মাঠে ৯০ মিনিটের ফুটবল রোমাঞ্চের আড়ালে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে পর্দার আড়ালে চলছে এক বিশাল ও অভূতপূর্ব টাকার খেলা। ট্রফি জয়ের গৌরব তো রয়েছেই, কিন্তু উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে শুরু হওয়া ৪৮ দলের এই মেগা টুর্নামেন্টে আসল সংখ্যার খেলাটি চলছে মাঠের বাইরে। এবারের আসরে ফুটবলকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য, স্পনসরশিপের পিরামিড কাঠামো এবং বহুজাতিক স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রাসী বিপণন যুদ্ধ। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কাগজে-কলমে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও এই টুর্নামেন্ট থেকে তাদের আয়ের অংক এবং বাণিজ্যিক মুনাফা শিকারের কৌশল বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এবারের আসরে বিশ্ব ফুটবলের মাঠ কাঁপানো ৪৮টি দলের মধ্যে ৩৮টি দলেরই জার্সির স্পনসর হিসেবে নিজেদের কবজায় রেখেছে বিশ্ববিখ্যাত তিন ব্র্যান্ড—অ্যাডিডাস, নাইকি এবং পুমা। অর্থাৎ, টুর্নামেন্টের প্রায় ৮০ শতাংশ দলের গায়েই জড়িয়ে রয়েছে এই তিনটি কোম্পানির লোগো। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে অ্যাডিডাস, যারা আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন ও স্বাগতিক মেক্সিকোসহ রেকর্ড ১৪টি বড় দলের জার্সির স্পনসর। শুধু তা-ই নয়, ফিফার অফিশিয়াল পার্টনার হিসেবে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ও মাঠের বিজ্ঞাপনের একচেটিয়া অধিকার ধরে রাখতে তারা চার বছরের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ঢালছে। অন্যদিকে, স্বাগতিক আমেরিকার নিজস্ব বাজারে তীব্র চাপে থাকা নাইকি ব্রাজিল, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো ১২ থেকে ১৩টি পরাশক্তি দলের স্পনসরশিপ ধরে রেখেছে; যার মধ্যে কেবল ব্রাজিলের সাথেই তাদের বার্ষিক ১০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে যা ২০৩৮ সাল পর্যন্ত চলবে। এই দুই জায়ান্টের ভিড়ে পুমা ১১টি দলের স্পনসরশিপ নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে, যাদের সবচেয়ে বড় চাল ছিল পর্তুগালকে নাইকি থেকে নিজেদের শিবিরে ভেড়ানো।
ফিফার স্পনসরশিপের বাণিজ্যটি মূলত একটি পিরামিড কাঠামোর মতো কাজ করে। এই পিরামিডের একদম চূড়ায় বা শীর্ষ স্তরে রয়েছে সাতটি বৈশ্বিক কোম্পানি—অ্যাডিডাস, কোকাকোলা, আরামকো, হুন্দাই-কিয়া, ভিসা, কাতার এয়ারওয়েজ এবং লেনোভো, যারা ফিফার সব ধরনের ইভেন্টে স্থায়ী পার্টনার হিসেবে প্রত্যেকে কমপক্ষে ৯৫ মিলিয়ন ডলার করে প্রদান করে। এর নিচের স্তরে কেবল ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য যুক্ত হয়েছে বার্ডওয়াইজার, ম্যাকডোনাল্ডস, ব্যাংক অব আমেরিকা, ইউনিলিভার এবং ভেরিজনের মতো ব্র্যান্ডগুলো, যাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৫ থেকে ৯৫ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে শুধু স্পনসরশিপ খাত থেকেই ফিফার পকেটে ঢুকছে আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি।
এবারের আসরে ফিফার প্রাইজমানির পরিমাণও অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৮৭১ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের মাত্র ৪০ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় এক বিশাল লাফ। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিজয়ী দল এককভাবে পাবে ৫৩.৫ মিলিয়ন ডলার এবং রানার্স-আপ দল পাবে ৩০ মিলিয়নেরও বেশি। এমনকি গ্রুপ পর্বের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোর জন্যও সাড়ে ১২ মিলিয়ন ডলার নিশ্চিত করা হয়েছে, যার সাথে প্রস্তুতির জন্য আরও দেড় মিলিয়ন ডলার যুক্ত থাকায় প্রতিটি দলের ন্যূনতম প্রাপ্তি দাঁড়াচ্ছে ১৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। তবে এই বিপুল অর্থ সরাসরি ফুটবলারদের পকেটে যায় না; ফিফা তা প্রদান করে নিজ নিজ দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে। দেশভেদে ফুটবলাররা এই টাকার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বোনাস হিসেবে পেলেও অনেক দেশে এই অর্থ বণ্টন নিয়ে অতীতে বড় ধরনের বিবাদ ও অসন্তোষ তৈরি হতে দেখা গেছে।
সবচেয়ে চোখ কপালে তোলার মতো কাণ্ড ঘটছে বিশ্বকাপের টিকিট বাজার এবং সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে। ২০২৬ আসর থেকে ফিফার মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.৯ বিলিয়ন ডলার, যার বিপরীতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় মাত্র ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ সরাসরি নিট লাভ থাকছে ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। সম্প্রচার স্বত্ব থেকে ৩.৯ বিলিয়ন এবং টিকিট ও আতিথেয়তা খাত থেকে আসবে ৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ ফাইনাল ম্যাচের একটি অফিশিয়াল টিকিটের সর্বোচ্চ দাম রাখা হয়েছে ১০,৯৯০ ডলার। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, ফিফার নিজস্ব অফিশিয়াল রিসেল বা পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে ফাইনালের টিকিট ২ লাখ ৩০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে, যা সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নাগালের বাইরে। শুধু তা-ই নয়, এই পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থা থেকে উভয় পক্ষের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ করে কর কমিশন নিয়ে ফিফা নিজেই টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি থেকে ফায়দা লুটছে বলে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির অ্যাটর্নি জেনারেলরা সংস্থাটির বিরুদ্ধে আইনি তদন্ত শুরু করেছেন।
ফিফার এই বিপুল অর্থলিপ্সার বিপরীতে চরম আর্থিক বৈষম্য ও লোকসানের শিকার হচ্ছে স্বাগতিক ও আয়োজক শহরগুলো। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৬৬ সালের পর থেকে ১৪টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১২টিরই আয়োজক দেশগুলো শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে গড় রিটার্ন ছিল মাইনাস ৩১ শতাংশ। এবারও আমেরিকার শহরগুলো নিজেদের পকেট থেকে নিরাপত্তা, লজিস্টিক ও অবকাঠামো খাতের শত শত কোটি ডলারের খরচ বহন করলেও ফিফা কর ছাড়ের সুবিধা ভোগ করে সব রাজস্ব নিজের তহবিলে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তীব্র গরমের কারণে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যে ৩ মিনিটের বাধ্যতামূলক ‘ড্রিংকস ব্রেক’ বা পানীয় বিরতির মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেখানেও সম্প্রচারকারীদের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দিয়ে বিজ্ঞাপনী মুনাফা তোলার নতুন রাস্তা বানিয়েছে ফিফা। ২০১৬ সালে ইনফান্তিনো যখন ফিফার সভাপতি হন, তখন সংস্থাটির চার বছরের আয় ছিল ৬ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান সাইকেলে ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং তাদের রিজার্ভ ফান্ড এক বিলিয়ন থেকে বেড়ে চার গুণ হয়েছে। ফরচুন ম্যাগাজিনের মতো বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা বর্তমানে একটি অলাভজনক ক্রীড়া সংস্থার চেয়েও একটি একচেটিয়া রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্টেলের মতো আচরণ করছে, যেখানে মাঠের আসল কারিগর ও দর্শকদের চেয়ে বাণিজ্যিক মুনাফাই শেষ কথা।