এপ্রিলের তপ্ত রোদে পুড়ছে বাংলাদেশ। বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহেই তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। শহরে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও গ্রামে বিদ্যুৎ থাকছে না ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত। বিএনপি সরকারের জন্য এই বিদ্যুৎ সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একদিকে জনরোষ, অন্যদিকে অর্থনীতির স্থবিরতা—সব মিলিয়ে লোডশেডিংই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।
বিদ্যুৎ ঘাটতির বাস্তব চিত্র:
সরকারি বনাম বেসরকারি হিসাব: সরকারি হিসাব বলছে ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ঘাটতি ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
ভয়াবহ পরিস্থিতি: যশোরে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। মাগুরায় ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৮ মেগাওয়াট।
ঢাকায় রেশনিং: বিশেষ করে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কি কেবলই কারিগরি সিদ্ধান্ত নাকি জনরোষ কমানোর রাজনৈতিক কৌশল?
সংকটের মূল কারণ:
জ্বালানি ও অর্থের অভাব: সরকার বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং কয়লার দাম বাড়ায় সরকারের কাঁধে চেপেছে বিপুল ভর্তুকির বোঝা। চলতি অর্থবছরের ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কুলাচ্ছে না, জুন পর্যন্ত আরও ১৯ হাজার কোটি টাকা দরকার।
বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ: জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ এবং ৫০টির উৎপাদন কমে গেছে।
ডলার সংকট ও অতিরিক্ত ব্যয়: ডলারের সংকট এবং ওপেন টেন্ডারে চড়া দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে শুধু এলএনজিতেই গত এক মাসে অতিরিক্ত ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি কোষাগারের শূন্যতা।
কারিগরি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা:
কারিগরি ত্রুটি: সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে কারিগরি ত্রুটির কারণে। বড়পুকুরিয়ায় পাথর মিশ্রিত কয়লা ব্যবহারের ফলে যন্ত্র ভেঙে এই কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
আমলাতন্ত্রের বেড়াজাল: সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় ২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ দিলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে—পায়রা, রামপাল ও পটুয়াখালীর মতো বড় তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই টাকা ব্যবহার করা যাবে না। কারণ হিসেবে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন না থাকার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব:
জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তা আসলে সারা দেশের মানুষের ক্ষোভের প্রতিফলন। তিতাস গ্যাস ফিল্ডের গ্যাস সারা দেশে গেলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষই গ্যাস পাচ্ছে না। গ্রাম ও মফস্বলে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, বেকারত্ব বাড়বে। আর এর সব দায় শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ওপরই আসবে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ:
যদিও সরকার মে মাসের শুরুতে পরিস্থিতির উন্নতির আশা দিচ্ছে, কিন্তু জুন পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান না হলে এই ভোগান্তি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই বিশাল অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে বর্তমান সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করেছে, যেখানে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান গ্রীষ্মের দাবদাহ আর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের জন্য এটি একটি ‘অ্যাসিড টেস্ট’। তিনি কি পারবেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অর্থ সংকট কাটিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে? নাকি এই লোডশেডিংই বর্তমান প্রশাসনের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে?