ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আক্ষরিক অর্থেই এক যুগের অবসান ঘটেছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতার মসনদে থাকার পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে ক্ষমতা হারিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। শাসক দল থেকে রাতারাতি প্রধান বিরোধী দলের আসনে চলে আসা তৃণমূল কংগ্রেস এখন চরম অস্তিত্বের সংকটে। পরাজয়ের ধাক্কা সামলে ১৮তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং শাসকদল বিজেপির মোকাবিলা করার জন্য বিধানসভার অন্দরে দলের নেতৃত্বে বড়সড় রদবদল এনেছে তৃণমূল কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব।
পরাজয়ের পর দলের ভেতরে যখন বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে, অনেকেই যখন হারের দায় নিয়ে মুখ খুলছেন, ঠিক সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আস্থা রাখলেন তাঁর সবচেয়ে পুরনো, পরীক্ষিত এবং বিশ্বস্ত সেনাপতিদের ওপর। নতুন বিরোধী দলনেতা, উপনেতা এবং চিফ হুইপ নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল স্পষ্ট বার্তা দিল যে—সংকটের এই সময়ে আনুগত্যই দলের সর্বোচ্চ মাপকাঠি।
বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ১৮তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দলনেতার (Leader of the Opposition) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।
এবারের নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের যে শোচনীয় বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে মন্ত্রিসভার অনেক হেভিওয়েট সদস্য এবং ডাকসাইটে নেতারাও নিজেদের কেন্দ্র থেকে পরাজয়ের মুখ দেখেছেন। তবে এই গেরুয়া ঝড়ের মাঝেও নিজের দুর্গ অটুট রেখেছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তিনি কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন।
আনুগত্যের অনন্য নজির: নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর যখন দলের ভেতরেই প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছে, অনেক নেতা-কর্মী যখন প্রকাশ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তখন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিজের একটি পুরোনো ও আবেগঘন ছবি পোস্ট করেন। সেই ছবির ক্যাপশনে এই বর্ষীয়ান নেতা লেখেন—“সঙ্গে ছিলাম, সঙ্গে আছি, সঙ্গে থাকবো।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই একটি মাত্র বাক্য কেবল দলের কর্মীদেরই নয়, স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও এক বড় মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। যখন চারদিকে দলবদলের শঙ্কা বা অন্তর্কলহ মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির বর্ষীয়ান নেতাকে বিরোধী দলনেতা করাটা তৃণমূলের জন্য একটি অত্যন্ত মাস্টারস্ট্রোক। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজ বিধানসভায় বিজেপি সরকারের মোকাবিলায় তৃণমূলকে বাড়তি মাইলেজ দেবে।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির অন্যতম বড় ভিত্তি হলো নারী ভোটব্যাংক এবং নারী নেতৃত্ব। ক্ষমতা হারালেও সেই নীতির জায়গা থেকে সরে আসেনি দলটি। বিরোধী দলনেতার পাশাপাশি বিরোধী দলের ডেপুটি লিডার বা উপনেতা হিসেবে একসঙ্গে দুজন নারীর নাম ঘোষণা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁরা হলেন—অসীমা পাত্র এবং নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিধানসভার মতো একটি জায়গায় যেখানে সরকারি দলের প্রবল আক্রমণের মুখে পড়তে হবে বিরোধীদের, সেখানে সামনের সারিতে দুজন নারী নেত্রীকে তুলে আনার পেছনে তৃণমূলের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল রয়েছে। এর মাধ্যমে দলটি রাজ্যবাসীকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও নারী অধিকার ও সুরক্ষার প্রশ্নে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের আপসহীন অবস্থান থেকে একচুলও নড়েনি। নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অসীমা পাত্র দুজনেই দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিক। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি বিধানসভার ভেতরেও তাঁরা অত্যন্ত সরব ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
বিধানসভায় যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ‘চিফ হুইপ’ বা মুখ্য সচেতকের পদটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দলের বিধায়কদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ভোটাভুটির সময় দলের নির্দেশিকা বা ‘হুইপ’ জারি করা এবং দল ভাঙানোর যেকোনো চেষ্টা নস্যাৎ করার মূল দায়িত্ব থাকে চিফ হুইপের ওপর। এই কঠিন দায়িত্বটি তুলে দেওয়া হয়েছে কলকাতার বর্তমান মেয়র এবং দলের আরেক বর্ষীয়ান নেতা ফিরহাদ হাকিমের কাঁধে।
এবারের নির্বাচনে কলকাতার বন্দর (Kolkata Port) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে লড়াই করেছিলেন ফিরহাদ হাকিম এবং সেখানে তিনি স্বমহিমায় জয়লাভ করেছেন। তবে তাঁর এই দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বড় রাজনৈতিক নাটক।
কন্যার বিদ্রোহ বনাম পিতার আনুগত্য: তৃণমূল কংগ্রেসের এই চরম পরাজয়ের পর দলের বিরুদ্ধে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন। সবচেয়ে বড় চমকটি আসে খোদ ফিরহাদ হাকিমের পরিবার থেকে। তাঁর নিজ কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম দলের কিছু নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করে দলের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। বিরোধী শিবির যখন এই পারিবারিক দ্বন্দ্বকে তৃণমূলের ভাঙনের প্রমাণ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে, তখন ফিরহাদ হাকিম কিন্তু একদম নীরব ছিলেন। দলের বিরুদ্ধে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
কন্যার বিদ্রোহ সত্ত্বেও দলনেত্রীর প্রতি ফিরহাদ হাকিমের এই অবিচল আনুগত্য প্রমাণ করে যে তিনি দলের কত বড় অনুগত সৈনিক। তাই এবার বিরোধী আসনে বসলেও বিধানসভায় নিজেদের বিধায়কদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই বিশ্বস্ত নেতার ওপরই সবচেয়ে বেশি ভরসা রেখেছেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটপ্রাপ্তির হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তৃণমূল কংগ্রেস খুব একটা পিছিয়ে ছিল না, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মার্জিনের কারণেই তাদের ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে।
বিজেপি (BJP): এবারের নির্বাচনে গেরুয়া শিবির ৪৫.৮৪ শতাংশ বিপুল ভোট পেয়ে রাজ্যের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস (TMC): ৪০.৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে তারা।
সিপিএম (CPM) ও বামফ্রন্ট: মাত্র ৪.৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তলানিতে ঠেকেছে বামেরা।
কংগ্রেস (Congress): মাত্র ২.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব প্রায় হারিয়ে ফেলেছে ভারতের এই প্রাচীন রাজনৈতিক দলটি।
অন্যান্য: নির্দল ও অন্যান্য ছোট দলগুলো পেয়েছে ৪.২৬ শতাংশ ভোট।
পরিসংখ্যান বলছে, বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে ভোটের পার্থক্য মাত্র ৫.০৪ শতাংশ। এই ৫ শতাংশ ভোটের সুইং বা মেরুকরণই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বাম এবং কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক পুরোপুরি শূন্য হয়ে সেই ভোট বিজেপির বাক্সে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণেই তৃণমূলকে এই পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
১৫ বছর ধরে যারা সরকার চালিয়েছে, তাদের জন্য বিরোধী বেঞ্চে বসে রাজনীতি করাটা সম্পূর্ণ একটি নতুন অভিজ্ঞতা। এখন আর তাদের হাতে পুলিশ বা প্রশাসন নেই। এখন তাদের একমাত্র হাতিয়ার জনমত এবং বিধানসভার ফ্লোরে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক।
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং ফিরহাদ হাকিমের ওপর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলের ৪০.৮০ শতাংশ ভোটারের আস্থা ধরে রাখা এবং দলের ভেতরে যেন কোনো ধরনের ভাঙন বা ‘অপারেশন লোটাস’ সফল হতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। দলের অনেক সুবিধাবাদী নেতা যারা ক্ষমতার মধু খেতে তৃণমূলে এসেছিলেন, তাঁরা হয়তো আগামী দিনে দল ছাড়ার চেষ্টা করবেন। সেই কঠিন সময়ে দলের আদর্শকে টিকিয়ে রেখে, কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়াই হবে তৃণমূলের এই নবগঠিত পরিষদীয় দলের প্রধান লক্ষ্য। বাংলার মানুষ এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে, বিরোধী আসনে বসে তৃণমূল কংগ্রেস কতটা দায়িত্বশীল এবং আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম