দেশের জনস্বাস্থ্য খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ডেঙ্গু ও হামের ভয়াল প্রাদুর্ভাব | স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু এবং হামের সংক্রমণ ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে | গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন | একই সঙ্গে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে এবং নতুন করে প্রায় তেরোশো মানুষের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তোলে |
ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, চলতি বছরে এই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ জনে গিয়ে ঠেকেছে | বছরজুড়ে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭ জন, যার মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৪২২ জন | মাসের হিসেবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেবল অক্টোবরেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৫ জন, যা চলতি বছরের যেকোনো মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ | এছাড়া সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে | বিভাগভিত্তিক রোগী ভর্তির চিত্রে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে, যেখানে এই সংখ্যা ৮৯৯ জন | এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪১ জন, খুলনায় ২৫০ জন, বরিশালে ২১৭ জন, রাজশাহীতে ২২৯ জন, ময়মনসিংহে ৯৭ জন এবং রংপুরে ১১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে সারাদেশেই ডেঙ্গুর বিস্তার মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে |
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের সংক্রমণ ও প্রাণহানিও দেশজুড়ে এক নীরব আতঙ্ক তৈরি করেছে | গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৭ জন এবং উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ হাজার ২৯৫ জনের শরীরে | এই নিয়ে চলতি বছরে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ১ হাজার ২৪০ জনে | এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০৫ জন এবং হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৩৫ জনের | গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৮৪ জনে, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫৪১ জনে | গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে দুজন করে এবং ঢাকা ও বরিশাল বিভাগে একজন করে মারা গেছেন | এছাড়া নতুন করে শনাক্ত হওয়া সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে একদিনে ৫০৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন |
ডেঙ্গু ও হামের এই দ্বিমুখী আক্রমণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বটে, তবে তা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় | মশক নিধন কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা এবং টিকাদান কার্যক্রমে গতি না আসার কারণে সংক্রমণ থামানো যাচ্ছে না | এখনই যদি রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনের কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা না হয় এবং হামের বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচি তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা না হয়, তবে এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘতর হবে | জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের সচেতনার পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই দ্বিমুখী মহামারি থেকে জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব |