বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে সামাজিক ন্যায্যতা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার নামে প্রতি বছর সরকারি তহবিল থেকে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার বণ্টনপ্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে এক চরম বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি। রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর আরোপিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের টাকায় পরিচালিত এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন খরচের বোঝা লাঘব করা এবং প্রান্তিক কৃষককে উৎপাদন খরচের ধাক্কা থেকে রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, সুবিধার এই স্রোত ঠিক উল্টো দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের একটি বিশদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক চরম অস্বস্তিকর চিত্র। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের বিদ্যুৎ, তরলীকৃত গ্যাস, রাসায়নিক সার এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে রাষ্ট্র যে অপরিসীম অর্থ ব্যয় করছে, তার বড় অংশই বাস্তবে গিলে খাচ্ছে তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ও সম্পদশালী পরিবারগুলো। অপরদিকে যাদের টিকে থাকার জন্য এই সহায়তার সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী হওয়ার কথা ছিল, সেই হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ সরকারি সুযোগ-সুবিধার ছাতা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক নীতিমালার তাত্ত্বিক দিক থেকে ভর্তুকি প্রদান কোনো ভুল পদক্ষেপ নয়, কিন্তু সমস্যাটি তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে মূলত লক্ষ্য নির্ধারণের চরম ব্যর্থতা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী বাছাইয়ের কাঠামোগত দুর্বলতায়। বিশ্বব্যাংকের সামগ্রিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করছে শুধু জ্বালানি, সার ও সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন সহায়তায়, যার অর্থমূল্য প্রায় ১৭.৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। কিন্তু এই বিপুল রাজকোষের অর্থ ব্যয় করার পরও দারিদ্র্য বিমোচনের যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার কথা ছিল, তা অর্জিত হচ্ছে না। ২০২২ সালের জাতীয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত বিশ্লেষণে ফুটে উঠেছে যে, সরকারের প্রত্যক্ষ কর ও নগদ আর্থিক সহায়তার কারণে আপাতদৃষ্টিতে জিনি সহগ ৫২.৪ পয়েন্ট থেকে হ্রাস পেয়ে ৫০.৭ পয়েন্টে নামে এবং দারিদ্র্যের হার ১৯.৬ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে ১৮.৮ শতাংশে নেমে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপিত পরোক্ষ করের যে নির্মম বোঝা দরিদ্র মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে, তা এই অর্জিত সাফল্যকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দেয়। পরোক্ষ করের প্রভাব বিবেচনায় নিলে জিনি সহগ বেড়ে দাঁড়ায় ৫১.৪-এ এবং দেশে দারিদ্র্যের প্রকৃত হার উল্টো বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২০.৬ শতাংশে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সহায়তার তুলনায় গরিব মানুষদের পকেট থেকে কর হিসেবে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক জনসেবাগুলোর আর্থিক উপযোগিতা হিসাবের মধ্যে আনলে সাধারণ পরিবারের নিট প্রাপ্তির চিত্র কিছুটা ইতিবাচক মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সেবাগুলোর চরম মানহীনতা ও অপর্যাপ্ততার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত ফল ভোগ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই চরম অদক্ষতা এমন এক সংকটময় মুহূর্তে দৃশ্যমান হচ্ছে যখন বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের সামগ্রিক সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে এক জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশের বিপজ্জনক বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিপরীতে ভর্তুকি খাতে ব্যয়ের চাপ লাগামহীন গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে জিডিপির মাত্র ০.৯ শতাংশ ছিল, তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২.২ শতাংশে। একই সঙ্গে পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই এখন ব্যয় হচ্ছে জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশ অর্থ, যা সরকারের মোট পরিচালন বাজেটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ দখল করে নিচ্ছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেশ গড়ার মৌলিক ভিত্তি—যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো অগ্রাধিকারমূলক উৎপাদনশীল খাতে সরকারের উন্নয়নমূলক বিনিয়োগের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ চিত্রে চোখ রাখলে ভর্তুকির এই উল্টোমুখী বণ্টনের চিত্রটি আরও বেশি ভয়ংকর ও স্পষ্ট রূপ ধারণ করে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ ছিল আট হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বা জিডিপির ০.৫ শতাংশ, তা অবিশ্বাস্য গতিতে স্ফীত হয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। আর এই বিপুল জ্বালানি ভর্তুকির প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ একাই শুষে নিচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ১০.৬৩ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও এটি সরবরাহ করতে গিয়ে প্রকৃত ব্যয়-উদ্ধারকারী খরচ দাঁড়াচ্ছে ১৫.১৬ টাকা। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি বা ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ৪.৫৩ টাকা, যা মেটাতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে ভর্তুকি হিসেবে সংস্থান করতে হচ্ছে। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া এই সুবিধার সিংহভাগ চলে যাচ্ছে ধনীদের ঘরে। বিশ্বব্যাংকের অনুসন্ধান অনুসারে, দেশের শীর্ষ ধনী ২০ শতাংশ পরিবার একাই ভোগ করছে জাতীয় বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় ৩৩ শতাংশ। অপরদিকে দেশের প্রান্তিক ও চরম দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ভাগ্যে জুটছে মাত্র ১৫.৪ শতাংশ সুবিধা। এমনকি রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর শীর্ষ ৫ শতাংশ অতি ধনী পরিবার একাই ভোগ করছে মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক অংশ।
অবশ্য আয়ের অনুপাতে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ ভর্তুকির কারণে একজন অতি দরিদ্র মানুষের আয়ের ওপর যে পরোক্ষ প্রভাব পড়ে তা তাদের মোট পারিবারিক আয়ের প্রায় ১৮.১ শতাংশের সমান, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব মাত্র ২.৩ শতাংশ। এর অর্থ হলো, সামান্য সরকারি সহায়তাও দরিদ্রদের জীবনে অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু কাঠামোগত ত্রুটির কারণে মোট তহবিলের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ধনীদের আরাম-আয়েশের জোগান দিতে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক সিমুলেশন বলছে, সরকার যদি কোনো বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়, তবে দেশে দারিদ্র্যের হার এক ধাক্কায় ২.৮ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে যাবে। এর ফলে প্রায় ৪৭ লাখ নতুন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হবে এবং বৈষম্যের সূচক জিনি সহগ ১.৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পাবে। যদিও এই ভর্তুকি বন্ধ করলে সরকারের জাতীয় আয়ের বা জিডিপির ১.৯ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় হতে পারত এবং সেই অর্থ থেকে নিচের ৪০ শতাংশ পরিবারকে সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলেও সরকারের কোষাগারে জিডিপির ০.৬ শতাংশ নিট উদ্বৃত্ত থাকত, কিন্তু বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অকার্যকারিতার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি পরিবারের কাছে সরাসরি ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়ার কোনো কার্যকর প্রশাসনিক চ্যানেল বর্তমানে দেশে নেই।
এই সংকট নিরসনে দরিদ্র পরিবারগুলোর সুরক্ষায় বর্তমানে প্রচলিত ‘লাইফলাইন’ ট্যারিফের কাঠামোতেও বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রচলিত নিয়মে মাসে সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিট বা কিলোওয়াট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ছাড়যুক্ত বা কম মূল্যের ট্যারিফ প্রযোজ্য রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশের অতি দরিদ্র পরিবারগুলোর মাত্র ৩৬.৪ শতাংশ এই ৫০ ইউনিটের সীমার মধ্যে নিজেদের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। কারণ একটি দরিদ্র পরিবারের মাসিক গড় বিদ্যুৎ খরচ বাস্তবে প্রায় ৬০.৮ ইউনিট। ফলে সামান্য কয়েক ইউনিট ব্যবহার বাড়লেই ৫০ ইউনিটের সীমা অতিক্রম করে পুরো বিদ্যুৎ বিলের ওপর উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক ধাপের চার্জ আরোপিত হয়, যা গরিব পরিবারগুলোর ওপর চরম আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তথ্যে দেখা গেছে, ৭৫.৭ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহার থাকে মাসে ৭৫ ইউনিটের নিচে। এ কারণে বিশ্বব্যাংক প্রস্তাব করেছে যে, লাইফলাইন সীমা বাড়িয়ে ৭৫ ইউনিট করা হোক এবং প্রতিটি ধাপে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যবহারের ওপর নির্ধারিত বিল আরোপ করা হোক। পাশাপাশি কোনো পরিবার যদি মাসে ১৫০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তবে তাদের জন্য সরকারি ভর্তুকি পুরোপুরি বাতিল করার বিধান রাখা প্রয়োজন। সংস্থাটির হিসাবে, এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করলে দারিদ্র্যের হারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না, সামাজিক বৈষম্য কমবে এবং একই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ সাশ্রয় হবে। তবে যেহেতু নিম্ন সীমার মধ্যেও ৪৪.৭ শতাংশ সচ্ছল পরিবার সুবিধা পেয়ে যেতে পারে, তাই কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহারের মিটার নয়, সুবিধাভোগীর পারিবারিক আয়ের সক্ষমতাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
এদিকে প্রাকৃতিক গ্যাস খাতেও দেশ এক গভীর কাঠামোগত আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রায় সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও বর্তমানে জাতীয় গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ করতে হচ্ছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে গ্যাস সরবরাহের গড় ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রতি এমএমবিটিইউ ৫.৭৯ মার্কিন ডলার, অথচ গ্রাহক পর্যায়ে তা গড়ে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫.৪৭ ডলারে। এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে গ্যাস খাতেও ভর্তুকির ভার জিডিপির ০.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আনুমানিক ০.৫ শতাংশে উন্নীত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে এই চাপ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শুধু ভর্তুকি না বাড়িয়ে শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে অপচয় রোধ করে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
কৃষি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত রাসায়নিক সার ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই রকম বৈষম্যমূলক ও ভারসাম্যহীন বণ্টনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। একসময় বাংলাদেশে ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যে ব্যাপক দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছিল, তার প্রায় ৬৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল কৃষির টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সার খাতে যেখানে ভর্তুকি ব্যয় ছিল সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা চার গুণ বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকায়। যেহেতু দেশের ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের ৮৫ শতাংশেরও বেশি সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে আমদানি করতে হয়, তাই এই বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে পুরো কৃষি বাজেটই চরমভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে তাৎক্ষণিক সার ভর্তুকির পেছনে।
কৃষি ও খাদ্য খাতের মোট বরাদ্দের ৪১.৫ শতাংশ ভর্তুকিতে গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ানোর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে একেবারে নগণ্য। যেমন কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি ও চাষাবাদ কৌশল শেখানোর জ্ঞান সম্প্রসারণে ব্যয় করা হচ্ছে মাত্র ৮.৫ শতাংশ, আধুনিক সেচ ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে ৫.৬ শতাংশ এবং কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর যে গবেষণার ওপর, সেই গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪.২ শতাংশ। অর্থাৎ গবেষণাগারে এক টাকা বরাদ্দের বিপরীতে তাৎক্ষণিক ভর্তুকি বাবদ খরচ করা হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা। এছাড়া পরিমাণভিত্তিক ঢালাও ভর্তুকি দেওয়ার কারণে সবচেয়ে বড় ২০ শতাংশ ধনী জমির মালিক মোট সার ভর্তুকির প্রায় ৫০ শতাংশ একাই ভোগ করছেন। বিপরীতে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্রতম ৪০ শতাংশ ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষির ভাগ্যে জুটছে মাত্র ১৩ শতাংশ সার ভর্তুকি। অথচ মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে জমিতে সুষম সার ব্যবহার করেন, যার ফলে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত রাসায়নিক সারের ব্যবহারে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, পরিধি ও পরিমাণের দিক থেকে এটি বিস্তৃত হলেও প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনে এর কার্যকারিতা অত্যন্ত দুর্বল। ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৯০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যার জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১.৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা জাতীয় জিডিপির প্রায় ২.১ শতাংশ। কিন্তু এই সুবিশাল বাজেটের প্রায় ৪৩ শতাংশই শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়ে যায় সরকারি কর্মচারীদের পেনশন প্রদান এবং সামগ্রিক কৃষি ভর্তুকির দায় পরিশোধে। সরকারের নিজস্ব সংজ্ঞায় যে ৪৮টি কর্মসূচিকে সরাসরি ‘দরিদ্রবান্ধব’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে মোট বরাদ্দের অংশ মাত্র ৩৯ শতাংশ, যার বড় অংশই আবার ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার মতো প্রধান চারটি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় থাকা পরিবারের হার ২৪.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৩৭.৬ শতাংশে উন্নীত হলেও সুযোগের সমবণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক বা প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনও কোনো ধরনের সরকারি সামাজিক সুরক্ষার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। অথচ এক চরম বৈপরীত্যে দেখা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের প্রায় ৩১ শতাংশ সদস্য কোনো না কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তার সুবিধা নিয়মিত পকেটে ভরছেন। আরও মারাত্মক বিষয় হলো, দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচিগুলো সবচেয়ে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৬৩ শতাংশ পরিবারকে সম্পূর্ণ বাইরে ফেলে রাখলেও সচ্ছল ধনী পরিবারের ১৮ শতাংশকে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এমনকি প্রাপ্ত সুবিধার বার্ষিক অঙ্কের দিক থেকেও ধনীরা গড়ে পাচ্ছেন ১০ হাজার ৪৭২ টাকা, যেখানে প্রকৃত একজন দরিদ্র মানুষ পাচ্ছেন মাত্র সাত হাজার ১৪০ টাকা। এই অদক্ষতার কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার পরও প্রচলিত এই কর্মসূচিগুলো জাতীয় দারিদ্র্যের হার মাত্র ৩.০৫ শতাংশ পয়েন্টের বেশি কমাতে পারছে না।
এই গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা ও বণ্টন বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সরকার অবশ্য কিছু ইতিবাচক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অর্থ বিভাগের অধীনে ইতোমধ্যে একটি আধুনিক একক নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে সরাসরি ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি সুবিধাভোগীকে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বা ডিএসআর চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য হবে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সঠিক আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়মিত তথ্যের ভিত্তিতে শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা। বিশ্বব্যাংকের সিমুলেশন বলছে, বিদ্যমান কর্মসূচির কাঠামোগত ত্রুটি দূর না করেও যদি শুধু সার্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা সফলভাবে কার্যকর করা যায়, তবে দারিদ্র্যের হার আরও ০.৯৫ শতাংশ পয়েন্ট কমানো সম্ভব, যার মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে মুক্ত হতে পারবে। আর যদি কোনো অতিরিক্ত ব্যয় না করে কেবল সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির ত্রুটি ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা যায়, তবেই জাতীয় দারিদ্র্যের হার এক লাফে ১.২৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে আসবে।
সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী সাফল্য আসতে পারে যদি সরকার একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার সুবিধাভোগী নির্বাচন আরও নির্ভুল করে এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস ও ভিজিএফের মতো বিক্ষিপ্ত স্কিমগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে একটি সুনির্দিষ্ট খাদ্য সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরি করা গেলে অতিরিক্ত মাত্র ০.২১ শতাংশ জিডিপির ব্যয়ে দেশের দারিদ্র্যের হার ১.৭২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে আনা সম্ভব। এতে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার প্রান্তিক নাগরিক স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবে এবং জাতীয় বৈষম্য নির্দেশক জিনি সহগ ০.৫২ পয়েন্ট হ্রাস পাবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হিসাবগুলো কোনো দৈব ভবিষ্যৎবাণী নয়, বরং সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও সৎ বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল এক বাস্তবসম্মত রূপরেখা।
বিশ্বব্যাংক কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছে যে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে ডিজিটালাইজড ও শতভাগ দুর্নীতিরোধক না করে যদি হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি ঢালাওভাবে প্রত্যাহার করা হয়, তবে পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হবে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এর ফলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জাতীয় দারিদ্র্য আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সরকার যত দ্রুত ভর্তুকি কাটছাঁট করবে, রাজকোষের আর্থিক সাশ্রয় হয়তো তত দ্রুত দৃশ্যমান হবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের কাছে সময়মতো ক্ষতিপূরণ পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে মানবকল্যাণের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা কোনো অর্থ দিয়েই পূরণ করা যাবে না। তাই সারের ক্ষেত্রে হঠাৎ দাম না বাড়িয়ে কয়েক মৌসুম আগে ঘোষণা দিয়ে ধাপে ধাপে সমন্বয় করা, ডিজিটাল কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত বর্গাচাষিদের হাতে সরাসরি নগদ প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়া এবং ভর্তুকি থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থ কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে ফ্যামিলি কার্ড ও ডিএসআর ডেটাবেইস বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তুকির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংকটের এই সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রের সম্পদ যদি প্রকৃত বঞ্চিত মানুষের বদলে বিত্তবানদের আরাম-আয়েশে অপচয় হতে থাকে, তবে তা কেবল অর্থনীতির জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত