• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০০ অপরাহ্ন
Headline
বিশ্বকাপে যেতে না পারা বেনিন এবার মেসির শেষ প্রতিপক্ষ ত্রিশ বছর পূর্তিতে পিকাচুর ৩০ রূপ গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে : মাহ্দী আমিন হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বিস্তার করছে ভারত: রিজভী মক্কায় হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়: জামায়াত আমির মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আইসিটিতে অভিযোগ একনেকে ১২ প্রকল্প অনুমোদন, ব্যয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোতে স্বাস্থ্য সহযোগিতা জোরদারে ৪ অগ্রাধিকার তুলে ধরলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাম উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু, মোট ১০৪৪ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই, ২৪ ঘণ্টায় ৭ মৃত্যু

শস্যে লোকসান, কৃষকের নতুন ভরসা এখন গবাদিপশু ও মৎস্য খাত

Reporter Name / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির চিরায়ত মেরুদণ্ড হিসেবে যুগ যুগ ধরে শস্য উৎপাদনকে বিবেচনা করা হলেও, মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প বলছে। ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎপাদনের চেয়ে বর্তমানে কৃষকের টিকে থাকার মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে গবাদিপশু পালন এবং মৎস্য চাষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ইনকাম অ্যান্ড প্রডাক্টিভিটি অব স্মল স্কেল ফুড প্রডিউসারস সার্ভে ২০২৫’ এবং ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্রামীণ আয়ের এক অভাবনীয় ও কাঠামোগত পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দেশের আটটি বিভাগেই শস্য খাত থেকে কৃষকের বার্ষিক নিট আয় রীতিমতো তলানিতে এসে ঠেকেছে, যার বিপরীতে কয়েক গুণ বেশি আয় আসছে প্রাণী ও মৎস্যসম্পদ খাত থেকে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক আয়ের এই চরম বৈষম্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিভাগগুলোর দারিদ্র্যের হারের ওপর, যেখানে বরিশাল ও রংপুর বিভাগ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের মধ্যে শস্য খাত থেকে কৃষকের বার্ষিক নিট আয় সবচেয়ে বেশি খুলনা বিভাগে, যার পরিমাণ মাত্র ১৫,৫৬৭ টাকা। আর সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা ময়মনসিংহ বিভাগে। ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে একজন কৃষকের শস্য থেকে বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৫,৩৭৫ টাকা, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। মাসিক হিসাবে এই আয় এতটাই নগণ্য যে, কেবল ফসল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে কোনো কৃষক পরিবারের পক্ষেই ন্যূনতম জীবনধারণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রাজশাহী (১১,৯৪৫ টাকা) এবং রংপুর (১০,২৪৫ টাকা) বিভাগ শস্য আয়ে কিছুটা সম্মানজনক অবস্থানে থাকলেও তা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। সিলেট (৯,৪৫৩ টাকা), চট্টগ্রাম (৯,৩১৪ টাকা), ঢাকা (৮,১৯৮ টাকা) এবং বরিশালের (৬,০৮১ টাকা) চিত্র প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে সনাতন ধারার ফসল চাষাবাদ এখন কৃষকের জন্য একটি চরম অলাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে।
শস্য খাতের এই নিদারুণ হতাশার বিপরীতে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানোর মূল অবলম্বন হয়ে উঠেছে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন। বিবিএসের তথ্য বলছে, প্রতিটি বিভাগেই শস্যের তুলনায় প্রাণিসম্পদ থেকে কৃষকের আয় বিস্ময়কর রকমের বেশি। রাজধানী ঘেঁষা ঢাকা বিভাগে প্রাণিসম্পদ থেকে কৃষকের বার্ষিক নিট আয় সর্বোচ্চ ৮৫,৪৭৫ টাকা। মজার ব্যাপার হলো, শস্য উৎপাদনে দেশের তলানিতে থাকা ময়মনসিংহ বিভাগ প্রাণিসম্পদ থেকে আয়ের ক্ষেত্রে ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই বিভাগে প্রাণী থেকে কৃষকের বার্ষিক নিট আয় ৭৮,৫৬৩ টাকা। একইভাবে রাজশাহী (৭৫,১২৬ টাকা) এবং খুলনা (৭২,৫১৬ টাকা) বিভাগেও গবাদিপশু পালন গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারাই বদলে দিয়েছে। সিলেট (৬৮,১৯৫ টাকা) এবং রংপুর (৬৬,৭৬৬ টাকা) বিভাগেও প্রাণিসম্পদ থেকে সন্তোষজনক আয় আসছে। এমনকি তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা বরিশাল (৫১,৯৭৪ টাকা) এবং চট্টগ্রাম (৪৯,০৯১ টাকা) বিভাগেও শস্যের তুলনায় প্রাণিসম্পদ থেকে আয়ের ব্যবধান পাঁচ থেকে আট গুণেরও বেশি। এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গবাদিপশু পালনই এখন প্রান্তিক কৃষকের অর্থনৈতিক সুরক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল।
মৎস্যসম্পদ থেকে আয়ের ক্ষেত্রে দেশের ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় খুলনা বিভাগ এই খাতে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করেছে। চিংড়ি ও আধুনিক ঘের ব্যবসার কারণে খুলনা বিভাগে মৎস্য খাত থেকে একজন কৃষকের বার্ষিক নিট আয় সর্বোচ্চ ৮২,২৬৩ টাকা। অন্যদিকে পুকুরে বাণিজ্যিক মাছ চাষে নীরব বিপ্লব ঘটানো রাজশাহী বিভাগ ৬৮,১৮০ টাকা আয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ঢাকা বিভাগেও (৫৮,০৫৫ টাকা) মৎস্য চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে দেশের নদীমাতৃক ও হাওর অঞ্চলগুলোতে। হাওরবেষ্টিত সিলেট বিভাগে মৎস্য থেকে বার্ষিক নিট আয় দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন, মাত্র ২৪,৩১৩ টাকা। নদীমাতৃক বরিশাল বিভাগেও এই আয় মাত্র ২৮,৯১০ টাকা, এবং চট্টগ্রামে তা ৩১,৩৩৮ টাকা। প্রাকৃতিকভাবে জলাশয়ে ভরপুর থাকার পরও সিলেট ও বরিশালে মৎস্যসম্পদ থেকে এত কম আয় মূলত বাণিজ্যিক চাষাবাদের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতিকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
কৃষকের এই খাতভিত্তিক আয়ের সঙ্গে প্রতিটি বিভাগের সার্বিক দারিদ্র্যের হারের এক গভীর ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বিবিএসের ২০২২ সালের দারিদ্র্য মানচিত্র অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপীড়িত বিভাগ হলো বরিশাল, যেখানে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ ২৬.৬ শতাংশ। বরিশালের এই চরম দারিদ্র্যের পেছনের কারণ তাদের আয়ের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। এই বিভাগে শস্য থেকে আয় মাত্র ৬,০৮১ টাকা, এবং প্রাকৃতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার পরও মৎস্যসম্পদ থেকে আয় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (২৮,৯১০ টাকা)। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ খাতেও তাদের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। আয়ের কোনো খাতেই শক্ত অবস্থান না থাকায় বরিশাল আজ দারিদ্র্যের চরম কশাঘাতে পিষ্ট।
দারিদ্র্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ, যার হার ২৫.০ শতাংশ। মৎস্য খাত থেকে রংপুরের আয় তুলনামূলক কম (৩৯,৭৩৭ টাকা), এবং অন্যান্য খাতেও তারা খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। ময়মনসিংহ বিভাগে দারিদ্র্যের হার ২২.৬ শতাংশ, যার অন্যতম প্রধান কারণ শস্য খাত থেকে তাদের দেশীয় সর্বনিম্ন আয়। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য দেখানো রাজশাহী (১৬.৩ শতাংশ) এবং খুলনা (১৯.১ শতাংশ) বিভাগে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সবচেয়ে কম দারিদ্র্যের হার চট্টগ্রাম বিভাগে (১৫.২ শতাংশ)। তবে চট্টগ্রামে কৃষিজাত আয় তুলনামূলক কম হওয়ার পরও দারিদ্র্য হার সর্বনিম্ন হওয়ার মূল কারণ হলো এই অঞ্চলের মানুষের প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স এবং অকৃষি বাণিজ্যিক খাতের ওপর প্রবল নির্ভরতা। ঢাকা বিভাগেও (১৯.৬ শতাংশ) শিল্প ও সেবা খাতের বিস্তারের কারণে দারিদ্র্য একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে আছে।
এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, কেবল গতানুগতিক ধান বা পাট চাষের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য দূর করার চিরায়ত নীতি এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। বিবিএসের এই পরিসংখ্যান নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জোরালো সতর্কবার্তা। কৃষককে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে স্থায়ীভাবে বের করে আনতে হলে কৃষি ভর্তুকি ও প্রণোদনার সিংহভাগ এখন প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে বিনিয়োগ করা অপরিহার্য। বিশেষ করে বরিশাল, সিলেট ও রংপুরের মতো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যিক খামার ও আধুনিক মৎস্য চাষের প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা না গেলে অঞ্চলভিত্তিক এই অর্থনৈতিক বৈষম্য অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
তখ্যসূত্র: বণিকবার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category