• রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
৫০ বছরে নদীগর্ভে বিলীন ঢাকার পাঁচ শহরের সমান জমি জনবলের ভারে ন্যুব্জ রাষ্ট্রযন্ত্র: সেবার মানের দৈন্যদশা ও অর্থ অপচয়ের চক্রে বন্দি শীর্ষ পাঁচ খাত গাজা নিয়ে ইসরায়েলি পরিকল্পনার নিন্দা সৌদি-তুরস্কসহ আট মুসলিম দেশের সময় গড়াচ্ছে, ক্ষীণ হচ্ছে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা মশা নিধনে শতকোটির ধোঁকাবাজি: ডেঙ্গুর প্রকোপের মাঝেও রমরমা ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ইসলামিক ন্যাটোয় ঢাকার নজর: মক্কা চুক্তির আড়ালে জটিল ভূরাজনৈতিক খেলা আস্থার সংকটে নিমজ্জিত বাংলাদেশ টেলিভিশন: শতকোটি টাকার লোকসান আড়াল করতে নিছক লোগো বদলের নাটক ৭২ বছর বয়সে ৩৫০ কোটির ব্লকবাস্টার অনলাইনে অর্ধেকের বেশি তথ্যই ভুল বা বিভ্রান্তিকর ‘নিউইয়র্ক সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে’

৫০ বছরে নদীগর্ভে বিলীন ঢাকার পাঁচ শহরের সমান জমি

Reporter Name / ০ Time View
Update : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাঙন আর গড়ার এক নির্মম খেলায় মেতে থাকা বদ্বীপ বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে চলা নদীগুলো একদিকে যেমন প্রাণের সঞ্চার করে, অন্যদিকে কেড়ে নেয় মানুষের আজন্মের ভিটেমাটি| গত অর্ধশতাব্দী ধরে আগ্রাসী যমুনা ও গঙ্গা এবং তাদের মিলনস্থলে রূপ নেওয়া প্রমত্তা পদ্মা দেশের ভৌগোলিক মানচিত্র থেকে গিলে খেয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড| সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এই পরিসংখ্যানের বিশালত্ব অনুধাবন করতে হলে দেশের বৃহত্তম মেগাসিটি ঢাকার সঙ্গে এর তুলনা টানা যায়| এই তিন প্রধান নদীর করাল গ্রাসে হারিয়ে যাওয়া মোট জমির পরিমাণ রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় সিটি করপোরেশনের সম্মিলিত আয়তনের পাঁচ গুণেরও বেশি| নদীমাতৃক এই জনপদের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, সমৃদ্ধ জনপদ, স্কুল-কলেজ, উপাসনালয় আর শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বসতি এক নিমেষে তলিয়ে গেছে নদীগর্ভে| এই ভাঙন কেবল মাটির বিয়োগফল নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার অবলম্বনকে চিরতরে মুছে দেওয়ার এক অন্তহীন নীরব বিপর্যয়|
প্রকৃতির নিয়মে নদী যেমন একদিকে ভাঙে, অন্যদিকে পলি জমে জেগে ওঠে নতুন চর| পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিবেশ ও ভৌগোলিক তথ্যসেবা কেন্দ্র বা সিইজিআইএস-এর কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত পাঁচ দশকে হারিয়ে যাওয়া মোট জমির মধ্যে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা বালুচর হিসেবে পুনরায় নদীর বুক চিরে জেগে উঠেছে| কিন্তু নদীর এই ফিরে আসা কোনো স্থায়ী বা টেকসই স্বস্তি দিতে পারেনি| কারণ জেগে ওঠা পলিময় বালুচরগুলো নদীর গতিপথ বদলের সাথে সাথে নিয়মিতই আবার তলিয়ে যায়| ফলে নতুন চরের এই অংশটুকু বাদ দিলেও গত ৫০ বছরে দেশের স্থায়ী ভূখণ্ডের নিট বা প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার| অর্থাৎ শুধু নদীভাঙনের কারণেই বাংলাদেশ এমন এক বিপুল পরিমাণ জমি হারিয়েছে, যা গোটা ঢাকা শহরের মোট আয়তনের প্রায় চার গুণের সমান| স্থায়ী এই ভূখণ্ড হারানোর ক্ষতি কোনো সাধারণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব|
ভিটেমাটি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জীবনে নেমে আসে এক দুর্বিষহ যাযাবর অধ্যায়| নদীর করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে তারা বারবার নিজেদের বসতবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হন| আজ যেখানে নতুন চর জেগে উঠছে, সেখানে সামান্য একটু আশ্রয়ের খোঁজে তারা ছুটে যান, খড়কুটো দিয়ে আবার বাঁধেন নতুন সংসার| কিন্তু নদীর গতিপথের অস্থির পরিবর্তনের কারণে সেই নতুন চরের আশ্রয়টুকুও বেশিদিন স্থায়ী হয় না| কয়েক বছরের ব্যবধানে পুনরায় ভাঙনের মুখে পড়ে তাদের আশ্রয়হীন হতে হয়| এই অবিরাম ভাঙা-গড়ার খেলায় ক্লান্ত ও সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া বহু পরিবার একপর্যায়ে গ্রামীণ জীবনের সব মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়| কোনো উপায়ন্তর না দেখে জীবিকার অন্তিম সন্ধানে তারা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পাড়ি জমায় রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য কোনো বড় শহরের পানে| কিন্তু সেখানেও তাদের জন্য কোনো স্থায়ী বা নিরাপদ আশ্রয় অপেক্ষা করে থাকে না|
