• বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ১০:৩৮ অপরাহ্ন
Headline
চল্লিশের পর নারীর সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা: ৮টি পরামর্শ ফাহাদ রহমানের মুকুটে যুক্ত হলো দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম সায়নীর শিরশ্ছেদের জন্য ১ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা, বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রামিসা হত্যা: দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমার আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: কৃষিমন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সরকার যতদিন চাইবে, মাঠে থেকে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ইবোলার টিকা আসতে ৯ মাস লাগতে পারে: ডব্লিউএইচও আড়াইহাজারে চাঁদা দাবির জেরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ আটক ৩

সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের জন্য অবৈতনিক, সর্বজনীন ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু দেশের রাজধানী শহর ঢাকার শিক্ষাব্যবস্থার দৃশ্যপট যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই মেগাসিটিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে যেমন এলাকাভিত্তিক সরকারি বিদ্যালয়ের অভাব প্রকট, অন্যদিকে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন বা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর আকাশছোঁয়া ব্যয়ভার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই দুই সংকটের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ঢাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এখন ব্যাপকভাবে মাদরাসায় ঝুঁকছেন।

স্বল্প খরচে সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় এবং বাড়ির কাছাকাছি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সুবিধার কারণেই মূলত এই প্রবণতা হু হু করে বাড়ছে। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন, যথাযথ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র: আবাসিক ফ্ল্যাটেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম

ঢাকার অন্যতম জনবহুল ও ব্যস্ত এলাকা মোহাম্মদপুর। এই এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে রাজধানীর সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়। সরজমিনে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই বিশাল জনবসতিপূর্ণ এলাকায় শতাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মাত্র একটি।

সরকারি স্কুলের এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, যার একটি খুব বড় অংশই হলো মাদরাসা। মোহাম্মদপুর এলাকায় গড়ে ওঠা উল্লেখযোগ্য মাদরাসাগুলোর মধ্যে রয়েছে— মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা, মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ে কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলিয়া মাদরাসা, চাঁদ উদ্যানের জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা, ফয়জুল উলূম মহিলা মাদরাসা, ঢাকা উদ্যানের দারুল হিকমাহ্ নূরানী মাদরাসা, সৌতূলহেরা মাদরাসাহ, আল-কারীম দারুল উলূম মাদরাসা কমপ্লেক্স এবং তাহফিজুল কোরআন কারিমিয়া মাদরাসা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো না থাকার পরও এসব প্রতিষ্ঠান দিব্যি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব মাদরাসার বেশির ভাগই কোনো নিজস্ব বা খোলামেলা ক্যাম্পাস নেই; বরং আবাসিক ভবনে সাধারণ ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েই গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও আবাসিক সুবিধা পরিচালনা করা হচ্ছে।

শুধু মোহাম্মদপুর নয়, ঢাকার যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া এবং মিরপুর-১১ এর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও হুবহু একই চিত্র বিরাজ করছে। শেওড়াপাড়া এলাকায় একটি সাধারণ আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘মোহাম্মাদিয়া জামে মসজিদ নেসার মাদরাসা’। এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের মধ্যে আরও অন্তত দুটি মাদরাসা গড়ে উঠেছে। শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া এলাকায় সব মিলিয়ে অর্ধশতাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার সিংহভাগই মাদরাসাভিত্তিক। অথচ এত বড় একটি এলাকায় সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হিসেবে নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বলতে রয়েছে কেবল মনিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

খরচের যাঁতাকল ও অভিভাবকদের নিরুপায় অবস্থা

ঢাকায় বসবাসরত নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই অনেক বেশি। এর মধ্যে সন্তানের শিক্ষা ব্যয় তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এক চাকরিজীবী তার সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে নিরুপায় অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন,

‘আমাদের বাসস্থানের কাছাকাছি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। বাধ্য হয়ে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুঁজতে হয়। কিন্তু আশপাশে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই কিন্ডারগার্টেন বা মাদরাসা। এছাড়া একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ও আছে। তবে সেখানে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই, কারণ খরচ অনেক বেশি। একটি সাধারণ মানের কিন্ডারগার্টেনে সন্তানকে পড়াতে গেলেও মাসে প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বর্তমান বাজারদর ও সংসারের অন্যান্য খরচের পর এই টাকা বের করা আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। সে তুলনায় মাদরাসায় ব্যয় একেবারেই কম। তাই যাতায়াতের দূরত্ব ও মাসিক খরচের বিষয়টি বিবেচনা করেই সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছি।’

একই ধরনের বাস্তবতার কথা জানান শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় সবজি বিক্রেতা সাব্বির আহমেদ। প্রতিদিনের আয়ে সংসার চালানো এই মানুষটির কাছে সন্তানের শিক্ষার জন্য বেসরকারি স্কুলের ফি দেওয়া একটি অসম্ভব স্বপ্ন। তিনি বলেন,

‘কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোর সামর্থ্য আমার নেই। আবার এলাকার সরকারি বিদ্যালয়টিও বাসা থেকে বেশ দূরে, সেখানে যাতায়াতের একটা আলাদা খরচ ও ঝক্কি আছে। অন্যদিকে, মাদরাসায় অনেক কম খরচে ধর্মীয় শিক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষা—দুটোই মিলছে। এ কারণেই আমি আমার দুই সন্তানকেই কাছাকাছি একটি মাদরাসায় পড়াচ্ছি।’

পরিসংখ্যানের আয়নায় ঢাকার প্রাথমিক শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে ঢাকায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতার চিত্রটি আরও ভয়াবহভাবে ফুটে ওঠে।

  • মোট শিক্ষার্থী ও সরকারি সুযোগ: ঢাকা জেলায় বর্তমানে মোট প্রাথমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭১ জন, যা সারা দেশের সব জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৭৫ জন।

  • বেসরকারি নির্ভরতা: বাকি বিপুল সংখ্যক, অর্থাৎ ১০ লাখ ৯৮ হাজার ২৯৬ জন শিক্ষার্থীকেই তাদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পুরোপুরি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শতকরা হিসাবে, ঢাকায় প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।

  • প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি: ঢাকা জেলায় মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৫০টি। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই হলো ৪ হাজার ২৯৯টি। অর্থাৎ, মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮১ দশমিক ৮৯ শতাংশই বেসরকারি মালিকানাধীন। এর বিপরীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৯৫১টি, যা এই মেগাসিটির বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

মাদরাসায় ঝোঁকার নেপথ্যে বহুমুখী কারণ

সরকারি স্কুলের অভাব এবং খরচের হিসাবের বাইরেও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের মাদরাসায় ঝোঁকার পেছনে আরও বেশ কিছু সামাজিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহ এই প্রবণতার একটি বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

তার মতে, ঢাকাসহ সারা দেশেই সাম্প্রতিক সময়ে মাদরাসার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধির বিষয়টি শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

১. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বল্পতা: এলাকায় সরকারি স্কুল না থাকায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে বিকল্প খুঁজছেন।

২. বেসরকারি বিদ্যালয়ের উচ্চ ব্যয়: কিন্ডারগার্টেনগুলোর লাগামহীন বেতন কাঠামো সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

৩. অনুদান ও কম খরচ: প্রাথমিক স্তরে মাদরাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কাঠামোগতভাবে তুলনামূলক সহজ। সমাজের বিত্তবানদের অনেকেই ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনুদান দিতে আগ্রহী হন। এই অনুদানের কারণে মাদরাসাগুলো অত্যন্ত অল্প ব্যয়ে বা অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাদান করতে পারে।

৪. চাহিদাভিত্তিক বহুমুখী প্রতিষ্ঠান: বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষায় শুধু নিম্নবিত্তরাই নয়, বিত্তবানদের চাহিদাকেও মাথায় রাখা হচ্ছে। ভাসমান বা শ্রমজীবী দরিদ্র পরিবারগুলো যেমন বিনা খরচের মাদরাসা বেছে নিচ্ছেন, তেমনি উচ্চবিত্তরা ব্যয়বহুল ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডারগার্টেন ধাঁচের আধুনিক মাদরাসা বেছে নিচ্ছেন।

৫. কারিকুলাম বা পাঠ্যক্রম পরিবর্তন: বিগত কয়েক বছরে দেশে সাধারণ শিক্ষার কারিকুলামে বারবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই ঘন ঘন পরিবর্তন অভিভাবকদের একাংশকে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বিমুখ করে তুলেছে। বর্তমানে অনেক অভিভাবক এমন একটি স্থিতিশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাচ্ছেন, যেখানে তাদের সন্তানরা ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাও পাবে। মাদরাসাগুলো অভিভাবকদের এই মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার কথা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বিবেচনা করে তাদের পাঠ্যক্রম সাজাচ্ছে।

তবে অধ্যাপক জিন্নাহ সতর্ক করে বলেন, মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শহরে দ্রুত বাড়লেও, এগুলোর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বা খেলার মাঠ নিশ্চিত করা হচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর।

নিয়ন্ত্রণের অভাব ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ এই বিষয়ে সরকারের কাঠামোগত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী অবৈতনিক ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে যে ধরনের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন, তাতে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে। ঢাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা যে হারে কম, সেটি যেমন একটি বড় সমস্যা; তেমনি বিদ্যমান যে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোতেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সেখানে পড়াতে আগ্রহী হন না।’

ড. মনজুর আহমদ আরও জানান, দেশে বর্তমানে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা যথাযথ পরিকাঠামো ছাড়াই কিন্ডারগার্টেন বা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার অঘোষিত সুযোগ রয়েছে। রাজধানী ঢাকায় ঠিক সেটিই যথেচ্ছভাবে ঘটছে। কিন্ডারগার্টেনগুলো যেমন অতিরিক্ত বাণিজ্যমুখী ও ব্যয়বহুল, অন্যদিকে মাদরাসাগুলোর মধ্যে নিম্নব্যয় থেকে উচ্চব্যয়—সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই রয়েছে। কিন্তু একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে গড়ে ওঠা এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সরকারের উচিত সর্বজনীন ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে অবিলম্বে এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যার ঘনত্ব ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং প্রাথমিক শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেট উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে এই সংকটময় পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মিরাজুল ইসলাম উকিল আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, ঢাকার বিদ্যমান সরকারি বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে সরকারের একটি প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঢাকাসহ সারা দেশেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। এটা সত্য যে, বর্তমানে ঢাকার অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর একটি সাধারণ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অভিভাবকরা যাতে পুনরায় সরকারি বিদ্যালয়মুখী হন, সেটি আমরাও চাই। আর এ লক্ষ্যেই বিদ্যালয়গুলোর ভবন সংস্কার, ডিজিটাল ক্লাসরুম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। যদি জরিপে এমনটি উঠে আসে যে, সুনির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যার তীব্র অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে, তবে সে বিষয়েও সরকার যাচাই-বাছাই করে নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।’

পরিশেষে বলা যায়, মেগাসিটি ঢাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার এই সংকট কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি লাখ লাখ পরিবারের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের একটি অংশ। বিনা খরচে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়া প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র যদি পর্যাপ্ত সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে শিক্ষার মতো একটি সংবেদনশীল খাত পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের হাতে চলে যাবে। একটি টেকসই ও শিক্ষিত জাতি গঠনের স্বার্থে, এখনই সময় ঢাকার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করার।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category