বছরের পর বছর ধরে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও ভর্তুকির ওপর কৃত্রিমভাবে টিকে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঞ্জীভূত দেনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। জনগণের করের বিপুল অর্থ ব্যয় করে এসব সংস্থা চালু রাখা হলেও সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত কোনো অর্থনৈতিক প্রতিদান মিলছে না। উল্টো প্রতি অর্থবছর শেষে সরকারি এই বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দায় বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ বিশদ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৪ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি দায় সরাসরি সরকারের কাঁধে রয়েছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, অপেশাদার ব্যবস্থাপনা ও লোকসানের এই অন্তহীন ধারা বন্ধে কঠোর সংস্কার, অকার্যকর প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তি কিংবা দ্রুত বেসরকারীকরণের মতো সাহসী সিদ্ধান্ত ছাড়া জাতীয় বাজেটের ওপর এই চাপ কমানো অসম্ভব।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঋণ ও আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মূল্যায়িত ১২২টি সংস্থার মধ্যে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে ‘উচ্চ’ ও ‘অতি উচ্চ’ ঝুঁকির তালিকায় অবস্থান করছে। সামগ্রিক দায়ের প্রায় ৬২ শতাংশই তৈরি হয়েছে এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ডেসকো, জিটিসিএল, বাখরাবাদ গ্যাস, টেলিটক বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রায়ত্ত একাধিক চিনিকলসহ ১৯টি প্রতিষ্ঠান ‘অতি উচ্চ’ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কেবল বিপিডিবির একক দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা এবং ডেসকোর দায় প্রায় ৬১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। অতি ঝুঁকিতে থাকা প্রায় সব সংস্থাই বর্তমানে বড় ধরনের নিট লোকসানে নিমজ্জিত এবং এদের নিজস্ব পরিচালন আয় দিয়ে সাধারণ ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাও নেই। এর পাশাপাশি পেট্রোবাংলা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ঢাকা ওয়াসা, বিআইডব্লিউটিসি ও বিজেএমসিসহ ৩০টি সংস্থা রয়েছে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মোট পরিসম্পদের প্রায় ৬৯ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। গড় ঋণ-ইকুইটি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২৩, অর্থাৎ প্রতি এক টাকার নিজস্ব মূলধনের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো সোয়া দুই টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর বাইরে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার প্রচ্ছন্ন দায় বা কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটি, যার একটি বড় অংশ বিচারাধীন মামলা ও বিধিবদ্ধ দেনা সংক্রান্ত। এসব দায় ভবিষ্যতে কার্যকর হলে সরকারের আর্থিক ভারসাম্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। এই বিপুল ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছরই বাজেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি ও অনুদান দিতে হচ্ছে। কেবল ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই সাতটি সংস্থাকে ৪৬ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যার প্রায় সাড়ে ৯৪ শতাংশ গেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। পরবর্তী অর্থবছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে ৯১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও অডিট বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সুশাসনের চরম ঘাটতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এসব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ১২২টির মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকরা বড় ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি, তহবিল তছরুপ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। ৫১টি প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে এমন নেতিবাচক নিরীক্ষা প্রতিবেদন আসছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের বদলে রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং সাবেক-বর্তমান আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন দক্ষতাকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করেছে।
এই মারাত্মক আর্থিক অচলাবস্থা নিরসনে অর্থনীতিবিদরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী চারটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেসব বাণিজ্যিক খাতে বেসরকারি খাত ইতিমধ্যে সফলভাবে কাজ করছে, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি বেসরকারীকরণ বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ছেড়ে দেওয়া উচিত। যেসব প্রতিষ্ঠান কৌশলগত কারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক, সেখানে একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ রোধে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সম্পূর্ণ পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার বন্ধ থাকা ১৪টি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দিয়েছে এবং আরও কিছু কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে শ্রমিকদের সুরক্ষা, কারখানার বহুমূল্য জমি আবাসন বা ভিন্ন খাতে অপব্যবহার রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন কাঠামোতে নিজস্ব ইকুইটির হার বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এই আট লাখ কোটি টাকার দেনার বোঝা অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতিকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করবে।