• বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৪১ পূর্বাহ্ন

শেখ হাসিনাকে আজীবন ক্ষমতায় রাখতে তৎপর ছিলেন একদল শীর্ষ ব্যবসায়ী

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যখন ছাত্র-জনতার তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছিল, ঠিক তখন দেশের একদল শীর্ষ ব্যবসায়ী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন। শুধু সমর্থনই নয়, আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বরোচিত দমন-পীড়ন ও গণহত্যাকে আরও কঠোর করার জন্য সরাসরি আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে তারা আজীবন দেশের ক্ষমতায় দেখার প্রকাশ্যে আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেন। গণভবনে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে শেখ হাসিনার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং আন্দোলন দমাতে ব্যবসায়ীদের এই অবস্থান পরবর্তীতে আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাণ্ডব কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়, যা পাঁচই আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলন দমাতে প্রথম দফায় ছাত্রলীগ ও পুলিশের তাণ্ডব শুরু হলে সারাদেশে ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ, ১৯ জুলাই থেকে দেশব্যাপী সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতামত উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত তড়িঘড়ি করে ২২ জুলাই গণভবনে এক বৈঠকের আয়োজন করেন। উক্ত বৈঠকে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের প্রতিনিধিত্বকারী বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা সংকট সমাধানের কোনো যৌক্তিক পরামর্শ না দিয়ে বরং গণআন্দোলনকে ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তাণ্ডব’ আখ্যা দিয়ে হাসিনাকে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।

গণভবনের ওই বৈঠকে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে তাদের কঠোর বিচারে আনার আহ্বান জানান। মৃত্যুর পরেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখার অঙ্গীকার করে তিনি বিক্ষোভকারীদের দমন করতে না পারলে ব্যবসা চালানো অসম্ভব হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, এফবিসিসিআইয়ের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার তিন কোটি ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে আজীবন ক্ষমতায় দেখার প্রতিশ্রুতি দেন। বিজিএমইএ-র তৎকালীন সভাপতি এসএম মান্নান কচি জীবন দিয়ে হলেও শেখ হাসিনার পাশে থাকার ঘোষণা দেন। একইভাবে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি-র তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন, বিকেএমইএর হাতেম এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের আহসান খান চৌধুরী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থার জোর দাবি জানান।

ব্যবসায়ী নেতাদের এই নিঃশর্ত সমর্থনের পরই আন্দোলন দমনে পুলিশ, র‍্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দুই হাজারের বেশি মানুষের জীবনদান এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের পর পাঁচই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া ২৪ জন শীর্ষ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে গণহত্যায় ইন্ধন ও সহযোগিতার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই মামলায় আরও ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে এবং বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা অভিযোগটির চূড়ান্ত তদন্ত সম্পন্ন করার পর্যায়ে রয়েছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দেশ ছেড়ে পালালেও কিংবা কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও, একটি বড় অংশ এখনও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। তারা দ্রুত নিজেদের রূপ বদলে নতুন সরকারের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে বিতর্কিত করার এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হলে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে আইসিটি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আমার দেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category