• সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
বড় ঝুঁকিতে জ্বালানি খাত ও রেমিটেন্স: হরমুজ সংকটে অতিরিক্ত ব্যয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রাণহানির উল্লম্ফন: জননিরাপত্তার সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ সুলভ ফলে নীরব বিষের ছায়া: বাণিজ্যিক পেয়ারায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ভারী ধাতু একীভূত পাঁচ ব্যাংকে ৭৫ হাজার আবেদন: ৫ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৭২ বছর বয়সে ৩৫০ কোটির ব্লকবাস্টার চীনে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে ঋতুপর্ণারা কিশোর বয়সী ছেলে সামলানো: ৭টি পরামর্শ ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে সময় কমানোর নির্দেশ বিমানমন্ত্রীর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে হবে: চিফ হুইপ সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে : ধর্মমন্ত্রী

একীভূত পাঁচ ব্যাংকে ৭৫ হাজার আবেদন: ৫ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

Reporter Name / ০ Time View
Update : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন আর্থিক লুটপাট ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের চূড়ান্ত খেসারত শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে সাধারণ আমানতকারী ও জাতীয় অর্থনীতির ঘাড়েই| বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম ও ঋণের নামে অর্থ পাচারের কারণে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়া পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে শেষমেশ নতুন টাকা ছাপিয়ে বিশেষ তারল্য জোগান দিতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে| সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ার প্রথম দফাতেই বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন করে আরও ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার বা তারল্য সহায়তা ছাড় করতে হয়েছে| এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে সাধারণ গ্রাহকদের জমানো অর্থ ফিরে পাওয়ার তীব্র উদ্বেগ ও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা| গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে গতকাল রোববার পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৭৫ হাজার ভুক্তভোগী গ্রাহক ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছেন| আমানতকারীদের এই বিপুল চাপই স্পষ্ট করে দেয় যে, সংকটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি কতটা গভীর ও সংবেদনশীল রূপ নিয়েছে|

যে পাঁচটি রুগ্‌ণ ব্যাংককে জোরপূর্বক একীভূত করে নতুন সত্ত্বা গঠন করতে হয়েছে, তাদের দীর্ঘ ইতিহাস মূলত অনিয়ম আর প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্যের করুণ দলিল| এই তালিকায় রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক| ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের আমলে এসব ব্যাংকের পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, বেনামি ঋণ বিতরণ ও নথিপত্র জালিয়াতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের নিত্যদিনের টাকা ফেরত দেওয়ার ন্যূনতম সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল| তৎকালীন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বা বিএবি-র সাবেক প্রভাবশালী সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল এক্সিম ব্যাংক| অন্যদিকে অপর চারটি ব্যাংকের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও পরিচালনা ছিল চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম মাসুদের কব্জায়| এই দুই প্রভাবশালী মহলের সীমাহীন আর্থিক অব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর ভল্ট ও তহবিল কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়, যার পরিণতিতে গ্রাহকরা নিজেদের বৈধ সঞ্চয় তুলতে এসে মাসের পর মাস কাউন্টার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন| পরবর্তীতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত উদ্যোগে ব্যাংকগুলোকে বিলুপ্ত করে একীভূতকরণের এই জটিল পথ বেছে নেওয়া হয়|

গ্রাহকদের দাবি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যে চরম আর্থিক পথ বেছে নিতে হয়েছে, তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে| বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংকটে পড়া এসব ব্যাংককে অতীতে বিভিন্ন ধাপে বিশেষ তারল্য সুবিধা হিসেবে প্রায় ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছিল| পুঞ্জীভূত সুদসহ বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেই পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকায়| বিপুল এই দেনা অপরিশোধিত থাকা সত্ত্বেও আমানতকারীদের তীব্র ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের সম্পূর্ণ আস্থা ধসে পড়া ঠেকাতে নতুন করে ছাপানো ৫ হাজার কোটি টাকা ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়েছে| অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়লে সরাসরি তা উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয় এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটায়| কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরাও এই চরম ঝুঁকি স্বীকার করে নিয়েছেন, তবে সার্বিক ব্যাংক খাতের অস্তিত্ব রক্ষা ও পদ্ধতিগত ধস এড়াতে এই মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি জেনেশুনেই একপ্রকার বাধ্য হয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে|

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আমানতকারীদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে| নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে তিনি দাবি করেন যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বৈধ আবেদনকারীদের অর্থ ক্রমান্বয়ে পরিশোধ করা হবে, ফলে গ্রাহকদের কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা আতঙ্কের মধ্যে পড়ার কারণ নেই| পরিকল্পনা অনুযায়ী, একীভূত এই নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা| এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরকার সরাসরি মূলধন হিসেবে জোগান দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা| বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হবে| এছাড়া সামগ্রিক স্কিমের বাইরে সাধারণ ক্ষুদ্র আমানতকারীদের দ্রুত স্বস্তি দিতে আমানত বীমা তহবিল থেকে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে, যা দিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রত্যেকের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে|

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমানতকারীদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক ‘হেয়ারকাট’ বা মূল টাকা কেটে রাখার নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে না| গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীরা তাদের সংশ্লিষ্ট মূল শাখা বা উপশাখায় গিয়ে সরাসরি অর্থ উত্তোলনের আবেদন জমা দিচ্ছেন| তবে এই অর্থ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি ও আর্থিক শর্ত আরোপ করেছে| নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গ্রাহকরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের মূল ব্যালান্স এবং বিভিন্ন মেয়াদি আমানতের প্রকৃত আসল টাকা শতভাগ ফেরত পাবেন| কিন্তু সংকটের এই বিশেষ উদ্ধার ব্যবস্থার আওতায় কোনো জমানো টাকার ওপর অর্জিত বা প্রদেয় অতিরিক্ত মুনাফা বা সুদ প্রদান করা হবে না| কোনো গ্রাহক যদি তাঁর মেয়াদি আমানতের মূল টাকা তুলে নেন, তবে ব্যাংকের সঙ্গে তাঁর সেই চুক্তির সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে ধরা হবে| বিপরীতে কোনো গ্রাহক যদি টাকা তুলে না নিয়ে নতুন ব্যাংকে হিসাব চালু রাখতে সম্মত হন, তবে কেবল তিনিই নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী প্রচলিত হারে মুনাফা প্রাপ্তির সুবিধা বজায় রাখতে পারবেন|

ব্যাংক খাতের এই চরম সংকট প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক যোগসাজশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল এবং সুশাসনের চরম অবক্ষয় কীভাবে একটি দেশের গোটা অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলতে পারে| লুটেরাদের অপকর্মের দায় শেষ পর্যন্ত করদাতার অর্থ এবং নতুন টাকা ছাপিয়ে মেটাতে হচ্ছে, যার পরোক্ষ মূল্য দিতে হবে বাজারের প্রতিটি সাধারণ ভোক্তাকে চড়া পণ্যের দামের মাধ্যমে| ৭৫ হাজার গ্রাহকের বিপুল আবেদন ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘদিনের জমা ক্ষোভ ও আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ| কেবল অর্থ ছাপিয়ে বা নতুন নাম দিয়ে এই রক্তক্ষরণ চিরতরে বন্ধ করা যাবে না| এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে ব্যাংকগুলোর অর্থ আত্মসাতে জড়িত রাঘববোয়াল ও তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের হোতাদের বিচারের আওতায় এনে পাচারকৃত অর্থ অবিলম্বে পুনরুদ্ধার করতে হবে| অন্যথায় একীভূতকরণের মতো কৃত্রিম জোড়াতালির মাধ্যমে জনতুষ্টি সাময়িকভাবে বজায় রাখা গেলেও দেশের সমগ্র আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব চরম অনিশ্চয়তার মুখেই থেকে যাবে|

 

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category