• মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ন

সিসার বিষে ধুঁকছে সাড়ে ৩ কোটি শিশু

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকার একটি জীর্ণ জনপদে বেড়ে ওঠা ১১ বছরের ফুটফুটে শিশু রেজাউল| আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই প্রতিদিন হাসিমুখে পিঠে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যেত সে| খেলাধুলা আর পড়াশোনায় বেশ চঞ্চল ও চনমনে স্বভাবের রেজাউলের জীবনটা হঠাৎ করেই এক অজানা অন্ধকারে ঢেকে যেতে শুরু করে| তাদের বসতবাড়ির ঠিক পাশেই সম্পূর্ণ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠে একটি অবৈধ ব্যাটারি গলানোর কারখানা| আর এই কারখানাই রেজাউলের জীবনের সবচেয়ে বড় কালসাপ হয়ে দাঁড়ায়| কারখানাটি থেকে দিনরাত অবিরত নির্গত হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া এবং সীসাযুক্ত ধূলিকণা বাতাসের সঙ্গে মিশে তাদের ঘরে প্রবেশ করতে থাকে| কিছুদিন পার হতে না হতেই রেজাউলের শরীরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়| তার শুরু হয় তীব্র মাথাব্যথা ও মারাত্মক শ্বাসকষ্ট| যে ছেলেটি একসময় পড়াশোনায় দারুণ মনোযোগী ছিল, ধীরে ধীরে তার সেই পড়ার আগ্রহ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে| এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক বমি বমিভাব এবং শারীরিক দুর্বলতা তাকে একেবারে বিছানায় ফেলে দেয়|

শুরুতে রেজাউলের স্বজনরা বুঝতে পারেননি ঠিক কী কারণে তাদের প্রাণোচ্ছল ছেলেটি এভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে| তারা স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে বেশ কিছু গতানুগতিক পরীক্ষানিরীক্ষাও করান| কিন্তু কোনো কিছুতেই ছেলের আসল রোগটি ধরা পড়ছিল না| মাসের পর মাস ছেলের এই অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে স্বজনরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগে নিয়ে যান| সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রেজাউলের বিস্তারিত কেসস্টাডি এবং তাদের বাড়ির চারপাশের পরিবেশের কথা শুনে সন্দেহ করেন যে এটি কোনো সাধারণ রোগ নয়| তিনি অবিলম্বে রক্তে সীসার মাত্রা বা লেড পয়জনিং পরীক্ষার জন্য শিশুটিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে (নিনমাস) পাঠান| সেখানে অত্যন্ত জটিল পরীক্ষার পর যে ফলাফল আসে, তা দেখে চিকিৎসকের চোখও কপালে ওঠে| পরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছোট্ট রেজাউলের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ১৭ দশমিক ৯৭ মাইক্রোগ্রাম (µg/dL) সীসার ভয়াবহ উপস্থিতি রয়েছে, যা তার স্নায়ুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছিল|

ছেলের এই ভয়ংকর রিপোর্টের কথা শুনে বিস্ময় ও আতঙ্কে হতবাক হয়ে যান রেজাউলের মা রেহেনা আক্তার| তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, তার এগারো বছরের ছেলেটি তো কোনো দিন কোনো কারখানায় কাজ করতে যায়নি, সে শুধু বাড়ি থেকে স্কুলে যাতায়াত করত| তাহলে এত বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত সীসা কীভাবে তার নিষ্পাপ শরীরে প্রবেশ করল? তিনি আক্ষেপ করে জানান, তার চঞ্চল ছেলেটি হঠাৎ করেই আনমনে হয়ে যাচ্ছিল, সবসময় মাথাব্যথা আর বমিভাবের অভিযোগ করত| দিনের পর দিন ঢাকা শহরের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে অবশেষে তারা জানতে পেরেছেন যে তাদের আদরের সন্তান মারাত্মক সীসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অত্যন্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, মানবদেহে সীসার প্রবেশের কোনো নিরাপদ মাত্রা বা সেফ লিমিট বলতে কিছু নেই| শরীরে সীসার প্রবেশ মানেই তা ক্ষতিকর| ডব্লিউএইচও নির্ধারিত হস্তক্ষেপের মাত্রা বা ট্রিগার লেভেল প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম হলেও, রেজাউলের রক্তে সেই মাত্রা ছিল প্রায় তিন গুণেরও বেশি|

রেজাউলের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক চিত্র নয়| বরং এটি দেশের লাখ লাখ শিশুর প্রতিদিন অজান্তেই মারাত্মক বিষের সংস্পর্শে আসার এক করুণ প্রতিচ্ছবি| বাংলাদেশে সীসা বিষক্রিয়ার এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সম্প্রতি উঠে এসেছে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ বা এমআইসিএস ২০২৫-এর এক বিস্তৃত সমীক্ষায়| এই সমীক্ষার ফলাফল গোটা জাতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত| এতে দেখা গেছে, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে অন্তত চারজনই তাদের রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা বহন করে চলেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত বিপৎসীমার চেয়ে অনেক বেশি| দেশজুড়ে পরিচালিত এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, সারা দেশের মোট ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা মিশে আছে| এর চেয়েও বড় আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রাজধানী ঢাকার শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়| এই শহরের প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশুর রক্তেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া গেছে, যা তাদের মেধা ও ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে|

এই সংকটের বিশালতা অনুধাবন করতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে হবে| এর আগে ২০২০ সালে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা পিওর আর্থের একটি যৌথ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের ওপরে অবস্থান করছে| অর্থাৎ দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি ভবিষ্যৎ নাগরিক একটি নীরব ঘাতককে শরীরে ধারণ করে বড় হচ্ছে| বাংলাদেশে সীসা বিষক্রিয়া নিয়ে গবেষণা বা আলোচনা একেবারে নতুন কোনো বিষয় নয়| ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে পরিচালিত একটি গবেষণায় ৯১৯ জন শিশুকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করে তাদের রক্তে সীসার উপস্থিতি এবং এর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণগুলো অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল| কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সমস্যাটি বহু বছর ধরে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও গবেষণাপত্রে আলোচিত হলেও, সারা দেশে নিয়মিত জাতীয় স্ক্রিনিং এবং এই রোগীদের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি|

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, রক্তে উচ্চমাত্রার সীসা দূর করার একমাত্র বিশ্বস্বীকৃত ও কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থা হলো ‘চিলেশন থেরাপি’| কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের মতো এত বড় একটি দেশের কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালেই বর্তমানে এই বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় চিলেটিং ওষুধের কোনো সুবিধা উপলব্ধ নেই| এর পরিণতি হচ্ছে অত্যন্ত ভয়াবহ| যে বিপুল সংখ্যক শিশু মারাত্মক স্নায়বিক ক্ষতি এবং এনসেফালোপ্যাথির মতো ভয়ংকর মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে, তারা সীসায় আক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো কার্যকর চিকিৎসা পাচ্ছে না| ফলে এই নিষ্পাপ শিশুরা ধীরে ধীরে মেধা হারিয়ে স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে| একটি স্বাধীন দেশে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এত বড় একটি ঘাটতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়|

পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বা শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, দেশে সীসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত বা মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বিশাল হলেও তাদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসাগত সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে| সীসা বিষক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখে কোনোভাবেই রোগ নিশ্চিত করা যায় না| মাথাব্যথা, পেটব্যথা, শারীরিক তীব্র দুর্বলতা, পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, শিখনফল অর্জনে ব্যর্থতা, অস্বাভাবিক রূঢ় আচরণ কিংবা বারবার খিঁচুনির মতো লক্ষণগুলো শিশুদের অন্যান্য অনেক সাধারণ রোগেও হরহামেশাই দেখা যায়| ফলে এই বিষক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো আধুনিক ল্যাবরেটরিতে রক্তে সীসার মাত্রা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা| কিন্তু বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিয়মিতভাবে বা দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের জন্য রক্তে সীসা পরীক্ষার কোনো সুলভ পরিকাঠামো বা নেটওয়ার্ক অদ্যাবধি গড়ে ওঠেনি|

২০২৬ সালের জুন মাসে ইউনিসেফের প্রকাশিত একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানানো হয়, বাংলাদেশে মানুষের রক্ত এবং পরিবেশগত বিভিন্ন নমুনা (যেমন মাটি, পানি, ধুলো) পরীক্ষা করার মতো আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতাসম্পন্ন কোনো জাতীয় ‘রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’ নেই| সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত জোরালোভাবে জানায় যে, এমন একটি অত্যাধুনিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা গেলে দেশব্যাপী নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, সঠিক শনাক্তকরণ এবং জাতীয় পর্যায়ের একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা বা সার্ভিল্যান্স সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হতো| কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই বিশাল অবকাঠামো না থাকায় দেশের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের রক্ত নিয়মিত পরীক্ষা করে তাদের একটি ছাতার নিচে বা নজরদারির আওতায় আনার সুযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে| ইউনিসেফের শীর্ষ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. প্রিসিলা ওবিল এই বিষয়ে বারবার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের শিশুদের নিয়মিত ট্র্যাকিং করার ওপর জোর দিয়েছেন| তিনি বলেছেন, শিশুদের পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অত্যন্ত দ্রুত রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা এই নীরব ঘাতক প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেবে|

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং সেন্ট্রাল হাসপাতালের বর্তমান কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান এই সংকট নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেছেন| তিনি বলেন, আমাদের সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি গবেষণা বা দেশব্যাপী কোনো সমন্বিত জাতীয় সমীক্ষা নেই, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার| তিনি তার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, যখন সীসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত কোনো রোগী তাদের কাছে আসে, তখন ল্যাব সাপোর্টের অভাবে তাদের সঠিক ডায়াগনোসিস করা এবং অভিভাবকদের এই অদৃশ্য বিষের ভয়াবহতা সম্পর্কে বোঝানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে| এছাড়া, দেশে রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার সুযোগ হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে এই সেবা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব| অধ্যাপক রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, সীসা দূষণ এখন আর কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, এটি এক মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে| তাই শুধু ঢাকা শহরে নয়, বরং অবিলম্বে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা দ্রুত সহজলভ্য করা উচিত|

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, সীসার বিষক্রিয়া মূলত শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন, মানসিক পুনর্বাসন এবং নিউরোডেভেলপমেন্ট বা স্নায়বিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে| সীসা এমন একটি ভারী ধাতু, যা একবার মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে তা কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয় এবং আইকিউ লেভেল স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেয়| অথচ অবাক করা বিষয় হলো, পুরো বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল জনসংখ্যার বিপরীতে বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্ট বা শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র ৯৫ জন| এটি একটি জাতির স্বাস্থ্য খাতের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক একটি পরিসংখ্যান| এর বাইরে দেশের সাধারণ চিকিৎসকদের একটি অনেক বড় অংশেরই সীসা বিষক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক লক্ষণ এবং এর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বা সম্যক ধারণা নেই| ফলে মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের রোগীরা যখন এসব চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তারা সঠিক পরীক্ষা ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হন, যা এই স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে|

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অফিসিয়াল নির্দেশিকা বা গাইডলাইন অনুযায়ী, মানবদেহে সীসার প্রবেশের কোনো গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই| সীসা একটি বিষ, যার সামান্যতম উপস্থিতিও মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর| কোনো শিশুর মধ্যে সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্তের রক্তে সীসার ঘনত্ব বা ব্লাড লেড কনসেন্ট্রেশন পরিমাপ করার মাধ্যমেই মূলত দূষণের তীব্রতা সম্পর্কে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন| নির্দেশিকা অনুযায়ী, রক্ত পরীক্ষায় যদি প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম (৫ μg/dL) বা তার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া যায়, তবে সেটিকে ‘ট্রিগার লেভেল’ হিসেবে ধরা হয়| এই অবস্থায় পৌঁছালে রোগীকে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবিড় তদারকিতে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে| আক্রান্ত ব্যক্তি যদি শিশু বা গর্ভবতী মা হন, তবে চিকিৎসকদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে দ্রুত তাদের পরিবেশগত দূষণের উৎসটি চিহ্নিত করা এবং তাদের সেই বিষাক্ত স্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া| পাশাপাশি সীসায় আক্রান্ত শিশুর শরীরে আয়রন ও জিংকের মতো অতি প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের কোনো ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত ওষুধের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে| সীসার উৎস বন্ধ করে দেওয়ার পরও যদি রোগীর রক্তে বিষাক্ত ধাতুর মাত্রা না কমে, কিংবা শারীরিক তীব্র লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে, তবে তাকে মুখে খাওয়ার ‘ওরাল চিলেশন থেরাপি’ দেওয়ার বিধান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে| আর কোনো দশ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সী শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা যদি ৪৫ মাইক্রোগ্রাম (৪৫ μg/dL) বা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়, তবে তার জীবন বাঁচাতে চিলেশন থেরাপি দেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক|

