দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা প্রশাসকদের দক্ষ করে গড়ে তোলার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি বা নায়েম এখন নিজেই প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির এক বিশাল আখড়ায় পরিণত হয়েছে| শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সর্বশেষ এক চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদনে এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে চলমান সীমাহীন লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে| গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২১-২২ থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত—টানা পাঁচ বছরের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম গভীরভাবে নিরীক্ষা করে দুর্নীতির এই মহাকাব্য তুলে ধরা হয়েছে| প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা থেকে শুরু করে সরকারি অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার, হোস্টেল ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক খাত থেকে প্রাপ্ত আয় আত্মসাৎ, অভ্যন্তরীণ মজুত ব্যবস্থাপনা এবং নবাগত শিক্ষকদের জন্য আয়োজিত ইনডাকশন প্রশিক্ষণে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে| সবচেয়ে বিস্ময়কর ও হতাশাজনক বিষয় হলো, গত পাঁচ বছরে শুধু আয়ের ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি অর্থ সরকারি বা রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে| একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এমন লাগামহীন দুর্নীতির খবর দেশের পুরো শিক্ষা প্রশাসনের স্বচ্ছতাকেই এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে|
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ও নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে নায়েমের নিজস্ব হোস্টেল ব্যবস্থাপনায়| ডিআইএ-এর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নায়েমের ক্যাম্পাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসনের জন্য মোট পাঁচটি হোস্টেল রয়েছে| এগুলো হলো শহীদ বুদ্ধিজীবী, শহীদ জননী, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, অমর একুশে এবং সোনার বাংলা হোস্টেল| এই পাঁচটি হোস্টেলে সব মিলিয়ে আসন সংখ্যা রয়েছে ৫৫২টি| নিরীক্ষা দলের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে হোস্টেলগুলোর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স ও আবাসন ফি বাবদ মোট ১২ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ টাকা আয় হিসেবে অফিশিয়ালি দেখানো হয়েছে| বিপরীতে একই সময়ে হোস্টেল পরিচালনার নানা খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৬ টাকা| কিন্তু ঘোরতর সন্দেহের বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের স্বপক্ষে কোনো বৈধ বিল-ভাউচার বা মজুত নিবন্ধন খাতা বা স্টক রেজিস্টার নিরীক্ষা দলের সামনে উপস্থাপন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে নায়েম কর্তৃপক্ষ| ভুয়া খরচের খাত দেখিয়ে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে| শুধু তাই নয়, সরকারি কেনাকাটা বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে যে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং আয়কর পরিশোধ করার সুস্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তারও কোনো প্রমাণ বা নথিপত্র দেখাতে পারেনি তারা| হিসাবের এমন বিশাল গরমিল এবং আয়ের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ অপ্রদর্শিত রাখার কারণে নিরীক্ষা দল সুস্পষ্টভাবে ৩ কোটি ২০ লাখ ১৫ হাজার ৩৬১ টাকা অবিলম্বে সরকারি রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার জন্য জোরালো সুপারিশ করেছে|
নায়েমের মূল কাজ ও উদ্দেশ্য হলো দেশের শিক্ষকদের আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান করা, অথচ সেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নামেও চলছে প্রহসন ও রাষ্ট্রীয় অর্থের নিদারুণ অপচয়| ডিআইএ-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নায়েমের তরফ থেকে বর্তমানে মোট ২৬ ধরনের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হয়ে থাকে| কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই কোর্সগুলোর প্রশিক্ষণসূচি বা কারিকুলাম এবং শেখানোর বিষয়বস্তুর মধ্যে ব্যাপক মিল বা পুনরাবৃত্তি রয়েছে| প্রতিটি আলাদা প্রশিক্ষণের জন্য যে স্বতন্ত্র, সুনির্দিষ্ট ও গবেষণালব্ধ প্রশিক্ষণ মডিউল বা নির্দেশিকা প্রণয়ন করার কথা, কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে তৈরি করেনি| একই বিষয়বস্তু বারবার বিভিন্ন কোর্সের নামে চালিয়ে দেওয়ার কারণে প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য যেমন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি প্রশিক্ষণের নামে বরাদ্দ করা সরকারি বিপুল অর্থ ও শিক্ষকদের মূল্যবান সময়ের চরম অপচয় ঘটছে| শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মতো একটি অতি সংবেদনশীল খাতে এমন দায়সারা গোছের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই একটি অশনিসংকেত বলে মনে করছেন শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা|
