• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৪:২৬ অপরাহ্ন
Headline
হাওরের বুক চিরে কৃষকের বোবাকান্না: অসময়ের ঢলে তলিয়ে গেল হাজার কোটি টাকার সোনালি স্বপ্ন ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে দেশের অর্থনীতি: ভুল নীতি ও অস্বচ্ছ চুক্তির দায় কার? বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা শুরু: কবে চূড়ান্ত দল ঘোষণা করবে ৪৮ দেশ? ড. ইউনূস সরকারের সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট ফের বিয়ের পিঁড়িতে ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা রোগী বাড়ছে, চিকিৎসক নেই: জনবল ও ওষুধ সংকটে ধুঁকছে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট রুগ্‌ণ শিল্পে প্রাণ ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মেগা পরিকল্পনা চ্যানেল ওয়ানের প্রত্যাবর্তন ও প্রাসঙ্গিকতার সংকট: দর্শক কি আর লোগোয় বিশ্বাস করে? কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মসলার বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: পর্যাপ্ত সরবরাহ সত্ত্বেও হু হু করে বাড়ছে দাম আগে দিল্লি না বেইজিং? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জোর জল্পনা

হাওরের বুক চিরে কৃষকের বোবাকান্না: অসময়ের ঢলে তলিয়ে গেল হাজার কোটি টাকার সোনালি স্বপ্ন

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে যেদিকে চোখ যায়, কেবলই থইথই পানি। অথচ এই প্রান্তরজুড়ে এখন থাকার কথা ছিল সোনালি ধানের ঢেউ। বৈশাখের এই সময়টায় কৃষকের উঠোনে ওঠার কথা ছিল নতুন ধান, বাতাসে ভাসার কথা ছিল নতুন চালের ম-ম গন্ধ। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম খেয়ালে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। অসময়ের টানা প্রবল বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বৃহত্তর হাওর অঞ্চল এখন এক বিশাল মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে—যেখানে মানুষের মৃত্যু না হলেও, মৃত্যু হয়েছে লাখো কৃষকের হাজার কোটি টাকার সোনালি স্বপ্নের।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাতটি জেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার অন্তত এক হাজার কোটি টাকার বোরো ধান এখন পানির নিচে পচছে। কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে নীরব হাহাকার। সারা বছরের একমাত্র অবলম্বন এই বোরো ধান চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে কৃষকরা বাকরুদ্ধ। তারা না পারছেন সইতে, না পারছেন কাউকে বলতে। চারদিকে কেবলই শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাস।

ফসল হারানোর শোকে কৃষকের মৃত্যু: এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি

হাওরের এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক এবং মর্মান্তিক চিত্রটি দেখা গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায়। চোখের সামনে নিজের ঘামে ভেজা স্বপ্নের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের কৃষক আহাদ মিয়া (৫৬)। এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছয় বিঘা জমিতে ব্রি-২৯ ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি। শনিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটতে গিয়ে দেখেন, তার সারা বছরের বেঁচে থাকার সম্বল পুরোপুরি পানির নিচে। এই মর্মান্তিক দৃশ্য সইতে না পেরে জমির আইলেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

তার মৃত্যু কেবল একজন কৃষকের মৃত্যু নয়, এটি যেন পুরো হাওর অঞ্চলের কৃষকদের বর্তমান মানসিক অবস্থার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। একই এলাকার আরও অনেক কৃষক ফসলের এই পরিণতি দেখে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সুনামগঞ্জে হাহাকার: ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি ও প্রকৃতির বিরূপ আচরণ

দেশের সবচেয়ে বড় হাওর অধ্যুষিত জেলা সুনামগঞ্জে এখন কান্নার রোল। এই একটি জেলাতেই প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বোরো ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্যমতে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, এর আগে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে আরও দুই হাজার হেক্টর।

সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় এ বছর দুই লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল বোরো ধান। আশা ছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হবে। কিন্তু সব আশায় গুড়ে বালি। ফেনারবাঁক গ্রামের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী ছলছল চোখে বলেন, “খুব কষ্ট করে ৩৬ কিয়ার জমি করেছিলাম। আজ প্রথম কোমর পানিতে কাঁচি লাগিয়েছি। কিছু জমি তলিয়ে গেছে, এই কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারিনি। সারা বছর সংসার চালানো, বাচ্চাদের পড়ালেখা, কাজের লোকের বেতন—সব মিলিয়ে আমি এখন দিশেহারা। নির্ঘুম রাত কাটছে আমার।”

সুনামগঞ্জে এবার দুর্যোগের মূল কারণ অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। মার্চ মাসে সাধারণত ৫০-৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও এবার হয়েছে ২৫৪ মিলিমিটার। আর এপ্রিলে ২৮৭ মিলিমিটারের জায়গায় বৃষ্টি হয়েছে ৩৮৯ থেকে ৪৪২ মিলিমিটার পর্যন্ত। এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে হাওরে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হারভেস্টার মেশিন পানিতে নামতে পারছে না। তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষক বাধ্য হয়ে ছোট নৌকা নিয়ে কোমর পানিতে নেমে আধাপাকা ধান কাটছেন।

ক্ষুধার জ্বালা ও সুপেয় পানির হাহাকার: কিশোরগঞ্জের চরম মানবিক বিপর্যয়

কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, চামড়া বন্দর এলাকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। ফসল তো গেছেই, এখন সেখানে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট। ইটনার চৌগাংগা গ্রামের হাওরপাড়ে বসে থাকা রাবিয়া বেগমের গল্পটি যেকোনো পাষাণ হৃদয়কেও নাড়িয়ে দেবে। স্বামী পাঁচ দিন ধরে হাওরে ফসল বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন। আর ঘরে তিন দিন ধরে চুলা জ্বলছে না। রাবিয়া বেগমের দেড় বছরের শিশু বিলকিস আক্তার ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে। মায়ের বুকেও দুধ নেই।

একই অবস্থা কৃষক আলাউদ্দিন ও হাবিবুর রহমানের। ঘরে খাবার নেই, পকেটে থাকা শেষ সম্বলটুকু দিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকদের। হাবিবুর রহমান পাঁচ টাকা দিয়ে একটি বনরুটি খেয়ে সারাদিন কোমর পানিতে ধান কেটেছেন। তাদের কাছে এখন নিজেদের পেটের ক্ষুধার চেয়ে আধাপাকা ধানগুলো বাঁচানোর তাগিদ অনেক বড়।

মিঠামইনের খিদিরপুর হাওরের কৃষক আঙ্গুর মিয়া ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বলেন, “সরকার বলছে আমাদের তিন মাসের খাবার দেবে। কিন্তু খাবারটা কখন দেবে? আমরা মরে গেলে? ঘরে এক ছটাক চাল নেই, কেউ বাকিতে সদাইও দিচ্ছে না। আমাদের এখন তাৎক্ষণিক খাবার দরকার।”

এরই মধ্যে হাওরের পানিতে পচা ধান ও খড়ের তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে যে সামান্য ধান কেটে আনা সম্ভব হয়েছে, তা-ও শুকানো যাচ্ছে না। ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা ধানেই চারা গজিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে পচা গন্ধ আর ক্ষুধার জ্বালায় মানুষগুলো এখন উন্মাদপ্রায়।

নেত্রকোনার ৩১৩ কোটি টাকার ক্ষতি এবং অপরিকল্পিত বাঁধের খেসারত

নেত্রকোনা জেলার হাওরগুলোতেও ক্ষতির চিত্র ভয়ংকর। জেলার ১০টি উপজেলায় প্রাথমিক জরিপে অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। পানিতে তলিয়ে গেছে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ধান।

তবে নেত্রকোনার কৃষকদের অভিযোগ, প্রকৃতির পাশাপাশি এই বিপর্যয়ের জন্য অপরিকল্পিত অবকাঠামোও সমানভাবে দায়ী। কৃষকরা বলছেন, হাওরে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বাঁধ এবং পলি জমে পানিনিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। বেশির ভাগ স্লুইসগেট অকেজো। অন্যান্য বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ‘জিরাতি’ শ্রমিকরা ধান কাটতে এলেও, এবার হারভেস্টারের ওপর অতি নির্ভরশীলতার কারণে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

হাকালুকি থেকে নান্দাইল: সর্বত্রই এক চিত্র

মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরপাড়ে এখন চলছে ‘ফসল বাঁচানোর যুদ্ধ’। কৃষকরা লোকসান মেনে নিয়েই সম্পূর্ণ কাঁচা ও আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তুলছেন। বড়লেখা উপজেলায় অবিরাম বৃষ্টি ও বজ্রপাত উপেক্ষা করে কৃষকরা নৌকায় করে ধান পরিবহন করছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কৃষকদের আগাম সতর্ক করায় তারা ৮০ শতাংশ জমির আধাপাকা ধান কেটে নিয়েছেন, তবুও যা ক্ষতি হয়েছে তা প্রান্তিক কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অন্যদিকে, ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল এবং টাঙ্গাইলের মধুপুরে নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ জমির ধান তলিয়ে গেছে। নান্দাইলের কৃষকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন ও ছোট বাঁধ দিয়ে মাছ ধরার কারণে পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। মধুপুরের বিখ্যাত হাওদা বিলের ৫০০ বিঘা জমির ফসল এখন পানির নিচে। এই এলাকার কৃষকরা বছরে একবারই ফসল ফলান, আর সেই ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ঋণগ্রস্ত কৃষকদের ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অন্ধকারে।

ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই সমাধান ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা

অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতি বছরই কেন কৃষকদের এমন নিঃস্ব হতে হবে? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার এই চরম বিরূপ আচরণ হয়তো মানুষের হাতে নেই। কিন্তু অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন না করা, পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ করে ফিশারি তৈরি করা—এগুলো তো সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট।

সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাসের প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তালিকা তৈরির কাজও শুরু করেছে। কিন্তু লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেরিয়ে এই সাহায্য কৃষকের হাতে পৌঁছাতে যে সময় লাগবে, ততদিনে হাওরের অনেক ঘরেই হয়তো অনাহারে প্রাণ যাবে।

হাওরের কৃষকরা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিশাল অবদান রাখেন। আজ যখন তারা প্রকৃতির নির্মম রোষানলে পড়ে সর্বস্বান্ত, তখন রাষ্ট্রকে শুধু প্রণোদনার আশ্বাস দিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তাদের জন্য এখনই জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, সুপেয় পানি এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে আগামী দিনে এই দুর্যোগ থেকে বাঁচতে হাওর ব্যবস্থাপনায় একটি দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং টেকসই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কৃষকের এই বোবাকান্না যদি আমরা শুনতে না পাই, তবে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বুনিয়াদ অচিরেই ধসে পড়বে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category