• মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৫ অপরাহ্ন
Headline
শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক: অভিজ্ঞতা থেকে ৬টি পরামর্শ বিপিএলে ফিক্সিং : সাবেক পরিচালকসহ তিনজন নিষিদ্ধ থার্ড টার্মিনালের র‌্যাম্প থেকে পিকআপ পড়ে বিমানবাহিনীর ৩ সদস্য নিহত সরকারি অর্থের অপচয় মেনে নেয়া হবে না: অর্থমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সীমান্ত নজরদারিতে যুক্ত হচ্ছে থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরলে ইরানও প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে আইপিইউ: শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জীবিকার নিশ্চয়তায় ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দ্রুত কাজ করবে সরকার : ডা. জাহেদ

সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে সংসদে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব: শর্তের বেড়াজালে আটকে আছে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন

Reporter Name / ৪ Time View
Update : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দরকষাকষি এবার জাতীয় সংসদের ভেতরে প্রকাশ্য বিতর্কে রূপ নিয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার পক্ষের সুস্পষ্ট শর্ত হলো, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলকে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় তাদের সংসদীয় কমিটির শীর্ষ পদগুলো দেওয়া হবে না। অন্যদিকে বিরোধী দল একে সরাসরি রাজনৈতিক ‘জবরদস্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের দাবি, সদ্য স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটিগুলোর অন্তত ২৬ শতাংশ সভাপতি পদ তাদের ন্যায্য রাজনৈতিক অধিকার। এই অধিকার পেতে কোনো বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্ত তারা মানতে নারাজ। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই বিষয়গুলো নিয়ে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতারা সরাসরি বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
সংসদের রোববারের বৈঠকে নতুন কয়েকটি সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা নির্ধারিত থাকলেও এই প্রবল বিতর্কের জেরে তা স্থগিত হয়ে যায়। তবে পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি কমিটির পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়েছে মাত্র। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সংসদ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্যানেল সভাপতি ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উভয় পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক স্বার্থে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য সরকারি দল এবং বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের ‘ক্লোজড ডোর’ বা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসার পরামর্শ প্রদান করেন।
এই সংকটের সূত্রপাত মূলত গত ১৩ জুলাই গঠিত একটি বিশেষ কমিটিকে কেন্দ্র করে। ওই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল শুরু থেকেই এই কমিটির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছে। তারা কমিটিতে কোনো নাম প্রস্তাব করেনি। বিরোধী দলের সুস্পষ্ট যুক্তি হলো, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে এবং জুলাই সনদের আলোকে সংবিধানের সংস্কার হতে হবে, কোনো দলীয় বা বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নয়। তারা প্রতিনিধি না দিলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ওই বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে তাদের দাপ্তরিক কাজ শুরু করে দিয়েছে।
সংসদীয় বিধিবিধান ও আইনগত বাধ্যবাধকতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিতেই হবে—এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা সরকারের নেই। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। দেশের ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে যে ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেখানে স্পষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল। ওই সনদে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটিগুলোর সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। তা ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদেও সংসদে বিরোধী দলের আসন সংখ্যার অনুপাতে নেতৃত্ব বন্টন করা হবে। সনদে বলা হয়েছিল, এই বিধানটি পরবর্তীতে সংবিধানেও যুক্ত করা হবে।
জাতীয় সংসদের আইন শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করাটা অপরিহার্য নয়। সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখালে এখনই এই বিধান কার্যকর করতে পারে। কারণ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি সরকারি দল থেকে হবেন নাকি বিরোধী দল থেকে—তা দেশের সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির কোথাও সুনির্দিষ্ট করে লেখা নেই। এটি সম্পূর্ণই সংসদীয় রেওয়াজ ও রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়।
গতদিনের অধিবেশনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তর্কবিতর্ক চলে। অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে চিফ হুইপ জানান, বিরোধী দলের সঙ্গে এর আগে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেওয়ার ব্যাপারে কথা হয়েছিল এবং তারা কিছুটা নমনীয়ও হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, সংসদে সদস্যদের সংখ্যানুপাতে কমিটি বণ্টন হওয়ার বিষয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছিল। সেই হিসাব অনুযায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদের ২৬ শতাংশ বিরোধী দলের প্রাপ্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি কমিটি চূড়ান্ত হয়েছে, সেখানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে মাত্র একজনকে সভাপতি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো কমিটিরই দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়নি।
বিরোধীদলীয় উপনেতা আরও বলেন, একটি বৈষম্যবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এই সংসদ গঠিত হয়েছে। তাই এই সংসদের ভেতরেই নতুন করে কোনো বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হোক, তা কারও কাম্য নয়। কিছু সংসদ সদস্য বাড়তি অধিকার ভোগ করবেন আর কিছু সদস্য বঞ্চিত হবেন, এমন উদাহরণ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংসদের চলতি অধিবেশন চলবে। এর মধ্যেই একটি সম্মানজনক সমঝোতা হলে তা বৈষম্যবিরোধী পার্লামেন্টের জন্য একটি চমৎকার নজির হয়ে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে বিশেষ কমিটিতে যাওয়ার সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি অতীতের সংসদীয় রেওয়াজের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই বিরোধী দল থেকে ঢালাওভাবে কোনো কমিটির সভাপতি করা হয়নি। জিয়াউর রহমানের আমলে শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদটি বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান সরকারও ইতোমধ্যে বিরোধী দলকে প্রদান করেছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু বিরোধী দল যদি সেই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বা সংবিধান সংশোধনে অংশ না নেয়, তবে তারা কীভাবে সুবিধাগুলো দাবি করে।
এই বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও সরকারি দলের অবস্থানের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার এর আগে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তারা তা নেয়নি। সরকার চেয়েছিল জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে। কিন্তু বিরোধী দল শুধু সুবিধা নিতে চায়, দায়িত্ব নিতে চায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বিরোধী দলকে উদারতা দেখিয়ে কমিটিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে তারা তাদের ভিন্নমত বা দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু সবকিছুই জুলাই সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সেই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবেন না—এটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক আচরণ।
জাতীয় সংসদে বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৫০টি কমিটির মধ্যে আনুপাতিক হারে বিরোধী দলের অন্তত ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। বিরোধী দল অন্তত ১১টির আশা করছিল। এখন পর্যন্ত ত্রয়োদশ সংসদের ১৫টি স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে, যার মধ্যে কেবল সরকারি হিসাব কমিটিতে বিরোধী দলকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৫টি কমিটি চলতি অধিবেশনেই গঠনের কথা রয়েছে।
জাতীয় সংসদের মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা এবং নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটিগুলো অনিয়ম তদন্ত, বিল পরীক্ষা এবং সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যেই সকল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ২৭ আগস্ট শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনটি শেষ হবে ১০ সেপ্টেম্বর। হাতে থাকা এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি ও বিরোধী দলকে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, নতুবা সংসদীয় কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category