সরকারি সম্পদের অবৈধ ব্যবহারের আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে নায়েম ক্যাম্পাসের ভেতরের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় সংক্রান্ত নিরীক্ষায়| নায়েমের নিজস্ব সরকারি জমিতে বর্তমানে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক স্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্যাফেটেরিয়া-১, একটি ধোলাইখানা বা লন্ড্রি, একটি সেলুন এবং একটি মনোহারি বা স্টেশনারি দোকান| সরকারি নিয়ম ও বিধি অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা| কিন্তু নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালের ১০ আগস্ট ‘নায়েম কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সমিতি নিবন্ধিত হওয়ার পর থেকে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অর্জিত পুরো অর্থ বেআইনিভাবে ওই সমিতির নিজস্ব তহবিলে জমা করা হচ্ছে| গত পাঁচ বছরে এই চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে ভাড়া বাবদ মোট ৩০ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫০ টাকা আদায় করা হলেও তার এক পয়সাও সরকারি কোষাগারে বা রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয়নি| এর আগে ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছরে প্রাপ্ত ভাড়ার বিপুল অর্থও একইভাবে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে নিরীক্ষায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে| অন্যদিকে, সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস বা ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করারও অকাট্য প্রমাণ মিলেছে| উন্মুক্ত দরপত্রের বদলে সিন্ডিকেট ও যোগসাজশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ ও ক্যাম্পাসের পূর্তকাজ করানোর মাধ্যমে বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও উঠে এসেছে এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে|
অর্থ অপচয়ের আরেকটি বড় ও অদ্ভুত উদাহরণ হলো নায়েম পরিচালিত ইনডাকশন বা বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি| জাতীয়করণকৃত বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের বুনিয়াদি বা ৪৫ দিনব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের বা এসইডিপি অর্থায়নে ইপিএসটি কর্মসূচির আওতায় এই ইনডাকশন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়| নিরীক্ষাদল তাদের নিবিড় তদন্তে দেখতে পেয়েছে যে, এই প্রশিক্ষণের নামে পরিবহন খাতে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক ও মাত্রাতিরিক্ত অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে| নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, দাপ্তরিক সংযুক্তিতে থাকা মাত্র ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তিনজন কোর্স পরিচালকের যাতায়াতের সুবিধার কথা বলে একই দিনে একসঙ্গে ১২টি গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে| মাত্র এক দিনের এই গাড়ি ভাড়ার খাতে পুরো ৯৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা দেশের প্রচলিত ভাড়ার হারের তুলনায় অনেক বেশি এবং যৌক্তিকতার বিচারে সম্পূর্ণ অবাস্তব| সরকারি প্রকল্পের অর্থের এমন হরিলুট প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিটি স্তরেই জবাবদিহির চরম অভাব বিরাজ করছে|
একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার হলো নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, কিন্তু নায়েমে এই ব্যবস্থাটি প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে| প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নায়েমের ভেতরে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা নিয়মিতভাবে এবং বিধিমোতাবেক কখনোই সম্পন্ন করা হয় না| উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে অনেক দেরিতে, ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর| অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা এমন চরম অবহেলার শিকার হওয়ার কারণে বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়মগুলো সংশোধনের কোনো উদ্যোগ কখনোই নেওয়া হয়নি এবং দুর্নীতি ও নিয়মবহির্ভূত কাজের ধারা নির্বিঘ্নে অব্যাহত রয়েছে| মজুত ব্যবস্থাপনার অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক, যেখানে কবে কী কেনা হয়েছে, কত টাকায় কেনা হয়েছে এবং কোথায় তা ব্যবহার করা হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট, ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ হিসাব রাখা হয় না| পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের বা ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক মো. আফলাতুন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, যেকোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কাঠামোগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই হলো এই নিরীক্ষা কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য| নায়েমের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা চালিয়ে যে পরিমাণ অসংগতি, অর্থ লোপাট এবং অনিয়মের পাহাড়সম চিত্র উঠে এসেছে, তা সত্যিই অত্যন্ত হতাশাজনক ও অপ্রত্যাশিত| তিনি জোরালো ভাষায় দাবি করেন, এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অবিলম্বে দোষী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে এসব চরম অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি|
তথ্যসূত্র: যুগান্তর