• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৪ অপরাহ্ন
Headline
বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী সংসদে সরকারি দলের এমপিদের অঙ্গভঙ্গি: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জামায়াত আমিরের ‘সরকার জ্বালানি সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে’: সংসদে রুমিন ফারহানা কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট মেক্সিকো, স্পেন ও ব্রাজিল ইসরায়েলের অকুণ্ঠ প্রশংসায় ট্রাম্প, ঘনাচ্ছে নতুন বিতর্ক ‘ইরানকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ট্রাম্প কে?’: পেজেশকিয়ান

সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ‘মিসাইল সিটি’ সচল করছে ইরান

Reporter Name / ১১ Time View
Update : বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

টানা পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে গত ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভেবেছিল, হয়তো এই বিরতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কোনো ধরনের চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর উভয় পক্ষই নতুন করে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে বলে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে যেমন চলছে রুদ্ধদ্বার কূটনৈতিক আলোচনা, অন্যদিকে ঠিক সেই সময় যুদ্ধবিরতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভূগর্ভস্থ গোপন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা ‘মিসাইল সিটি’ পুনরায় সচল করার কাজে জোরেশোরে হাত দিয়েছে তেহরান।

স্যাটেলাইট চিত্রে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের চাঞ্চল্যকর দৃশ্য

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর বিশ্লেষণ এবং সাম্প্রতিক কিছু স্যাটেলাইট চিত্র থেকে ইরানের এই গোপন তৎপরতার বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। সিএনএন তাদের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সংঘাত চলাকালীন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলায় ইরানের এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোর প্রবেশপথ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। এখন যুদ্ধবিরতির এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান সেই প্রবেশপথগুলোতে জমে থাকা পাহাড়সম ধ্বংসাবশেষ দ্রুত সরিয়ে ফেলছে।

স্যাটেলাইট ইমেজে খুব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, টানেলের মুখে আটকে থাকা কংক্রিট ও পাথরের স্তূপ অপসারণের জন্য বিপুল পরিমাণ ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফ্রন্ট-এন্ড লোডার, এক্সকাভেটর এবং পেলোডারের মতো ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ডাম্প ট্রাকে তোলা হচ্ছে। এই চিত্রগুলো প্রমাণ করে যে, ইরান খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।

‘মিসাইল সিটি’ বা ভূগর্ভস্থ শহরের নেপথ্যের সমীকরণ

আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলো সাধারণ কোনো বাঙ্কার নয়, এগুলো একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্রের শহর। জাগরোজ পর্বতমালার গভীরে ৫০ থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত নিচে এই ঘাঁটিগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যা প্রচলিত বোমা এমনকি ভারী বাঙ্কার-বাস্টার বোমার আঘাত থেকেও নিরাপদ। এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলোর ভেতরে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় রেল নেটওয়ার্ক, মিসাইল মজুত করার বিশাল কংক্রিটের ডিপো এবং একাধিক বের হওয়ার পথ, যা অত্যন্ত সুরক্ষিত পপ-আপ দরজা দিয়ে ঢাকা থাকে।

জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজ-এর প্রখ্যাত গবেষক স্যাম লায়ার এই বিষয়ে গভীর আলোকপাত করেছেন। তিনি জানান, ইরানের এই সামরিক কৌশলটি মূলত শত্রুর প্রথম আঘাত (First Strike) সহ্য করার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

স্যাম লায়ার বলেন, “যুদ্ধবিরতির সময় এ ধরনের পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেও অস্বাভাবিক নয়। যুদ্ধবিরতি মানেই হলো প্রতিপক্ষ তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের একটি মহামূল্যবান সুযোগ পেয়ে যায়—যে সক্ষমতা ধ্বংস করতে এর আগে বিপুল পরিমাণ সময়, অর্থ ও সামরিক প্রচেষ্টা ব্যয় করা হয়েছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, ইরানের এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো প্রবল বোমাবর্ষণের মুখেও টিকে থাকা, দ্রুততম সময়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করা এবং সুযোগ পাওয়ামাত্রই প্রবল শক্তিতে পাল্টা হামলা চালানো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং এর প্রভাব

এর আগে সিএনএন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলা প্রায় ৪০ দিনের এই ভয়াবহ সংঘাতে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের এই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোর প্রবেশমুখ বা এক্সিট পয়েন্টগুলোতে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভেতরের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যেন কোনোভাবেই বাইরে বের করে উৎক্ষেপণ করা না যায়।

এই কৌশলটি প্রাথমিকভাবে বেশ সফলও হয়েছিল। মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, টানা বোমাবর্ষণের পরও ইরানের মজুতকৃত প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র এবং লঞ্চার সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল, কারণ সেগুলো ছিল মাটির অনেক গভীরে। তবে প্রবেশপথগুলো বোমার আঘাতে ধসে পড়ায় এই লঞ্চারগুলোর বেশিরভাগই ভূগর্ভে আটকা পড়েছিল। এখন ধ্বংসস্তূপ সরানোর মাধ্যমে ইরান সেই আটকে থাকা “অক্ষত অর্ধেক” সমরাস্ত্রকেই আবার দিনের আলোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

ইসলামাবাদে রুদ্ধদ্বার বৈঠক: কূটনীতির জটিল মারপ্যাঁচ

সামরিক এই চরম প্রস্তুতির সমান্তরালেই চলছে স্নায়ুক্ষয়ী কূটনীতি। চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের একটি স্থায়ী নিরসন খুঁজতে গত শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক রুদ্ধদ্বার ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির প্রভাবশালী পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। উভয় পক্ষের সংশ্লিষ্ট সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চালিয়ে গেলেও, শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন তারা। উভয় পক্ষই তাদের নিজ নিজ শর্তে অনড় থাকায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

শান্তিরক্ষা নাকি নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি?

তবে এই ব্যর্থতার পরও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি গণমাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী দুই দিনের মধ্যেই পাকিস্তানে আবারও দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছাতে চাইছে। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই আলোচনা সফল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া।

নতুন এই দফার আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তো থাকবেনই, পাশাপাশি আলোচনায় গতি আনতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও সম্ভাব্য এই বৈঠকে অংশ নিতে পারেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে আলোচনায় বসার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। ইরান তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এড়াতে আগ্রহী হলেও, তারা নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যূহকে কোনোভাবেই দুর্বল করতে রাজি নয়। তবে তেহরানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে সমঝোতার সুযোগ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দিন এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কি মধ্যপ্রাচ্যকে একটি স্থায়ী চুক্তির দিকে নিয়ে যায়, নাকি ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন করে প্রস্তুত হওয়া ইরানের ‘মিসাইল সিটি’ থেকে আরও ভয়ংকর কোনো সংঘাতের সূচনা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category