স্বপ্না খাতুন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে প্রথমত ধর্ষণ, দ্বিতীয়ত হত্যাকাণ্ড, তৃতীয়ত লাশ গুমের চেষ্টা, চতুর্থত আলামত বিনষ্ট এবং পঞ্চমত আসামিকে গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে সমপরিমাণ অপরাধ করেছেন। পারিপার্শ্বিক সমস্ত অকাট্য প্রমাণাদি এটিই নিশ্চিত করে যে, স্বপ্না এই ঘৃণ্যতম অপরাধের সমান অংশীদার এবং এই কারণে তাকেও সোহেল রানার মতোই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হলো।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category