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই ‘চিলেশন থেরাপি’ আসলে কী? চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, রক্তে সীসার মাত্রা যখন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায় কিংবা রোগীর শরীরে চরম স্নায়বিক জটিলতা দেখা দেয়, তখন জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা হিসেবে এই চিলেশন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মতে, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও রক্তের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এটি কখনো মুখে খাওয়ার ওষুধ হিসেবে, আবার কখনো শিরাপথে ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে পুশ করা হয়| চিলেশন থেরাপি মূলত এমন একটি অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যবহৃত ওষুধগুলো রক্তের ভেতরে থাকা বিষাক্ত সীসা বা অন্যান্য ভারী ধাতুকে আঠার মতো নিজের সঙ্গে বেঁধে ফেলে| পরবর্তীতে এই আবদ্ধ যৌগটি রোগীর কিডনির মাধ্যমে ছাঁকন প্রক্রিয়ায় প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে চিরতরে বের করে দেওয়া হয়| যদি কোনো রোগীর রক্তে সীসার মাত্রা ৭০ মাইক্রোগ্রাম (৭০ μg/dL) বা তার বেশি হয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়| তখন ওই রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) রেখে স্নায়বিক ক্ষতির দিকটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়| গুরুতর বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে সাক্সিমার, সোডিয়াম ক্যালসিয়াম এডেটেট কিংবা নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ডাইমারক্যাপ্রলের মতো শক্তিশালী চিলেটিং ওষুধ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে| তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, রক্তে সীসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম হলেই সঙ্গে সঙ্গে চিলেশন থেরাপি শুরু করা যায় না; বরং এটি অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থায় শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবিড় ও সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে প্রয়োগ করতে হয়, কারণ এর কিছু নিজস্ব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে|

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এখানে সীসা বিষক্রিয়া শনাক্ত করার জন্য আধুনিক পরীক্ষার সুযোগ যেমন অত্যন্ত সীমিত, ঠিক তেমনি গুরুতর রোগীদের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিলেটিং ওষুধেরও দেশে কোনো সরবরাহ নেই| পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবস্থার চরম ঘাটতি এই সংকটকে এক অমানবিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে| সীসার বিষক্রিয়া সবচেয়ে বেশি ও স্থায়ী ক্ষতি করে একজন শিশুর ক্রমবর্ধমান মস্তিষ্কে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করে বলেছে, শিশুদের শৈশবকালীন বিকাশের সময় সীসার সংস্পর্শের ফলে তাদের যে মস্তিষ্কের ও স্নায়বিক ক্ষতি হয়, তা আজীবন স্থায়ী হতে পারে| আর বিষক্রিয়ার চরম পর্যায়ে যখন ‘এনসেফালোপ্যাথি’ বা ব্রেন ড্যামেজ শুরু হয়, তখন ওই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে শিরাপথে (আইভি) চিলেশন থেরাপি দেওয়া ছাড়া চিকিৎসকদের হাতে আর কোনো উপায় থাকে না| কিন্তু দেশে এই থেরাপি না থাকায় অনেক শিশুকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় অথবা আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়|

ইউনিসেফের প্রকাশিত তথ্যে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে| টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের এক শিশু মহীনের রক্তে ৭ দশমিক ৯৭ মাইক্রোগ্রাম সীসা পাওয়া গিয়েছিল| কিন্তু এই শিশুটির পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন হাসপাতালে নানা ধরনের ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েও তাদের আদরের সন্তানের অসুস্থতার আসল কারণটি জানতে পারেনি| অর্থাৎ শারীরিক সব ধরনের লক্ষণ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সীসা পরীক্ষা না করার কারণে এই ভয়াবহ রোগটি দীর্ঘদিন অদৃশ্যে থেকে যায়| একইভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থা পিওর আর্থের ‘ওয়ান ইন ৩৬ মিলিয়ন’ শীর্ষক কর্মসূচিতে ওই একই এলাকার মির্জাপুরের আরও এক হতভাগ্য শিশুর কথা স্পষ্টভাবে উঠে আসে| সেই শিশুটি একটি অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার ঠিক পাশেই বসবাস করার কারণে ক্রমাগত বিষাক্ত সীসার নির্মম শিকার হয় এবং বর্তমানে সে স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতির মুখে পড়ে ধুঁকছে| এই হৃদয়বিদারক কেস স্টাডিগুলো অত্যন্ত শক্তভাবে প্রমাণ করে যে, কেবল একজন আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না| শিশুটি যে পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সেই বসতবাড়ির আশপাশের মাটি, ধুলোবালি এবং যত্রতত্র ফেলে রাখা ব্যাটারির বিষাক্ত বর্জ্য যদি সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার বা নিষ্ক্রিয় করা না হয়, তবে এই মহাবিপদ থেকেই যাবে এবং আরও শিশু এতে আক্রান্ত হবে|

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টদের মতে, সীসায় আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্কের কোষ এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে একটি বড় ধরনের ছন্দপতন বা বাধা ঘটে| এর ফলে শিশুটির স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, সে পড়াশোনায় একদম মনোযোগ দিতে পারে না এবং তার মধ্যে চরম মাত্রায় আচরণগত নানা অসংগতি দেখা দেয়| কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, শিশুদের এই জটিল স্নায়বিক চিকিৎসার জন্য দেশে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই| বাংলাদেশ চাইল্ড নিউরোলজি সোসাইটি আক্ষেপ করে জানিয়েছে যে, সীসায় আক্রান্ত এই লাখ লাখ শিশুর মানসিক ও স্নায়বিক পুনর্বাসন এবং তাদের নিউরোডেভেলপমেন্ট মনিটরিং করার জন্য দেশে বিশেষায়িত চিকিৎসকের যে সংখ্যা রয়েছে, তা দেশের এই বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য এবং অপ্রতুল|

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশনস ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহবুবুর রহমান এই বিষয়ে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রেখেছেন| তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে শুধু শিশুদের সীসায় আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে চুপচাপ বসে না থাকার| আমাদের এখন দ্রুত অ্যাকশনে যেতে হবে| যেসব শিশু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে, তাদের পরিবেশগত পটভূমি বিস্তারিতভাবে জেনে অবিলম্বে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে| তাদের শারীরিক পুষ্টি মূল্যায়ন করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো সীসার মূল উৎসটিকে চিরতরে নিষ্ক্রিয় করতে হবে| পাশাপাশি যেসব শিশু মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, তাদের জীবন বাঁচাতে চিলেশন থেরাপির জন্য সম্পূর্ণ নিবেদিত রেফারেল হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে|

