দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল পুনরুজ্জীবন তহবিল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের বন্ধ কারখানা সচল করার সুযোগ পাবেন বলে জানা গেছে।
তহবিলের রূপরেখা ও সুদের হার
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অনিবার্য কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু তারা ঋণ পরিশোধে আগ্রহী, মূলত তারাই এই তহবিল থেকে স্বল্প সুদে কার্যকরী মূলধন ঋণ সুবিধা পাবে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ঋণের সুদের হার ১৩ শতাংশের কাছাকাছি নির্ধারণ করা হতে পারে। এর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ভর্তুকি যুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সম্ভাবনা
চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কারখানা পুনরুজ্জীবন তহবিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে। এর আগে, মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক শ্রমিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
নীতিমালা প্রণয়ন ও তালিকা তলব
তহবিল গঠনের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের অধীনে থাকা বন্ধ ও আংশিক বন্ধ কারখানার হালনাগাদ তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে, তাদের তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত এবং পুনরায় চালু হওয়ার সক্ষমতা থাকা কারখানাগুলোকে কীভাবে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়, তা নিয়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে। আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত নীতিমালা তৈরি করেই এই তহবিল গঠন করা হবে।”
ব্যাংকারদের শর্ত ও গ্যারান্টির দাবি
এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। বৈঠকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা শনাক্তের বিষয়ে ব্যাংকারদের মতামত চাওয়া হয়।
তবে ব্যাংকাররা এই ধরনের ঋণের ঝুঁকি কমাতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি চেয়েছেন, যাতে ঋণ দেওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান পুনরায় খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো ক্ষতিপূরণ পায়। পাশাপাশি নতুন ঋণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জামানত রাখা এবং প্রকল্পের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্বাধীন পরামর্শক বা পর্যবেক্ষক নিয়োগের প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা।
প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও কারখানার জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল নীতি চালু করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই বিশাল তহবিল গঠনের উদ্যোগকে সেই ধারাবাহিকতারই একটি বৃহৎ ও কার্যকর সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা দেশের রুগ্ণ শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।