বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ নদ-নদীগুলো একসময় এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই নদীগুলোই যেন এক ভয়ংকর মৃত্যুপুরী ও অপরাধীদের সবচেয়ে নিরাপদ ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ও দৃশ্যমান অবনতির কারণে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, গুম ও সংঘবদ্ধ ডাকাতির মতো জঘন্য অপরাধের মাত্রা দেশব্যাপী আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব ভয়ংকর অপরাধ সংঘটনের পর খুনিদের কাছে এখন প্রমাণ লোপাটের সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ ও ‘কার্যকর’ মাধ্যম হয়ে উঠেছে দেশের খরস্রোতা জলপথগুলো। একটি অবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত কেবল দেশের নৌ পুলিশের ইউনিটগুলোই বিভিন্ন নদ-নদী থেকে মোট ৯২০টি ভাসমান মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজতাত্ত্বিক এবং মানবাধিকারকর্মীরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, এই বিশাল পরিসংখ্যান একটি বিষয়ই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দেশের পেশাদার ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো এখন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নদীকে প্রমাণ ধ্বংসের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে নিয়মিত ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, চাঞ্চল্যকর এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পুলিশের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও অপ্রতুল রয়ে গেছে। ভারী কোনো বস্তুর সঙ্গে বেঁধে একটি লাশ যখন রাতের অন্ধকারে নদীর গভীর জলে ফেলে দেওয়া হয়, তখন খুনিরা খুব সহজেই নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগ পেয়ে যায়। একই সঙ্গে নদীর তীব্র স্রোত মৃতদেহটিকে ভাসিয়ে মূল ঘটনাস্থল থেকে বহু মাইল দূরে নিয়ে যায়, যার ফলে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষে অপরাধটি ঠিক কোথায়, কীভাবে এবং কাদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল, তা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়ে পরিণত হয়।
নৌ পুলিশের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার ও উদ্ধার অভিযানের পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেশের এই নীরব গণহত্যার এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো এক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নদ-নদী থেকে মোট ৫৪১টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। আর এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসের ব্যবধানে আরও ৩৭৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নৌ পুলিশের দেওয়া এই ৯২০টি লাশ উদ্ধারের পরিসংখ্যানটি দেশের সার্বিক ভয়ংকর পরিস্থিতির কেবল একটি আংশিক বা ক্ষুদ্র চিত্র মাত্র। কারণ, নদীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের পাশে, রেললাইনের ওপর, নির্জন বনজঙ্গলে কিংবা লোকালয়ের বাইরের খোলা মাঠেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসব লাশের অনেকগুলোই খণ্ডিত, বিকৃত বা বীভৎসভাবে কাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, যা পেশাদার খুনিদের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দেয়। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও নিয়মিত অসংখ্য মৃতদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। স্বনামধন্য মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’ বা এমএসএফ-এর সাম্প্রতিক এক গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম মাত্র ২০ দিনেই নদী তীর, সড়ক, রেললাইন, খোলা মাঠ এবং অন্যান্য পরিত্যক্ত স্থান থেকে অন্তত ৪২টি সম্পূর্ণ অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এমএসএফ-এর নিজস্ব সংগৃহীত ডেটা আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে, যেখানে দেখা যায় যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দেশব্যাপী অন্তত ৪৬৫টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নদীর পানিতে লাশ ফেলে দিয়ে কীভাবে খুনিরা আইনের চোখ ফাঁকি দিচ্ছে এবং প্রশাসন কীভাবে অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে, তার একটি জ্বলন্ত ও সাম্প্রতিক উদাহরণ হতে পারে গত ১৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। এদিন ঢাকার অদূরে ধামরাই উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া বংশী নদী থেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের ভাসমান মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। শম্ভুগঞ্জ ইউনিয়নের দেপাশাই নয়াপাড়ার একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠের কাছে নদীর স্রোতে ওই গলিত লাশটি ভাসতে দেখে স্থানীয় আতঙ্কিত মানুষ পুলিশে খবর দেয়। ধামরাই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শহিদুল ইসলাম শনিবার এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে সাংবাদিকদের জানান যে, উদ্ধারকৃত মৃত ব্যক্তিটির প্রকৃত পরিচয় এখনো উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের খাতায় নিয়ম রক্ষার খাতিরে এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি অত্যন্ত দক্ষ ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্রাইম সিন টিম থানায় ছুটে এসেছিল। তারা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মৃতদেহের আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, যাতে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার ব্যবহার করে তার নাম-ঠিকানা বের করা যায়। কিন্তু নদীর পানিতে দীর্ঘক্ষণ ডুবে থাকার কারণে লাশটি এতটাই ফুলে-ফেঁপে বিকৃত ও পচে গিয়েছিল যে, কোনোভাবেই তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে পরিচয় শনাক্তের সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক বিকল্প হিসেবে লাশের শরীর থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তাকে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ব্যক্তি হিসেবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দাফন করা হয়।
নদী কীভাবে অপরাধীদের সবচেয়ে বড় নীরব সহায়তাকারী হয়ে ওঠে এবং কেন ফরেনসিক প্রমাণ নদীর পানিতে টিকতে পারে না, সে বিষয়ে গত ২৩ সেপ্টেম্বর দেশের প্রখ্যাত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও প্যাথলজিস্ট ডা. মোজাহেরুল হক অত্যন্ত বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, নদীর পানির স্রোত, তাপমাত্রা, জলজ প্রাণী ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে একটি মৃতদেহ ডাঙার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত পচতে শুরু করে। তীব্র স্রোতের কারণে মৃতদেহের গায়ে লেগে থাকা খুনিদের চুল, ডিএনএ, রক্তের ছিটেফোঁটা এবং পোশাকের ফাইবার পুরোপুরি পানিতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়, ফলে ফরেনসিক প্রমাণের কোনো অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট থাকে না। মাছ, কাঁকড়া, পোকা বা অন্যান্য জলজ প্রাণী খুব সহজেই মৃতদেহের নরম টিস্যুগুলো খেয়ে ফেলে, যার ফলে লাশের গায়ে থাকা আঘাতের চিহ্ন, ছুরিকাঘাত বা শ্বাসরোধের মতো হত্যার প্রাথমিক প্রমাণগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। ডা. হক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যে, পচন ও জলজ প্রাণীর আক্রমণের পর শুধু অবশিষ্ট হাড়গোড় পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ অনুমান করা ছাড়া তদন্তকারী ফরেনসিক চিকিৎসকদের হাতে আর কোনো উপায়ই খোলা থাকে না। মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ওমর ফারুকও ২৪ সেপ্টেম্বর প্রায় একই ধরনের উদ্বেগজনক মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আধুনিক যুগের খুনিরা এখন অত্যন্ত চতুর ও হিসাব-নিকাশ করে অপরাধ সংঘটন করে। তারা খুব ভালো করেই জানে যে লাশ ডাঙায় বা মাটিতে ফেলে রাখলে সিসিটিভি ক্যামেরা বা স্থানীয়দের নজরে পড়ে খুব দ্রুত ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু নিস্তব্ধ রাতে নদীতে ফেলে দিলে তীব্র স্রোতের কারণে লাশটি মূল ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার এমনকি ভেসে ভেসে সম্পূর্ণ অন্য একটি জেলাতেও চলে যেতে পারে। অপরাধীদের একটি বড় অংশ আইনের ফাঁক গলে শাস্তির হাত থেকে চিরতরে বাঁচতে এবং হত্যার সব ধরনের বস্তুগত প্রমাণ নিমিষে নিশ্চিহ্ন করতেই দেশের এই বিশাল জলপথকে তাদের ডাম্পিং জোন হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
সারাদেশের বিশাল নৌপথের নিরাপত্তা, টহল ও অপরাধ দমনে নিয়োজিত নৌ পুলিশ তাদের কাজের সুবিধার্থে পুরো দেশের জলভাগকে মোট ১১টি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো হলো—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, খুলনা ও সিলেট। নৌ পুলিশের ডেটাবেজ থেকে চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া লাশের আঞ্চলিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৬৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে রাজধানী ঢাকা অঞ্চল থেকে। শিল্পকারখানা ও ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে অপরাধের মাত্রাও সবচেয়ে বেশি। এছাড়া নদীমাতৃক অঞ্চল বরিশাল থেকে ৫২টি, ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে ৪৯টি করে, শীতলক্ষ্যা পাড়ের শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ থেকে ৪৭টি, টাঙ্গাইল থেকে ২৬টি, খুলনা থেকে ২৩টি, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ২১টি, হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জ থেকে ১৯টি, ইলিশের রাজধানী চাঁদপুর থেকে ১৮টি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট থেকে ৫টি অজ্ঞাত ও জ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পূর্ববর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানেও এই জনবহুল ঢাকা অঞ্চলই লাশের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছিল। ওই এক বছরে ঢাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ থেকে ৮৮টি, বরিশাল থেকে ৬৫টি, চট্টগ্রাম থেকে ৫৮টি, রাজশাহী থেকে ৫৬টি, খুলনা থেকে ৩৭টি, ফরিদপুর থেকে ৩৬টি, টাঙ্গাইল থেকে ৩১টি, চাঁদপুর থেকে ২৮টি এবং সিলেট অঞ্চল থেকে ৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই দীর্ঘ পরিসংখ্যানগুলো থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত স্ফটিকের মতো স্পষ্ট যে, ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোর নদীগুলোতে অপরাধের মাত্রা ও লাশ গুমের প্রবণতা সারা দেশের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বা অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ গত ২৩ সেপ্টেম্বর এই লোমহর্ষক পরিসংখ্যান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া এই বিপুল সংখ্যক মৃতদেহের প্রতিটি যদি যথাযথভাবে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তদন্ত করা হতো, তবে এমন অনেক রোমহর্ষক ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অজানা রহস্য বেরিয়ে আসতো, যা সরকারি খাতায় বা পুলিশের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে কখনোই হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। তিনি তার গবেষণার আলোকে জানান, বর্তমানে দেশে এমন অনেক সংঘবদ্ধ ও পেশাদার আন্ডারওয়ার্ল্ড অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে, যাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ব্যবসায়িক শত্রুরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মানুষ খুনের জন্য ভাড়া করে থাকে। এই ভাড়াতে খুনিরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হত্যার পর কোনো প্রমাণ না রেখেই লাশ নদীতে গুম করে দেয়। সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো তাদের প্রোঅ্যাকটিভ বা পূর্বপ্রস্তুতিমূলক নজরদারি এবং রিঅ্যাকটিভ বা ঘটনা-পরবর্তী তদন্তের দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এই ধরনের ঘটনা বছরের পর বছর ধরে বারবার ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি অপরাধের জোন বা ক্রাইম ম্যাপিং করার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অধ্যাপক সোহাগ সরকারকে জোরালো তাগিদ দিয়ে বলেন, অপরাধপ্রবণ নদী এলাকাগুলোতে অবিলম্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে, নৌ পুলিশের টহল ও জনবল বহুগুণ জোরদার করতে হবে এবং আধুনিক ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।
নৌ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাশ শনাক্তকরণ ও আইনি পদক্ষেপের পরিসংখ্যানটিও অত্যন্ত হতাশাজনক এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি বড় প্রমাণ। ২০২৫ সালে উদ্ধার হওয়া ৫৪১টি মৃতদেহের মধ্যে পরবর্তীতে পুলিশি তদন্ত ও স্বজনদের খোঁজাখুঁজির পর মাত্র ৩৭৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল এবং বাকি ১৬৬ জনের পরিচয় চিরতরে অজানাই থেকে যায়। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে উদ্ধার হওয়া ৩৭৯টি লাশের মধ্যে ২৭৮ জনের পরিচয় জানা গেলেও ১০১টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবেই আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পরিসংখ্যান বিচারহীনতার চিত্রকে আরও প্রকট করে তোলে। ২০২৫ সালে এতগুলো লাশ উদ্ধারের পর মাত্র ৯০টি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, অন্যদিকে ময়নাতদন্ত ও ঝামেলা এড়াতে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছিল ৩৬৭টি। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেও মাত্র ৪৯টি হত্যা মামলা এবং ২৭৬টি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান গত ২৩ সেপ্টেম্বর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের প্রায় সবই মূলত পরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার। অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে ভুক্তভোগীদের হত্যার পর কেবল লাশ গুম করতেই নদীতে ফেলা হয়। তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ এনে বলেন, পুলিশ এসব ক্ষেত্রে ঠিকমতো গভীর তদন্ত না করেই নিজেদের দায় এড়াতে তড়িঘড়ি করে একটি সাধারণ অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে ফাইল বন্ধ করে দেয় এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের দোহাই দিয়ে লাশগুলোকে দ্রুত দাফন করে ফেলে। সাইদুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কোন্দল, মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন কিংবা চরম রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে এসব খুন সংঘটিত হচ্ছে। একটি দায়সারা অপমৃত্যুর মামলা দিয়ে রাষ্ট্র কখনোই তার সাধারণ নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার মৌলিক আইনি ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে পারে না।
তবে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ পুরোপুরি মেনে নিতে নারাজ। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এএইচএম সাহাদাত হোসাইন শনিবার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জানান, নদী থেকে লাশ উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনাই বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে থাকে। তিনি যুক্তি দেখান যে, শুধুমাত্র নদী থেকে একটি লাশ উদ্ধার হলেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার আগে তাকে সরাসরি হত্যার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই, কারণ এটি আত্মহত্যা বা নৌ দুর্ঘটনার কারণেও হতে পারে। নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিমও ২৩ সেপ্টেম্বর দাবি করেন যে, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের গায়ে যদি কোনো ধরনের আঘাত বা হত্যার ন্যূনতম স্পষ্ট চিহ্নও থাকে, তবে পুলিশ নিজ বাদী হয়ে হলেও অবশ্যই একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। আর যেসব লাশ পচে গলে যায়, তাদের ক্ষেত্রে লাশের সঙ্গে থাকা অন্যান্য পারিপার্শ্বিক আলামত বা ক্লু ধরে তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এগিয়ে নেওয়া হয়। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, অনেক ক্ষেত্রে লাশের কোনো পরিচয় বা কোনো দাবিদার না পাওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাদের জন্য তা চরম চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়, তবে নৌ পুলিশ অপরাধীদের ধরতে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা কখনোই থামায় না। অন্যদিকে, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা ২২ সেপ্টেম্বর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই ভয়াবহ সমস্যাটিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি তদন্ত কার্যক্রমে কাঠামোগত শৃঙ্খলা আনা, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট যেমন সিআইডি, পিবিআই ও নৌ পুলিশের মধ্যে কাজের সমন্বয় বৃদ্ধি, মাঠপর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ উন্নয়ন এবং আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেন। দেশের নদ-নদীগুলো যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্য হতে না পারে, তার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি শাখাকে এখনই সমন্বিতভাবে জেগে উঠতে হবে এবং প্রতিটি ভাসমান লাশের পেছনের সত্য উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
তষ্যসূত্র: নিউ এজ