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ বি এম মুকিব এই সংকটের কারিগরি দিকগুলো তুলে ধরে বলেন, আজকাল অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন যে তাদের শিশুরা কোনো কিছুতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না বা ধীরে ধীরে তাদের আইকিউ কমে যাচ্ছে| চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এর পেছনে অন্তত দশটি ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে| তবে, সুনির্দিষ্টভাবে এটি সীসার বিষক্রিয়ার কারণেই হচ্ছে কি না, তা ল্যাবরেটরিতে রক্ত পরীক্ষা ছাড়া কোনোভাবেই শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়| তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে সীসাদূষণ ও এর ভয়াবহ বিষক্রিয়া সম্পর্কে সরকার এবং নীতিনির্ধারকরা অবগত থাকলেও, মাঠপর্যায়ে এটি মোকাবিলায় কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়| ডা. মুকিব আরও বলেন, শিশুদের বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়া, অটিজমের মতো লক্ষণ দেখা দেওয়া, কোনো কাজে মনোযোগ দিতে না পারা কিংবা স্বাভাবিক যোগাযোগে অক্ষমতার মতো জটিল লক্ষণগুলো নিয়ে হতাশ অভিভাবকরা মূলত আমাদের মতো হাতে গোনা নিউরোলজি বিশেষজ্ঞদের কাছেই আসেন| বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন সাধারণ শিশু চিকিৎসক বা পেডিয়াট্রিশিয়ান থাকলেও, পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ৯৫ জন| এর মধ্যে আবার মাত্র ২০ জনের মতো রয়েছেন যারা সিনিয়র বা অভিজ্ঞ| সবমিলিয়ে হাতে গোনা এই শতাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই সারা দেশের শিশুদের মেধা ও বুদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো নিয়ে নিরলসভাবে ভাবছেন| সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো আমাদের এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হতে সাহায্য করছে| তবে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দেশে এখনো রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার বা ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে আছে| ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগে এই সুবিধা অবিলম্বে দেশব্যাপী বাড়ানো এবং সবার জন্য সহজলভ্য করা উচিত|

অন্যদিকে, আইসিডিডিআর,বি-র ডা. মো. মাহবুবুর রহমান চিকিৎসকদের সচেতনতার অভাবটিকেও একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তিনি বলেন, এই চিকিৎসা ক্ষেত্রে কেবল প্রযুক্তিগত বা যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতাই আমাদের একমাত্র সমস্যা নয়, বরং সাধারণ চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতিও একটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ| দেশে থাকা শিশু চিকিৎসকদের মধ্যে প্রায় পনেরোশো থেকে আঠারোশো চিকিৎসকেরই সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ এবং এর আধুনিক চিকিৎসা প্রটোকল সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বা বিজ্ঞানসম্মত ধারণা নেই| চিকিৎসকরা যদি নিজেরাই এই নীরব ঘাতক সম্পর্কে সচেতন না হন, তবে তারা রোগীদের সন্দেহ করে ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেবেন কীভাবে? একমাত্র একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যখন রোগীকে দৃঢ়ভাবে সুপারিশ করবেন, কেবল তখনই অভিভাবকরা তাদের সন্তানের এই ব্যয়বহুল পরীক্ষাটি করাতে উৎসুক হবেন| তিনি আরও যুক্ত করেন যে, দেশের ঠিক কোথায়, কীভাবে অবৈধ উপায়ে সীসা গলানো হচ্ছে বা কীভাবে আমাদের চারপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| কারণ, ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে কেবল আক্রান্ত শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ধরা পড়ে, কিন্তু আইসিডিডিআর,বি-র বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা বারবার বলছে যে, যত্রতত্র গড়ে ওঠা ব্যাটারি গলানোর অবৈধ কেন্দ্রগুলো থেকেই মূলত বাতাসের মাধ্যমে এই মারাত্মক সীসা জনপদে ছড়াচ্ছে|

দেশে চিকিৎসার সুযোগ ও পরিকাঠামো বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, একজন আক্রান্ত শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ দেশে খুবই সীমিত, যা ঢাকা শহরের মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রয়েছে| এই পরীক্ষার পরিধি দ্রুত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাড়ানো দরকার| তার মতে, এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটি আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় ‘রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠা করা| এমন একটি ল্যাব থাকলে দেশের মানুষের রক্ত এবং পরিবেশগত নমুনা একই ছাতার নিচে ও একটি নির্দিষ্ট জাতীয় নজরদারি কাঠামোর আওতায় এনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে| পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালগুলোতে ঝুঁকিভিত্তিক ব্লাড স্ক্রিনিং ব্যবস্থা, আক্রান্তদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার বা সেন্ট্রাল ডেটাবেজ, শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ সেল এবং গুরুতর রোগীদের নিবিড় চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি|

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন সূত্রগুলো জানায়, এই জাতীয় সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ একেবারেই যে থমকে আছে, তা নয়| স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সীসা বিষক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন’ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ উপকরণ ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে| ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় দেশে মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করে গত ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সর্বমোট ৬৪৮ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৫৩৮ জন স্কুল শিক্ষককে এই বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা প্রাথমিক লক্ষণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে পারেন| এর পাশাপাশি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে একটি অত্যন্ত বিস্তৃত জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নের বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে| আন্তর্জাতিক সংস্থা পিওর আর্থের কারিগরি সহায়তায় ‘সীসামুক্ত বাংলাদেশ: জাতীয় কৌশল ও বহু-বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬–২০৩৫’ শীর্ষক একটি মেগা প্রজেক্ট প্রস্তুত করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন লাভে সক্ষম হয়েছে| এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আওতায় দেশের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিল্প ও ভোক্তাসুরক্ষা খাতকে একসুতোয় বেঁধে একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে কাজ করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে| পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি ক্ষমতাসম্পন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটিও গঠন করা হয়েছে| এই কমিটির কাজ হবে শুধু কারখানার দূষণ বন্ধ করা নয়, বরং মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহার্য খাদ্যদ্রব্য, শিশুদের খেলনা ও বাজারের বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী নিয়মিত ল্যাবে পরীক্ষা করা| পাশাপাশি বাড়িভিত্তিক পরিবেশগত মূল্যায়নের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে, যাতে শিশুদের রক্তে সীসা প্রবেশের একেবারে সঠিক উৎসটি চিহ্নিত করে তা চিরতরে বন্ধ করা যায়|

পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ এই বিষয়ে তার মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবেশগত আইনের অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে| এর পাশাপাশি দেশব্যাপী চিকিৎসা নজরদারি বাড়ানো এবং সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা ছাড়া কোনোভাবেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিষের হাত থেকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়|

বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেশের এই সীসা পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত বাস্তবমুখী বক্তব্য দিয়েছেন| আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পুরোপুরি সীসামুক্ত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিকে তিনি ‘অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং’ বলে অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন| গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে যদি আমরা সত্যিই এই দেশকে সম্পূর্ণ সীসামুক্ত করতে চাই, তবে আমাদের শিল্প, পরিবহন এবং পরিবেশ খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে এবং একটি ব্যাপক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে| তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই সীসা দূষণের কারণেই আমাদের দেশের শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে, তাদের হজমশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে| এমনকি নিউমোনিয়া বা হামের মতো সাধারণ রোগে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক অবস্থার যে দ্রুত অবনতি ঘটে, তার পেছনেও এই সীসার পরোক্ষ ও নীরব ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে|

দেশে সীসায় আক্রান্ত রোগীদের সুনির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত চিকিৎসার যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল তা অত্যন্ত সাবলীলভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন| তিনি বলেন, এটা সত্য যে জাতীয়ভাবে আমাদের প্রতিটি হাসপাতালে রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার বা ব্লাড স্ক্রিনিংয়ের কোনো সহজলভ্য ব্যবস্থা নেই এবং আমরা এখনো আক্রান্তদের কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ বা তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে পারিনি| তবে, সরকার বসে নেই, সেটি দ্রুত তৈরির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে| এছাড়া, সীসা বিষক্রিয়ার সবচেয়ে আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা ‘চিলেশন থেরাপি’র সুবিধাও যে আপাতত দেশের কোনো হাসপাতালে চালু নেই, সেটিও তিনি স্বীকার করেন| তবে, এই দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বর্তমান সরকার অত্যন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন| তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে এই বিষয়ে কয়েক দফা প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করেছি| প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে ব্লাড স্ক্রিনিং এবং চিলেশন থেরাপি চালুর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ও কারিগরি গাইডলাইন নিয়ে খুব শিগগিরই একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা তৈরি করা হবে এবং তা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, যাতে রেজাউলের মতো আর কোনো শিশুকে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মেধা হারাতে না হয়|

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category