গ্রামে যাদের বিঘার পর বিঘা আবাদি জমি ছিল, গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধান ছিল, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা কারিগরি দক্ষতা না থাকায় শহরের নিষ্ঠুর জীবনে তাদের ঠাঁই হয় সম্পূর্ণ অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অসংগঠিত শ্রমবাজারে| কোনো মতে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা বেছে নেন দিনমজুরি, গৃহস্থালির কাজ কিংবা রিকশা টানার মতো হাড়ভাঙা খাটুনি| মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই হিসেবে তাদের আশ্রয় নিতে হয় শহরের নিচু, স্যাঁতসেঁতে, জলমগ্ন ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিগুলোতে| এসব বস্তিতে আগেই ভিড় জমিয়েছিল আগের বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানো গ্রামীণ মানুষের দল| রাজধানীর পল্লবী এলাকার ‘ভোলার বস্তি’ তার এক প্রকৃষ্ট ও জীবন্ত উদাহরণ| বর্তমানে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল এই বস্তির প্রায় প্রতিটি পরিবারই উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে নদীভাঙন ও প্রলয়ংকরী বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে রাজধানীতে আশ্রয় নিয়েছিল|
অভিবাসন গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম অংশের মিরপুর-১২, মোল্লা বস্তি ও দুয়ারীপাড়ার মতো এলাকাগুলোতে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া মানুষের এমন দলবদ্ধ বসবাসের একই ধরনের বিন্যাস গড়ে উঠেছে| নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলো গ্রাম ছেড়ে সরাসরি এসব বস্তিতে এসে আশ্রয় নেওয়ার ফলে নদীপাড় থেকে শহরের বস্তি পর্যন্ত একটি অদৃশ্য ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক ট্র্যাজেডির করিডোর তৈরি হয়েছে| এর সরাসরি প্রভাবে নির্দিষ্ট কিছু নগর এলাকায় চরম দারিদ্র্যের স্থায়ী পুঞ্জীভবন ঘটছে| নগরীর ঘিঞ্জি পরিবেশে মৌলিক নাগরিক সুবিধা, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম সংকটে দিন কাটে এসব মানুষের| যে কৃষক একসময় নিজ গ্রামের মাঠে মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতেন, তাকেই শহরের দমবন্ধ করা পরিবেশে সামান্য মজুরির জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রমে নিজেকে সঁপে দিতে হয়|
এমনই এক ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের নাম ইব্রাহিম মিয়া, যাঁর জীবন নদীভাঙনের নির্মমতার এক জীবন্ত দলিল| জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চরগিলাবাড়ি গ্রামে প্রমত্তা যমুনার তীরে তাঁর নিজস্ব তিন একরেরও বেশি উর্বর ফসলি জমি ছিল| সেখানে তিনি নিয়মিত আখ, চিনাবাদাম ও ধানের সোনালী ফসল ফলাতেন| তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ছিল তাঁর পরিপূর্ণ ও সুখী এক গ্রামীণ জীবন| কিন্তু এক সর্বগ্রাসী বন্যায় যমুনা তাঁর বসতবাড়ি ও তিন একর ফসলি জমি এক নিমেষে গিলে ফেলে| সর্বস্বান্ত হয়ে ইব্রাহিম বাধ্য হয়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন গাইবান্ধায় তাঁর মামার বাড়িতে| কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁর মতো একজন স্বাবলম্বী গৃহস্থের জন্য কেবল দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে খেতমজুর হিসেবে কাজ করার সুযোগ ছিল| নিজের একসময়ের সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের কারণে সেই কায়িক শ্রমের অপমান মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ছিল|
অবশেষে ২০০৯ সালে গ্রামের এক পরিচিত প্রতিবেশীর হাত ধরে ভাগ্যান্বেষণে তিনি পা রাখেন রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে| সেই থেকে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি সবজির বাজারে দিনমজুর বা কুলি হিসেবে মাল টানার কাজ করছেন| প্রতিদিন ভোর থেকে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি আয় করেন প্রায় এক হাজার টাকা, যার মধ্য থেকে থাকা-খাওয়ার জন্য ব্যয় হয় মাত্র দেড়শ টাকা| বাকি টাকা তিনি পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে বাড়িতে পাঠান| রাজধানীর এক চায়ের দোকানে বসে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইব্রাহিম গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, তিনি এই ইট-পাথরের শহরে পড়ে আছেন কেবল যমুনার বুকে তাঁর পৈতৃক জমি আবার জেগে ওঠার প্রতীক্ষায়| নদীর বুকে পলি জমে চর জাগলে তিনি সবকিছু ফেলে আবার নিজ গ্রাম ইসলামপুরে ফিরে যাবেন এবং নিজের জমিতে লাঙল চালাবেন—এমন এক অলীক আশাই তাঁকে এই বয়সেও বাঁচিয়ে রেখেছে|
নদীভাঙনের শিকার হয়ে কত মানুষ এভাবে প্রতিবছর বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তার কোনো সামগ্রিক বা কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান আজও রাষ্ট্র সংরক্ষণ করতে পারেনি| সিইজিআইএস-এর নদী, বদ্বীপ ও উপকূলীয় রূপতত্ত্ব বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ সুদীপ্ত কুমার হোড়ের দেওয়া হিসাবমতে, নদীগর্ভে প্রতি এক বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড বিলীন হওয়ার পেছনে গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ তাদের বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হন| জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এক চরম বিপজ্জনক পূর্বাভাসের কথা তুলে ধরা হয়েছে| তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সাতজন মানুষের মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে বাস্তুচ্যুত হবে| আর এই সম্ভাব্য সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতির প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশই ঘটবে সরাসরি নদীভাঙনের একক কারণে|
সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের নথিপত্রের দিকে তাকালে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের অপর্যাপ্ততা ও অসম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে| সংস্থাটির কাছে থাকা নদীভাঙন সংক্রান্ত সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্যটি ২০১৯ সালের| সেই বছর দিনাজপুর, জামালপুর, মুন্সিগঞ্জ, শেরপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ ও শরীয়তপুর—এই নয়টি জেলায় নদীভাঙনের শিকার হিসেবে ২৪ হাজার ৩২৮টি পরিবারকে নথিবদ্ধ করা হয়েছিল| ওই একটি বছরেই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৬৬ কোটি টাকা| অথচ সেই পরিসংখ্যানে দেশের শত শত নদী ও উপকূলীয় ভাঙনকবলিত জেলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসেনি| স্বতন্ত্র গবেষক ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সরকারি তালিকার চেয়ে বহুগুণ বেশি| অধ্যাপক মোহাম্মদ জামান ও মোস্তফা আলমের ২০২০ সালে প্রকাশিত গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘লিভিং অন দ্য এজ: চর ডুয়েলার্স অব বাংলাদেশ’-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার আবাদি ও বসতজমি স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে হারিয়ে যায়|
স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সহায়তায় ২০০৪ সাল থেকে সিইজিআইএস প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের প্রাক্কালে যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মা নদীর সম্ভাব্য ভাঙনপ্রবণ এলাকার বার্ষিক পূর্বাভাস জারি করে আসছে| তাদের বিগত পাঁচ দশকের তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই তিন প্রধান নদী মিলিয়ে বছরে গড়ে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার জমি গ্রাস করেছে| তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাঙনের এই তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে| ১৯৮০-এর দশকে কেবল যমুনা নদীর ভাঙনের গড় হার ছিল বছরে প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে গড়ে ১৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে| একইভাবে ১৯৯০-এর দশকে পদ্মা নদীর ভাঙনের হার বছরে প্রায় ২৩ বর্গকিলোমিটার থাকলেও বিগত এক দশকে তা গড়ে ১০ বর্গকিলোমিটারের নিচে নেমে এসেছে|
