দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের এই যুগে আধুনিক শহরগুলো যখন টেকসই শক্তির দিকে দ্রুতগতিতে ধাবিত হচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা যেন হাঁটছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা যখন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, তখন ঢাকার চিত্রটি চরম হতাশার। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালে এই পিছিয়ে পড়ার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ তাদের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং করাচি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মেটাচ্ছে কেবল সৌরশক্তি ব্যবহার করে। এমনকি ভারতের নয়াদিল্লি ও মুম্বাই শহরেও এই হার যথাক্রমে ৩ শতাংশ ও ১ শতাংশ। অথচ, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং বিশাল অর্থনৈতিক চাপের মাঝে দাঁড়িয়েও ঢাকায় সৌরবিদ্যুতের অবদান একেবারেই নগণ্য। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ঢাকা শহরে স্থাপিত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেমগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশই সম্পূর্ণ অকেজো ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং নীতিগত দুর্বলতা, জনসচেতনতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক চূড়ান্ত নিদর্শন।
বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রধান দুই সংস্থা—ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই ব্যর্থতার একটি নগ্ন রূপ ফুটে ওঠে। হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ৫ হাজার ২৩৩ মেগাওয়াট। এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে মাত্র ৮৭ মেগাওয়াটেরও কম বিদ্যুৎ, যা মোট চাহিদার ২ শতাংশেরও নিচে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ঢাকায় সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ১১৩ থেকে ১২৬ মেগাওয়াট। কিন্তু ব্যাপক অবহেলা, সঠিক তদারকির অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে বর্তমানে এর থেকে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অর্থাৎ, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তার সিংহভাগই এখন ছাদের ওপর কেবল প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এই বিশাল নিষ্ক্রিয়তার পেছনে অর্থনৈতিক ও মানসিক যে কারণগুলো লুকিয়ে আছে, তা আরও বেশি উদ্বেগজনক। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) একটি গভীর সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকা শহরের শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর অব্যবহৃত ছাদে যদি অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা যেত, তবে দেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় বারো হাজার কোটি টাকা) সাশ্রয় করতে পারত। বর্তমানে যখন দেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং উচ্চমূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির চাপে ধুঁকছে, তখন এই ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতে পারত অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তির জায়গা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন ‘উদ্দেশ্যহীন সম্মতির’ সংস্কৃতিকে। একসময় নতুন ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করেছিল সরকার। এই আইনি বাধ্যবাধকতা মেটাতে গিয়ে বাড়ির মালিকরা অত্যন্ত নিম্নমানের, সস্তা সোলার প্যানেল কিনে ছাদে বসিয়েছিলেন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ সংযোগটি বাগিয়ে নেওয়া। গ্রিড সংযোগ পাওয়ার পর সেই প্যানেলগুলোর দিকে তারা আর ফিরেও তাকাননি। রক্ষণাবেক্ষণের চরম অবহেলায় সেগুলো ধীরে ধীরে অকেজো হার্ডওয়্যারে পরিণত হয়েছে। গুলিস্তানের সুন্দরবন মার্কেটের মতো দেশের বৃহত্তম সৌর সরঞ্জামের বাজারগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যায়, গ্রীষ্মের তীব্র লোডশেডিংয়ের মাঝেও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে সৌর সরঞ্জাম কেনার কোনো আগ্রহ নেই। দৈনিক বিক্রির মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে, যা প্রমাণ করে যে ঢাকার মানুষের মধ্যে ‘সোলার কালচার’ বা সৌর সংস্কৃতি একেবারেই গড়ে ওঠেনি।
এই পরিস্থিতির জন্য সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি দোষারোপ করারও সুযোগ নেই। শিল্প নেতারা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তারা মনে করেন, সরকারি নীতি ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এই খাতের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, সরকারি নীতির মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বিরাজ করছে। সরকার উচ্চমূল্যে (প্রায় ১৩ টাকা প্রতি ইউনিট) বিদ্যুৎ কিনে তা ভর্তুকি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ৫ টাকায় বিক্রি করছে, অথচ পরিবেশবান্ধব সোলার প্যানেল আমদানির ওপর বসিয়ে রেখেছে ৫০ শতাংশের মতো বিশাল শুল্ক। একজন সাধারণ নাগরিক কেন এত চড়া শুল্ক দিয়ে প্যানেল কিনবেন এবং বিএসটিআইসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ছয় মাসের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পার করে সংযোগ নেবেন, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকার যদি বাধা তৈরি না করে সরাসরি প্রণোদনার ব্যবস্থা করত—যেমন প্রতি পাঁচ কিলোওয়াট সিস্টেমের জন্য ৫ হাজার টাকা নগদ প্রণোদনা দেওয়া হতো—তবে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যেত।
আস্থার সংকট এবং ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থার স্থবিরতাও ঢাকার সৌর স্বপ্নকে পিছিয়ে দিয়েছে। সস্তা ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতির কারণে বহু গ্রাহক প্রতারিত হয়েছেন, এবং নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবা না পাওয়ায় সৌরশক্তির ওপর থেকে তাদের বিশ্বাস উঠে গেছে। সরকারের ‘নেট মিটারিং’ পলিসি—যার মাধ্যমে গ্রাহকরা তাদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারেন—ঢাকায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। স্রেডার (SREDA) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ডিপিডিসির অধীনে মাত্র ৬ দশমিক ৮১ মেগাওয়াট এবং ডেসকোর অধীনে ১১ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এই সিস্টেমে রেকর্ড করা হয়েছে। ডিপিডিসির তথ্যভাণ্ডার ২০১৭ সালের পর থেকে ঠিকমতো হালনাগাদই করা হয়নি, যা প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার এক চরম দৃষ্টান্ত।
গ্রাম ও শহরের মধ্যে জ্বালানি সক্ষমতা এবং ব্যবহারের মানসিকতার পার্থক্যটিও এক্ষেত্রে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। গ্রামীণ অঞ্চলে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কম এবং লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি হওয়ায় সেখানকার মানুষ বাধ্য হয়েই সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকেছেন। তারা সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবহার করে রাতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে টেলিভিশন, ফ্রিজ বা এসি চালাচ্ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের বিদ্যুৎ বিল কমাচ্ছেন। কিন্তু ঢাকার চিত্র ভিন্ন। এখানে গ্রামীণ এলাকার মতো ঘনঘন লোডশেডিং হয় না। যেটুকু সময় বিদ্যুৎ থাকে না, তার জন্য ঢাকার বিত্তবান বা মধ্যবিত্ত মানুষ পরিবেশদূষণকারী ডিজেল জেনারেটর বা আইপিএস (IPS) ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গ্রিড বিদ্যুতের আপেক্ষিক স্থায়িত্ব এবং বিকল্প ব্যবস্থার সহজলভ্যতা ঢাকার বাসিন্দাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তরের তাগিদকে একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে।
নীতিগত অস্থিরতা এবং আইনি রশি টানাটানি এই খাতের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছে। সরকার ২০০৯ সাল থেকে রুফটপ সোলার উৎসাহিত করার চেষ্টা করলেও বাস্তবায়নের অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০১৬ সালের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) তথ্যমতে, ঢাকার প্রায় ২১ লাখ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের সিংহভাগই সৌরবিদ্যুৎহীন। আইনি পরিস্থিতিও চরম বিভ্রান্তিকর। ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট নতুন সংযোগের জন্য সোলার ম্যান্ডেট বা বাধ্যবাধকতা পুনর্বহাল করেছিলেন। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সারা দেশের সকল সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের কঠোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেই নতুন সংযোগের জন্য সোলার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে নেয়। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে এই ধরনের স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ নাগরিকদের মাঝে কেবল বিভ্রান্তিই বাড়িয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আর কোনোভাবেই টেকসই নয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত কারণে বাংলাদেশে প্রচুর সৌর সম্ভাবনা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু কাগজে-কলমে নীতি প্রণয়ন করলেই চলবে না। রুফটপ সোলারের দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন উচ্চ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার, সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ প্রদান, যন্ত্রপাতির কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাহকদের জন্য সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা। অন্যথায়, তীব্র জ্বালানি সংকট ও বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মাঝে দাঁড়িয়েও ঢাকার অগণিত ছাদ শূন্যই পড়ে থাকবে, আর একটি সম্ভাবনাময় খাত এভাবেই আমলাতন্ত্র ও জনউদাসীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