মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে| এই সংকটে সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা| যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় গত মার্চ থেকে জ্বালানি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বিল পরিশোধ বাবদ রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার গুনতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী| সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় হরমুজ সংকটের কারণে দেশের বাণিজ্য, সামগ্রিক অর্থনীতি, নৌপরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রবাসী শ্রমবাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে এবং তা নিরসনে সরকারের করণীয় কী হতে পারে, তা জানতে চেয়ে একযোগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়| গত ৩ সেপ্টেম্বর পাঠানো চিঠিতে বাণিজ্য, অর্থ, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে দ্রুত তথ্য ও সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে|
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শাখা থেকে পাঠানো নির্দেশনায় হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনার সংকট এবং তার বিপরীতে গৃহীত সরকারি উদ্যোগগুলোর হালনাগাদ চিত্র তলব করা হয়েছে| বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, বাজেটের ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি চাপ, পণ্য রপ্তানিতে রেকর্ড পরিবহন ব্যয়, আমদানিনির্ভর সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সব মিলিয়ে অর্থনীতি এক বহুমুখী আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে| অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এই কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতাই প্রমাণ করে যে ভূরাজনৈতিক এই সংকটের ব্যাপ্তি কেবল তেল আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দেশের সামষ্টিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথের লজিস্টিকস এবং রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে|
যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতি বিশ্লেষণে বড় তিনটি আর্থিক সূচক সরকারের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপের বাস্তব চিত্র উন্মোচন করছে| প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত দাম ও বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে| দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বর্ধিত খরচ মেটাতে জাতীয় বাজেট থেকে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ভর্তুকি জোগানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে| এই হিসাবের আওতায় ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, এলএনজিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৬৩৬ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন| তৃতীয়ত, বিপণন পর্যায়ে পুরো ব্যয় সমন্বয় না করায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ১১ জুন পর্যন্ত প্রকৃত আর্থিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা|
বিপিসির মাসভিত্তিক আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, মার্চের লোকসান ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা থেকে লাফিয়ে এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটিতে পৌঁছায়| এরপর মে মাসে ২ হাজার ৬২৩ কোটি এবং জুনের প্রথম এগারো দিনেই লোকসান হয় ৪ হাজার ৩০১ কোটি টাকা| আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার তেলের দাম পুরোপুরি বৃদ্ধি করেনি, যার সরাসরি ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাকে| এমন চরম পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প রুট ও বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের তৎপরতা শুরু করেছে| ইতিমধ্যে কাজাখস্তান থেকে এক লাখ টন ডিজেল এবং সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজি আমদানির প্রশাসনিক অনুমোদন নিশ্চিত করা হয়েছে| একই সঙ্গে দেশে কমপক্ষে তিন মাসের নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করতে কাজ চলছে| দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান বৃদ্ধি, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডের শিল্পাঞ্চলে নিয়ে আসা, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ এবং আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়| এছাড়া সরবরাহ বাড়াতে বেসরকারি খাতকেও জ্বালানি আমদানিতে যুক্ত করার নীতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে|
হরমুজ প্রণালির সংকটে মারাত্মক চাপে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রপ্তানি খাত| বিকল্প দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে গিয়ে কনটেইনারের ফ্রেইট চার্জ বা জাহাজের ভাড়া প্রায় চার গুণ বেড়ে গেছে| সংকট শুরুর আগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের একটি কনটেইনার পাঠাতে যেখানে খরচ হতো ১ হাজার ৫০০ ডলার, বিকল্প রুটে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫০০ ডলারে| পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ায় এবং জ্বালানি ও যুদ্ধঝুঁকির বিমা খরচ যুক্ত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতাদের কাছ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে| বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও অন্যান্য কম মুনাফার পণ্য রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক ক্রেতাদের ধরে রাখতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন| অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষির প্রধান উপকরণ ইউরিয়া সারের আন্তর্জাতিক দর যুদ্ধের শুরুতে প্রতি টন ৪০০ ডলার থেকে লাফিয়ে ৮৫০ ডলারে উঠেছিল, যা পরবর্তীতে নেমে প্রায় ৪৫৩ ডলারে স্থির হয়| সারের এই দামের অস্থিরতা কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করছে|
অর্থনীতির আরেকটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা প্রবাসী শ্রমবাজার| সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—এই ছয়টি উপসাগরীয় দেশ থেকেই মূলত বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬ থেকে ৫১ শতাংশ অর্জিত হয়| গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত কত দিন স্থায়ী হবে তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির গভীরতা| সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেখানকার উন্নয়ন ও অবকাঠামো কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে, যা প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও আয়ের পথকে সরাসরি সংকুচিত করবে| এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি আগাম কৌশল নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা|