রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকা যেন কিশোর গ্যাং ও সশস্ত্র অপরাধী চক্রের এক মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আদাবরের ব্যস্ত সড়কে দিনে-দুপুরে এক বিকাশ ব্যবসায়ীকে চার-পাঁচজন সন্ত্রাসী মিলে চাপাতি দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাই করে। এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে সেই ঘটনার মূল আসামিদের ধরতে যাওয়া পুলিশের ওপর ‘কব্জি কাটা’ গ্রুপের সদস্যরা দেশীয় রামদা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সরাসরি ও সঙ্ঘবদ্ধ হামলা চালায়। এই হামলায় আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) গুরুতর আহত হন, যা এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির রূপটিই উন্মোচন করেছে। তবে মোহাম্মদপুর-আদাবরের এই ত্রাস কেবল একটি গ্যাংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই পুরো জনপদকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে ডজনখানেক রক্তপিপাসু গ্যাং। মাদক ব্যবসা, ফুটপাত-কাঁচাবাজারের চাঁদাবাজি, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব বাহিনীর কাছে বর্তমানে জিম্মি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ সাধারণ বাসিন্দা। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ছিনতাই, কুপিয়ে জখম কিংবা চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলেও সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
মোহাম্মদপুর ও আদাবরের চন্দ্রিমা হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, নবীনগর এবং শ্যামলী হাউজিং এলাকায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘কব্জি কাটা’ গ্যাং। এদের মূল বিশেষত্ব হলো, প্রতিপক্ষ বা সাধারণ ভুক্তভোগী চাঁদা দিতে কিংবা মালামাল হাতবদল করতে বাধা দিলে এরা সরাসরি চাপাতি দিয়ে হাত বা পায়ের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। গত মঙ্গলবার সকালে এই গ্রুপের সদস্যরা আদাবরে বিকাশ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পর যখন পুলিশ ঢাকা উদ্যানের আস্তানায় অভিযান চালায়, তখন তারা আদাবর থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর এবং এসআই তরুণ কুমারকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। পরবর্তীতে পুলিশ ও র্যাবের ব্যাপক যৌথ অভিযানে গ্রুপটির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আবু সাঈদসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পুলিশের গুলিতে দুই ছিনতাইকারী আহত হয়েছে। গ্রুপটির সাবেক প্রধান আনোয়ার ওরফে ‘পানি আনোয়ার’ বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু সাঈদের নেতৃত্বে গ্রুপটি নিয়মিত বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল, যা বর্তমানে পুরো মোহাম্মদপুরবাসীকে তটস্থ করে রেখেছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী অপরাধ সাম্রাজ্যের আরেকটি বড় আখড়া হলো মোহাম্মদপুরের ঐতিহাসিক জেনেভা ক্যাম্প, যা বর্তমানে ‘সাতচব্বিশ’ ও ‘আতঙ্ক’ গ্রুপের নিরাপদ দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ক্যাম্পের ভেতরে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মাদকের কারবার নির্বিঘ্নে চলে বলেই এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাতচব্বিশ’ গ্রুপ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই গ্রুপের সাথে প্রতিপক্ষ গ্রুপগুলোর দফায় দফায় বন্দুকযুদ্ধ ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক মাসে এদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বেশ কয়েকজন ক্যাম্পবাসী এবং নিরীহ পথচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এরা কেবল ক্যাম্পের ভেতরেই শান্ত থাকে না, বরং সুযোগ বুঝে ক্যাম্পের বাইরে এসে হুমায়ুন রোড, বাবর রোড, আসাদ গেট এবং ধানমন্ডি এলাকায় গভীর রাতে রিকশা ও সিএনজি আরোহীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এই রুটের সাধারণ যাত্রীদের জন্য এরা এক আতঙ্কের নাম।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, বসিলা, চাঁদ উদ্যান এবং বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী বিশাল এলাকায় রাজত্ব করছে ‘লড়াকু’ এবং ‘পাঙ্কু’ গ্রুপ। এরা মূলত উঠতি বয়সের কিশোর ও তরুণদের নিয়ে গঠিত এবং চরম মারমুখী স্বভাবের। সাম্প্রতিক সময়ে বসিলা এবং বেড়িবাঁধ এলাকায় রাতের আঁধারে পণ্যবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার কাভার্ডভ্যান আটকে অস্ত্রের মুখে গণচাঁদাবাজি করার মূল অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। গত সোমবার রাতেও আদাবর ১০ নম্বর বালুর মাঠ এলাকার কয়েকটি গ্যারেজে এই গ্রুপের সদস্যরা আকস্মিক হানা দিয়ে গণলুটপাট চালায় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা গুরুতর অভিযোগ করেছেন। এদের ভয়ে সন্ধ্যার পর বেড়িবাঁধ এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং তুরাগ নদীর তীরবর্তী খালি প্লটগুলোতে এদের মাদক সেবন ও জুয়ার আসর বসে নিয়মিত।
আবাসন এলাকাগুলোতে সাধারণ নাগরিকদের রক্ত চুষে খাচ্ছে ‘দাঁতভাঙা’ ও ‘ভাই-ব্রাদার’ গ্রুপ। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি, নবোদয় হাউজিং এবং বসিলা সংলগ্ন নতুন নতুন আবাসন প্রকল্পগুলোতে এই দুই গ্রুপের তৈরি করা সমান্তরাল প্রশাসন চলে। এই গ্রুপগুলোর মূল কাজ হলো আবাসন এলাকাগুলোতে নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে বা পুরোনো বাড়ি সংস্কার করতে গেলে মোটা অঙ্কের ‘কনস্ট্রাকশন চাঁদা’ বা নির্মাণ চাঁদা দাবি করা। সাম্প্রতিক সময়ে বসিলা ও নবোদয় এলাকায় চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বেশ কয়েকজন সম্মানিত বাড়িওয়ালা ও নিরীহ রাজমিস্ত্রিকে লোহার রড, হকিস্টিক ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার ঘটনা ঘটেছে। বাধা দিলে এরা ভুক্তভোগীদের দাঁত বা হাত ভেঙে দেয় বলেই স্থানীয়রা এদের ‘দাঁতভাঙা’ গ্রুপ নামে ডাকে। এদের কারণে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার নিজেদের জমিতে বাড়ি করার সাহস পাচ্ছে না।
এর বাইরেও মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, শিয়া মসজিদ, টাউন হল এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমি এলাকা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ‘কালা জহির’ ও ‘পিচ্চি রাজু’ গ্রুপ। এই গ্রুপগুলো মূলত স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজার, ফুটপাতের অবৈধ সবজি ও ফলের দোকান এবং লেগুনা ও রিকশা স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ভিত্তিতে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলে। এছাড়া মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন ব্লক ও আদাবরের বিভিন্ন রোডে জোরপূর্বক নিজস্ব ডিশ ও ইন্টারনেট লাইনের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এরা প্রতিনিয়ত বৈধ লাইনম্যান ও টেকনিশিয়ানদের মারধর করে এবং ক্যাবল কেটে দিয়ে গ্রাহকদের জিম্মি করে। ফলে সাধারণ মানুষ উন্নত ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত হলেও ভয়ে মুখ খোলার সাহস পায় না।
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার ভৌগোলিক গঠন অপরাধীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। এখানকার ঢাকা উদ্যান বা নবীনগর হাউজিংয়ের ভেতরের গলিগুলো যেমন গোলকধাঁধার মতো সরু, তেমনি এর ঠিক পাশেই রয়েছে বিস্তীর্ণ বেড়িবাঁধ ও বুড়িগঙ্গা নদী। অপরাধ করার পর অপরাধীরা দ্রুত নৌকাযোগে নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া বা টঙ্গীর দিকে পালিয়ে যেতে পারে। তবে এই গ্যাং কালচার টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় জ্বালানি হলো স্থানীয় রাজনৈতিক আশ্রয় ও বড় ভাইদের ছত্রছায়া। স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক গ্রুপের মূল হোতা বা ‘বড় ভাই’ পুলিশের অভিযানে জেলে গেলে বা দলবদল করলে, তার শূন্যস্থানে অন্য কোনো প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়ে নতুন নামের গ্রুপের জন্ম হয়। এই গডফাদাররা নিজেদের রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে লোকবল বাড়াতে, জমি দখল করতে বা প্রতিপক্ষকে সাইজ করতে এই কিশোরদের পকেটে অস্ত্রের লাইসেন্স আর মাদক তুলে দেয়। ফলে পুলিশের সাময়িক ও লোকদেখানো অভিযানে কয়েকজন ধরা পড়লেও, অপরাধের মূল শিকড় উপড়ে না ফেলায় কিছুদিন পরই এই গ্যাংগুলো নতুন নামে ও নতুন উদ্যমে আবারও রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব শুরু করে। আদাবরে ওসিসহ পুলিশের ওপর হামলার পর এবার এই ডজনখানেক গ্যাং এবং তাদের পেছনে থাকা গডফাদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে দেশব্যাপী বিশেষ ও চিরুনি অভিযান চালানো সময়ের দাবি, অন্যথায় এই জনপদ পুরোপুরি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।