বিশ্ব স্থাপত্যের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার অনন্য স্মারক জাতীয় সংসদ ভবন আজ দীর্ঘদিনের অবহেলা আর চরম রক্ষণাবেক্ষণহীনতার চড়া মাশুল দিচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার দশক আগে প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নান্দনিক ভাবনায় নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন কংক্রিটের সৌধটি এখন নানা কাঠামোগত দুর্বলতায় জর্জরিত। বর্ষা এলেই আকাশভাঙা বৃষ্টির পানি ছাদ ভেদ করে চুইয়ে পড়ছে ভবনের আনাচে-কানাচে। সংসদ সচিবালয়ের দাপ্তরিক কক্ষ থেকে শুরু করে ভেতরের মসজিদ, এমনকি চারপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতেও ঢুকে পড়ছে পানি। বিশ্বের দরবারে যা একসময় আধুনিক স্থাপত্যকলার এক অপার বিস্ময় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল, তা আজ যথাযথ তদারকি ও সময়োচিত মেরামতের অভাবে ভেতরে-ভেতরে ক্ষয়িষ্ণু রূপ ধারণ করছে। একটি প্রতীকী রাষ্ট্রীয় স্থাপনার এমন দুর্দশা কেবল তার বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং এর সামগ্রিক নিরাপত্তাকেও ঠেলে দিচ্ছে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
ভবনটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও আশঙ্কাজনক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে দক্ষিণ প্লাজার ভূগর্ভস্থ মেইন মেকানিক্যাল প্লান্ট বা এমএমপি। সংসদ ভবনের গোটা স্নায়ুতন্ত্র মূলত এই অংশ থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, অত্যাধুনিক জিআইএস প্যানেল, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং কেন্দ্রীয় গুদামঘরের মতো অত্যন্ত অপরিহার্য স্থাপনাগুলো এই এমএমপির ভেতরেই অবস্থিত। গত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ প্লাজার ছাদ চুইয়ে আসা বৃষ্টির পানিতে এই গুরুত্বপূর্ণ কক্ষটি বারবার প্লাবিত হচ্ছে। ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি যেখানে সংস্থাপিত, সেখানে এমন জলাবদ্ধতা যে কোনো মুহূর্তে মারাত্মক শর্ট সার্কিট কিংবা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। এমনকি সামান্য পানির সংস্পর্শে বিকল হয়ে যেতে পারে গোটা ভবনের বিদ্যুৎ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। জাতীয় একটি স্থাপনার এমন স্পর্শকাতর অংশের সুরক্ষা নিশ্চিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোটি টাকার যন্ত্রপাতির ওপর সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে টিনের ছাউনি ঝুলিয়ে রাখার মতো অদ্ভুত ও অপেশাদার সমাধান বেছে নেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার দৈন্যদশাকেই অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।
শুধু মূল ভবনের ভেতরেই নয়, সংসদ কমপ্লেক্সের আবাসিক ও অনাবাসিক প্রায় প্রতিটি অংশেই এখন একই ধরনের বেহাল দশা বিরাজ করছে। প্রায় ৪৫ বছর পুরোনো এই অবকাঠামোর ভিআইপি বাংলো, মিনিস্টার্স হোস্টেল, সাবেক সংসদ সদস্য হোস্টেল ও সচিব হোস্টেলের বহু কক্ষে বর্ষা মৌসুমে পানি পড়ার ঘটনা নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই মানিক মিয়া এভিনিউ সংলগ্ন বকুলতলা গেট এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, যা সংসদ ভবনে প্রবেশের অন্যতম প্রধান ও সার্বক্ষণিক পথ। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশপথটি জলমগ্ন হয়ে পড়ায় শুধু যে গাড়ি চলাচলেই ব্যাঘাত ঘটে তা নয়, বরং জাতীয় সংসদের মতো সংবেদনশীল এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা বলয়ও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই ড্রেনেজ ও ছাদ সমস্যার কথা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জানা থাকলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে স্থায়ী কোনো প্রতিকার মেলেনি।
এই অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার চিত্রটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষেও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারের হুইপ জি কে গউছ খোদ স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, ছাদ চুইয়ে অনবরত পানি পড়ার কারণে খোদ সংসদের মসজিদের ভেতর মেঝেজুড়ে বালতি পেতে রাখতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জানান, সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে তার নিজের সরকারি বাসভবনেও ছাদ থেকে পানি পড়ার ঘটনা এতটাই অনিয়ন্ত্রিত যে মেঝেতে বাটি দিয়ে তা ঠেকাতে হয়। তখন সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে সেই আশ্বাসের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো অর্থবহ উন্নতি চোখে পড়েনি।
শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য এই পরিস্থিতির পেছনে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অতি পুরোনো অবকাঠামো এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সংসদ ভবন এলাকায় যে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল, সেই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য এখনো সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। প্রকৌশলীদের মতে, ভবনের গ্লাস ব্রিকসের দীর্ঘদিনের সংযোগস্থলগুলো আলগা হয়ে যাওয়ায় এবং ছাদের জলরোধী আস্তরণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি সহজেই ভেতরে প্রবেশ করছে। এগুলো মেরামতের চেষ্টা চললেও অপ্রতুল বাজেটের কারণে একসঙ্গে সব কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। গণপূর্ত বিভাগের মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা মনে করছেন, তালি দেওয়া মেরামতের মাধ্যমে এই প্রাচীন ও জটিল স্থাপত্যকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি প্রণয়ন করা, যার নির্দেশনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামোর এই ভঙ্গুর দশার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি মাঠ, চত্বর, বাগান এবং ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং সার্বিক পরিবেশের মারাত্মক অবনতি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব সংস্কারকাজ শেষ করার পাশাপাশি সংসদ এলাকার পরিচ্ছন্নতা ও নিবিড় সবুজায়ন নিশ্চিত করার কড়া নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা ছিল, লুই আই কানের মূল স্থাপত্যিক নকশা এবং অনন্য নান্দনিকতার বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় না ঘটিয়ে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর পরিচর্যার মধ্য দিয়ে সংসদ ভবনকে তার পূর্বের মহিমায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
ভৌগোলিক অবকাঠামো সংস্কারের সমান্তরালে সংসদ ভবনকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানির আওতায় আনতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি নতুন সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিদ্যুতের অপচয় কমানো, সিস্টেম লস হ্রাস এবং বিকল্প শক্তির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবনের মূল নকশা বা নান্দনিক দৃশ্যপট অক্ষুণ্ন রেখে কোথায় কোথায় সৌর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন ও ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কিংবা অন্য কোনো শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই প্রকল্পের কারিগরি ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কার্যক্রমের জন্য গঠিত তিন সদস্যের উপকমিটিতে সংসদ সচিবালয়ের পাশাপাশি গণপূর্ত ও ডিপিডিসির প্রকৌশলীদের যুক্ত করা হয়েছে। অধিবেশন না থাকলে বিশাল আয়তনের এই ভবনে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সাথে সনাতনী ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদীয় কার্যক্রমকে আধুনিক, গতিশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ই-পার্লামেন্ট’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় প্রণীত এই ই-জাতীয় সংসদ প্রকল্পের জন্য ডেপুটি স্পিকারকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির অন্যতম সদস্য সংসদ সদস্য আন্না মিনজ জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের এই উদ্যোগটি সংসদের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। তবে একই সঙ্গে তিনি এ কথাও স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সংসদীয় গণতন্ত্রের এই প্রাণকেন্দ্রের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং কাজের যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
জাতীয় সংসদ ভবন কেবল রাজনীতিকদের কাজের ক্ষেত্র নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় ও বৈশ্বিক গৌরবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লুই আই কানের এই অমর সৃষ্টিকে বালতি কিংবা টিনের চালার মতো সাময়িক প্রলেপে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা কেবল উপহাসের জন্ম দেয়। যে উদ্যোগগুলো বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শুরু হয়েছে, সেগুলোকে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বাজেটের অজুহাতে মাঝপথে আটকে রাখলে চলবে না। একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা, স্বচ্ছ বরাদ্দ এবং নিয়মিত তদারকিই পারে এই অমূল্য স্থাপত্য নিদর্শনকে তার হৃত গৌরব ফিরিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রাখতে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