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে এই তিন নদী সম্মিলিতভাবে এক বছরে প্রায় ৯৫ বর্গকিলোমিটার জমি গ্রাস করেছিল, যার মধ্যে যমুনা একাই নিয়েছিল ৪৭ বর্গকিলোমিটার, পদ্মা ৩৬ বর্গকিলোমিটার এবং গঙ্গা ১২ বর্গকিলোমিটার| তবে ২০২৫ সালে এসে বার্ষিক ভাঙনের এই সম্মিলিত পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১০ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে| এর মধ্যে গঙ্গা নদীর তীরে ৫ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার, যমুনার তীরে ৩ দশমিক ৪৮ বর্গকিলোমিটার এবং পদ্মায় শূন্য দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার জমি ভেঙেছে| ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ বায়ান্ন বছরে যমুনা নদী এককভাবে ৯৪২ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড গ্রাস করেছে, যা তিন নদীর মোট ভাঙনের প্রায় ৬০ শতাংশ| এই সময়ে গঙ্গা নদী বিলীন করেছে ৩০২ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটার এবং পদ্মা নদী গ্রাস করেছে ৩৩৮ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা|
ভৌগোলিক নামকরণের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ বিভ্রান্তি প্রচলিত রয়েছে| ভারতের সীমানা পেরিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পরই সাধারণ মানুষের মুখে গঙ্গা নদীটি পদ্মা নামে পরিচিত পেলেও বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী তা ভিন্ন| গঙ্গা নদী বাংলাদেশে প্রবেশের পর প্রায় ২১৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হওয়ার পরই কেবল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘পদ্মা’ নাম ধারণ করে| এরপর এই সুবিশাল জলধারা আরও ১০০ কিলোমিটার পথ পদ্মা নামে অতিক্রম করে চাঁদপুরের মোহনায় গিয়ে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে| সিইজিআইএস-এর গবেষণায় কেবল এই প্রধান তিনটি নদীর হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, দেশের অন্যান্য নদ-নদীর ভাঙনের চিত্র এর বাইরে রয়ে গেছে|
চলতি বছরের জন্য সিইজিআইএস তাদের নতুন স্যাটেলাইট পূর্বাভাষে জানিয়েছে, গাইবান্ধা, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, পাবনা, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুর জেলার ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আরও প্রায় ৯ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে| এই প্রক্রিয়ায় এসব এলাকার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তিনটি মসজিদ, একটি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বেশ কয়েকটি সংযোগ সড়কসহ মোট ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার চরম হুমকিতে রয়েছে| সংস্থাটি সাধারণত ১০০ মিটারের চেয়ে ক্ষুদ্রাকার এলাকার ভাঙনের পূর্বাভাস তাদের মূল প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করে না| সিইজিআইএস-এর এই বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সাধারণত ভাঙন রোধে কাজ করে থাকে| তারা প্রধানত বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তীর রক্ষার চেষ্টা চালায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নিজেদের বসতভিটা ও ভিটেমাটি হারানোর হাত থেকে রক্ষা পায় না|
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাথুরিয়া গ্রামে সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে নদীভাঙনের মানবিক বিপর্যয়ের এক চরম বেদনাদায়ক চিত্র দেখা গেছে| পদ্মার ভাঙনপ্রবণ তীরের ঠিক কোল ঘেঁষে এখনো প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছে| মনসুরা বেগমের বাড়ির ঠিক পেছনের সংযোগ সড়কটি পদ্মা নদী ইতিমধ্যেই গ্রাস করে নিয়েছে| মনসুরা বেগম স্মৃতিচারণ করে জানান, মাত্র কয়েক বছর আগেও পদ্মা নদী তাঁদের মূল বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে শান্ত ভঙ্গিতে প্রবাহিত হতো| গত বছর সেই নদী এসে তাঁদের উঠানের সীমানায় ধাক্কা দেয় এবং এ বছর মাত্র দশ দিন আগে নদীর তীব্র স্রোত তাঁদের বসতবাড়ির পেছনের অর্ধেকেরও বেশি অংশ এক নিমেষে টেনে নিয়ে যায়|
ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া মনসুরা ও তাঁর স্বামী মজিদ ঘরামি তাঁদের পুরনো ভেঙে ফেলা টিনের চাল ও বেড়া কোনোমতে উদ্ধার করে একটি অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে কোনোমতে আশ্রয় নিয়েছেন| মনসুরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, দিনের আলোতেই হঠাৎ করে নদীর পাড় ধসে পড়তে শুরু করে| প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে এসে তাদের ঘরের খুঁটি উপড়ে ফেলতে এবং ঘরের মালপত্র সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন| বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৪০ জন শ্রমিককে কাথুরিয়া পাড়ে বড় বড় বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে নদী শাসন করতে দেখা গেছে, যার কারণে মনসুরার উঠানের অবশিষ্ট সামান্য অংশটুকু হয়তো সাময়িকভাবে রক্ষা পেয়েছে| কিন্তু তাঁদের পাশের গ্রাম মাঝেরকান্দির বাসিন্দাদের ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন ছিল না; পদ্মার সর্বগ্রাসী ভাঙনে পুরো জনপদটিই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং গ্রামবাসীরা বাধ্য হয়ে সরকারি জমিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন|
পদ্মার ভাঙনপারের এক অস্থায়ী চায়ের দোকানে বসে নিজের দুঃখগাথা তুলে ধরেন মাঝেরকান্দি গ্রামের বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ওহাব খাঁন| তিনি জানান, তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর গোটা গ্রামটি তিন তিনবার নিজের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে| মূল মাঝেরকান্দি গ্রামটি প্রায় ৪০ বছর আগে নদীর অপর পারে অবস্থিত ছিল, যা পদ্মার ভাঙনে পুরোপুরি বিলীন হয়ে গ্রামবাসীদের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছিল| এর প্রায় ২৫ বছর পর নদীর ঠিক মাঝখানে এক সুবিশাল চর জেগে উঠলে সেই স্থানচ্যুত মানুষগুলো আবার সেখানে জড়ো হন এবং নতুন সেই চরের নামও রাখেন মাঝেরকান্দি| কিন্তু তাঁদের সেই সুখের নীড়ও স্থায়ী হয়নি; মাত্র সাত বছর আগে নতুন সেই চরটিও প্রলয়ংকরী ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়| বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীরা এবার বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণ করা জমিতে এসে কোনোমতে ঠাঁই নেন, যেখান থেকে উচ্ছেদ করার জন্য কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিরতিতে নোটিশ পাঠিয়ে তাঁদের এলাকা ছাড়ার তাগিদ দিয়ে চলেছে|
প্রতিবার গ্রাম বদলানোর সাথে সাথে তাদের শূন্য থেকে আবার জীবনযুদ্ধ শুরু করতে হয়েছে| ওহাব খাঁন বলেন, নদীর বুকে জেগে ওঠা জমিতে তাঁরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, নারিকেল ও মাল্টার বাগান গড়ে তুলেছিলেন| কিন্তু নদী তাঁদের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে| আজ গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য দিনরাত ঘাম ঝরাচ্ছে| একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ ব্যাপারী জানান, একসময় তাঁর নিজের জমিতে এক মৌসুমে ২০০ মণ ধান উৎপাদিত হতো, আর আজ তিনি তাঁর দুই দিনমজুর ছেলের দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করে কোনোমতে বেঁচে আছেন| ঢাকার কারওয়ান বাজারে কাজ করা ইব্রাহিমের মতো মাঝেরকান্দি গ্রামের ওহাব ও রশিদের দলও প্রতিদিন পদ্মাপাড়ের শূন্য দৃষ্টিতে নদীর দিকে চেয়ে থাকেন এই আশায় যে, নদী একদিন তাঁদের পৈতৃক জমি ফিরিয়ে দেবে এবং তাঁরা আবার তাঁদের স্বপ্নের ঠিকানায় ফিরে গিয়ে ঘর বাঁধবেন|

তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category