বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়ন দল বা সেরা খেলোয়াড় বেছে নেওয়ার মঞ্চ নয়, নতুন নায়কের জন্ম দেওয়ারও সবচেয়ে বড় আসর। প্রতি চার বছর পরপর এই মঞ্চ থেকেই উঠে আসে এমন কিছু ফুটবলার, যাদের নাম আগে খুব কম মানুষই জানতেন, কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হতে না হতেই তারা হয়ে ওঠেন বিশ্বফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
২০২৬ বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়।
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন ৪৮টি দেশের ১ হাজার ২৪৮ জন ফুটবলার।
তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন নিজ নিজ দেশের পরিচিত মুখ, তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে খুব বেশি আলোচিত ছিলেন না। অথচ কয়েক সপ্তাহের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই বদলে দিয়েছে তাদের ক্যারিয়ার, জনপ্রিয়তা ও বাজারমূল্য।
এই বিশ্বকাপে এমনই সাতজন ফুটবলার নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে নতুন তারকার মর্যাদা পেয়েছেন।
ভোজিনিয়া (কেপ ভার্দে)
সম্ভবত এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।
৪০ বছর বয়সী কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক প্রমাণ করে দিয়েছেন, বয়স কখনোই বড় বাধা নয়। আফ্রিকার মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলেই যে ইতিহাস গড়েছে, তার অন্যতম প্রধান কারিগর ভোজিনিয়া।
গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দেন তিনি। শেষ ৩২-এ আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও দীর্ঘ সময় অসাধারণ গোলকিপিং করেন। দল শেষ পর্যন্ত বিদায় নিলেও ভোজিনিয়া হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী ছিল মাত্র ১৫ হাজার, টুর্নামেন্ট শেষে যা পৌঁছে যায় প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি। শুধু পারফরম্যান্স নয়, তার এই জনপ্রিয়তা দেখিয়ে দিয়েছে- বিশ্বকাপ কীভাবে একটি ক্যারিয়ার বদলে দিতে পারে।
হুলিয়ান কিনোনিয়েস (মেক্সিকো)
কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড খেলেন সৌদি লিগে। বিশ্বকাপের আগে প্রশ্ন ছিল, ২৯ বছর বয়সে মেক্সিকোর হয়ে আদৌ কি কিছু করতে পারবেন?
এই বিশ্বকাপে সেই উত্তর পেয়ে গেছে মেক্সিকো।
আজতেকায় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী গোলটি কিনোনিয়েসের পা থেকেই আসা। এরপর চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে গোল পেয়েছেন গ্রুপ পর্বে। শেষ ৩২-এ ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোলের পর শেষ ১৬-তেও আবার ইংল্যান্ডের সঙ্গে করেছেন লক্ষ্যভেদ। ৪ গোল করে ভাগ বসিয়েছেন এক বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডে।
ইসমায়েল সাইবারি (মরক্কো)
একটা সময় যার হাঁটা নিয়েই ছিল সংশয়, সেই ইসমায়েল সাইবারি এই বিশ্বকাপে হয়ে উঠেছেন মরক্কোর মুখ।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৭১ সেকেন্ডে গোল করে গড়েছেন মরক্কোর হয়ে দ্রুততম বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড, গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই পেয়েছেন গোলের দেখা।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ষোলোর টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টি এসেছে তার পা থেকেই। ডাচ লিগের গত মৌসুমের সেরা এই খেলোয়াড়কে এর মধ্যেই দলে ভিড়িয়েছে বায়ার্ন। চোটের জন্য শেষ আটে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলতে না পারাটাই হয়তো এই বিশ্বকাপে একমাত্র আক্ষেপ হয়ে থাকবে তার!
ইয়োহান মানজাম্বি (সুইজারল্যান্ড)
জেনেভায় জন্ম নেওয়া এই ২০ বছর বয়সী মিডফিল্ডারের বাবা কঙ্গোর, মা অ্যাঙ্গোলার। জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছে মাত্র গত বছর, কিন্তু বিশ্বকাপে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ হিসেবে।
বসনিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ১৯ মিনিটে করেন জোড়া গোল। সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী বিশ্বকাপে জোড়া গোলদাতা হওয়ার রেকর্ডও গড়েন তিনি। কানাডার বিপক্ষে তার জয়সূচক গোল দলকে গ্রুপসেরা করে।
চোটের কারণে শেষ ৩২-এর পর আর মাঠে নামতে পারেননি। তবে তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো ইতোমধ্যে তাকে নিয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। অ্যাস্টন ভিলার নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে।
ফোলারিন বালোগান (যুক্তরাষ্ট্র)
নিউইয়র্কে জন্ম, নাইজেরীয় বাবা-মা, বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে, খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে- বালোগান যেন আধুনিক ফুটবলের বৈশ্বিক পরিচয়ের প্রতীক।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই করেন জোড়া গোল। ১৯৩০ সালের পর বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খেলোয়াড়ের প্রথম জোড়া গোল এটি।
তবে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি লাল কার্ড বিতর্কেও ছিলেন আলোচনায়। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় নকআউট পর্বে খেলতে পারেন তিনি। যদিও দলকে আরও দূরে নিয়ে যেতে পারেননি, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আইয়ুব বুয়াদ্দি (মরক্কো)
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই অসাধারণ পরিণত ফুটবল খেলেছেন আইয়ুব বুয়াদ্দি। ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ থেকেই তার আত্মবিশ্বাস ও বল নিয়ন্ত্রণ নজর কাড়ে।
পুরো টুর্নামেন্টে মরক্কোর মধ্যমাঠের প্রাণ ছিলেন তিনি। শেষ আটে ফ্রান্সের বিপক্ষে বিদায় নিতে হলেও নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়ে গেছেন।
ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই ফুটবলার কয়েক মাস আগে মরক্কোর হয়ে অভিষেক করেন। লিলের হয়ে ১৬ বছর বয়সে ফরাসি লিগে অভিষেক এবং ১৭ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও বিশ্বকাপই তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তুলেছে।
মোস্তফা জিকো (মিসর)
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক গল্পগুলোর একটি মোস্তফা জিকোর।
বিশ্বকাপের আগে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ জাতীয় দলে ডাক পান। ২৯ বছর বয়সে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক, এরপর বিশ্বকাপে ২ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোল করেও ভিএআরের সিদ্ধান্তে আরেকটি গোল হারান। তবে সেই ম্যাচই তাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে দেয়।
ব্রাজিল কিংবদন্তি জিকোর নামে নাম রাখা এই মিডফিল্ডারের জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। ছোট ক্লাবে খেলে, বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও হাল ছাড়েননি। আজ তিনি মিসরের নতুন নায়ক।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অর্জন
২০২৬ বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করল, ফুটবল কেবল প্রতিষ্ঠিত তারকাদের খেলা নয়। বড় মঞ্চে সুযোগ পেলে নতুনরাও ইতিহাস লিখতে পারেন। ভোজিনিয়ার অবিশ্বাস্য গোলকিপিং, সাইবারির প্রত্যাবর্তনের গল্প, বুয়াদ্দির পরিণত ফুটবল কিংবা জিকোর সংগ্রামী জীবন- সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করেনি, বিশ্ব ফুটবলকে উপহার দিয়েছে আগামী দিনের নতুন মুখ।
সম্ভবত কয়েক বছর পর ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর ট্রফি জয়ের লড়াই কিংবা পরবর্তী বিশ্বকাপের আলোচনায় এই নামগুলোই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হবে। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপ তাদের শুধু পরিচিতিই দেয়নি, বিশ্বফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকা হওয়ার পথও খুলে দিয়েছে।