• রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫২ অপরাহ্ন
Headline
৫০ বছরে নদীগর্ভে বিলীন ঢাকার পাঁচ শহরের সমান জমি জনবলের ভারে ন্যুব্জ রাষ্ট্রযন্ত্র: সেবার মানের দৈন্যদশা ও অর্থ অপচয়ের চক্রে বন্দি শীর্ষ পাঁচ খাত গাজা নিয়ে ইসরায়েলি পরিকল্পনার নিন্দা সৌদি-তুরস্কসহ আট মুসলিম দেশের সময় গড়াচ্ছে, ক্ষীণ হচ্ছে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা মশা নিধনে শতকোটির ধোঁকাবাজি: ডেঙ্গুর প্রকোপের মাঝেও রমরমা ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ইসলামিক ন্যাটোয় ঢাকার নজর: মক্কা চুক্তির আড়ালে জটিল ভূরাজনৈতিক খেলা আস্থার সংকটে নিমজ্জিত বাংলাদেশ টেলিভিশন: শতকোটি টাকার লোকসান আড়াল করতে নিছক লোগো বদলের নাটক ৭২ বছর বয়সে ৩৫০ কোটির ব্লকবাস্টার অনলাইনে অর্ধেকের বেশি তথ্যই ভুল বা বিভ্রান্তিকর ‘নিউইয়র্ক সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে’

জনবলের ভারে ন্যুব্জ রাষ্ট্রযন্ত্র: সেবার মানের দৈন্যদশা ও অর্থ অপচয়ের চক্রে বন্দি শীর্ষ পাঁচ খাত

Reporter Name / ০ Time View
Update : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নাগরিক স্বস্তির প্রধানতম মানদণ্ড হলো তার জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারি সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি| সাধারণ মানুষের করের টাকায় পরিচালিত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারছেন, তার ওপরই নির্ভর করে সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার অগ্রযাত্রা| তবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক মানচিত্রের দিকে গভীরভাবে তাকালে এক তীব্র হতাশাজনক ও বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়| সরকারের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের রাজস্ব খাতভুক্ত মোট ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন সরকারি চাকরিজীবীর অর্ধেকেরও বেশি নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র পাঁচটি প্রধান সংস্থায়| প্রাথমিক শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ বাহিনী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ও চিকিৎসাসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং রেলওয়ে—নাগরিকের জ্ঞানার্জন, জীবনের নিরাপত্তা, শারীরিক সুস্থতা, প্রজনন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও যাতায়াতের মতো অপরিহার্য মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই পাঁচটি খাতেই কাজ করছেন প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার কর্মী| তবে বিপুলসংখ্যক মানবসম্পদ নিয়োজিত থাকা এবং প্রতি বছর জাতীয় বাজেট থেকে তাদের পেছনে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ব্যয় সত্ত্বেও এই মৌলিক খাতগুলো যুগ যুগ ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা, তীব্র অদক্ষতা, পদ্ধতিগত জরাজীর্ণতা ও দুর্নীতির অচলাবস্থায় নিমজ্জিত হয়ে আছে| রাষ্ট্রযন্ত্রের এই পাঁচ শীর্ষ স্তম্ভ কার্যত জনবল ও অর্থনৈতিক বোঝার এক দানবীয় কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যার আউটপুট বা নাগরিক সেবা প্রাপ্তির স্তর তলানিতে ঠেকেছে|
সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতা বিপুল পরিমাণে বাড়ানোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে| ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা| নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বোঝা আরও প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে বলে অর্থনীতিবিদরা প্রাক্কলন করেছেন| অর্থাৎ জনগণের পকেট থেকে সংগৃহীত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে এই বর্ধিত ব্যয়ের বিশাল জোগান নিশ্চিত করতে হবে| স্বভাবতই করদাতা সাধারণ নাগরিক ও দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে, জনগণের টাকায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সেবা প্রদানে অক্ষম, অপেশাদার ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েই থাকে, তবে বেতন ও সুবিধা দ্বিগুণ করে রাষ্ট্রের কী লাভ হচ্ছে| নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার যখন পদে পদে লাঞ্ছিত হয়, প্রতিটি টেবিলে যখন ফাইল আটকে রেখে হয়রানি ও ঘুষের দাবি নিত্যদিনের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়, তখন কেবল আর্থিক ইনসেনটিভ বাড়িয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ করে তোলা যায় না| নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি যে, কর্মদক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, দলীয় প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল সংস্কার ছাড়া কেবল কোষাগারের অর্থ বিলিয়ে জনগণের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়|
দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয় যেখানে, সেই প্রাথমিক শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সবচেয়ে করুণ দৃশ্যটি চোখে পড়ে| সরকারের মোট জনবলের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন এই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে, যার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩১ জন| বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশ বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করছে| কিন্তু আকারের এই বিশালত্ব মানের দিক থেকে চরম ফাঁপা রূপ ধারণ করেছে| বিভিন্ন বৈশ্বিক ও জাতীয় শিক্ষা মূল্যায়ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এক ভয়ংকর ‘শিখন ঘাটতি’ বা লার্নিং ক্রাইসিসের ভেতরে হাবুডুবু খাচ্ছে| প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করা ১০ বছর বয়সী শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের নিজ মাতৃভাষা বাংলায় একটি সহজ বাক্য পড়তে কিংবা তার অর্থ বুঝতে পারে না| ইংরেজির ক্ষেত্রে এই হার আরও শোচনীয় এবং বয়স উপযোগী সাধারণ গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ন্যূনতম দক্ষতাহীন অবস্থায় শিশুরা প্রাথমিক স্তর পার করছে|
প্রাথমিকের এই গুণগত বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে প্রাচীন পাঠদান পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষের অনুপযুক্ত পরিবেশ এবং সর্বোপরি শিক্ষকদের একাংশের পেশাগত যোগ্যতাহীনতা ও উদাসীনতা| সরকারি নিয়ম অনুসারে প্রতিটি প্রাথমিক শিক্ষকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বা পিটিআই থেকে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা থাকলেও বাস্তবতা হলো, বর্তমানে প্রায় এক লাখ শিক্ষক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন, যা মোট জনবলের এক-চতুর্থাংশ| প্রশিক্ষণ পেলেই যে পরিস্থিতির রূপান্তর ঘটছে, তাও নয়| জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি বা নেপের সাম্প্রতিক এক তথ্যবহুল গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যে চরম জড়তা ও অনীহা কাজ করে| আধুনিক একুশ শতকের প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষণপদ্ধতি ও ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহারে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক নিজেদের পারদর্শী দাবি করলেও গবেষণার বাস্তব মূল্যায়নে দেখা গেছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক ক্লাসে মাল্টিমিডিয়া বা তথ্যপ্রযুক্তির ন্যূনতম প্রয়োগ ঘটাতে সক্ষম হচ্ছেন| অর্থাৎ শিক্ষকদের নিজস্ব দক্ষতা ও বাস্তব শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মাঝে এক বিরাট ফারাক বিরাজ করছে|
শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, কেবল শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি পেলেই শিক্ষার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না| সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এই বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন| তাঁর মতে, শিক্ষকদের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার জন্য বেতন বাড়ানো যৌক্তিক হলেও তার সঙ্গে কঠোর জবাবদিহি ও ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি যুক্ত করা না হলে পুরো অর্থই অপচয় হবে| শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কীভাবে পড়াচ্ছেন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি কতটা যত্নবান হচ্ছেন এবং পাঠ্যক্রমের শিখনফল কতটুকু অর্জিত হচ্ছে, তা নিয়মিত মনিটরিং করা অপরিহার্য| একই সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁদের আয় ও সম্পত্তির হিসাব সার্বজনীনভাবে উন্মুক্ত রাখার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন| যদিও সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনের দাবি, বিগত সরকারের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের জন্য ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ এবং ব্যাপকভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তৃণমূলের শিক্ষক সমাজের মানসিকতা ও কার্যকর তদারকির আমূল পরিবর্তন না হলে প্রযুক্তির এই সরঞ্জামগুলোও শেষ পর্যন্ত ধুলোমলিন হয়ে পড়ে থাকবে|
সরকারি জনবলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ নিয়োজিত রয়েছে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে| বর্তমানে এই বাহিনীতে নিয়মিত কর্মরত সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৫০০ জনে| বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক জমানায় পুলিশ বাহিনীর সংখ্যাগত কলেবর প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে| ২০১০ সালেও যেখানে বাহিনীর সদস্য ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার, সেখানে বর্তমান সময় পর্যন্ত নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার জনবল| এই সময়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কাউন্টার টেরোরিজম ও মেট্রোরেল সুরক্ষার মতো বহু বিশেষায়িত ইউনিট ও শাখা খোলা হয়েছে এবং বাহিনীতে শুধু ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদের সংখ্যাই দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজারের ওপরে| এমনকি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী সরকারের সময়েও আরও প্রায় ৩০ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে| কিন্তু সদস্য সংখ্যার এই কৃত্রিম স্ফীতি সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বা পুলিশের পেশাদারি উৎকর্ষে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি|
সদস্য সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সেই অনুপাতে বাহিনীর আবাসন, পরিবহন ও তদন্তের আধুনিক লজিস্টিক সুবিধার কোনো সুষম উন্নয়ন ঘটেনি| পুলিশ সদর দপ্তরের নিজস্ব নথিপত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, বাহিনীর মোট জনবলের মাত্র ১০ শতাংশ সদস্য সরকারি আবাসন সুবিধা পান| বাকি ৯০ শতাংশ সদস্যকে চরম আবাসন সংকটের মুখে ব্যক্তিউদ্যোগে চড়া ভাড়ায় মানবেতর পরিবেশে থাকতে হয়| আবাসনহীনতার এই চাপ বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও বড় বড় বিভাগীয় শহরে কর্মরত অধস্তন পুলিশ সদস্যদের মারাত্মক আর্থিক ও মানসিক সংকটে ফেলে দেয়, যা অনেক সময় তাদের অনৈতিক উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়| একইভাবে যানবাহন সংকটের চিত্রটিও ভয়াবহ; বাহিনীতে প্রয়োজনের তুলনায় ৬ হাজার ১৬০টি গাড়ির ঘাটতি রয়েছে| বহু থানা ও ফাঁড়িতে নিয়মিত টহল দেওয়ার মতো একটি সচল গাড়িও নেই, ফলে অপরাধস্থলে দ্রুত পৌঁছানো কিংবা কার্যকর পুলিশিং চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে|
লজিস্টিক ঘাটতির চেয়েও বড় সংকট হলো পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা, নৈতিক স্খলন ও পেশাদারি দক্ষতার মারাত্মক পতন| অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিসের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শান্তি সূচকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার নিরিখে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১১৭তম, যা দক্ষিণ এশিয়াতেই চতুর্থ| অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের তৈরি ‘ওয়ার্ল্ড ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড পুলিশ ইনডেক্স’-এ ১২৫টি দেশের পুলিশ বাহিনীর কার্যকারিতা মূল্যায়নে বাংলাদেশের পুলিশকে ১০০তম অবস্থানে রাখা হয়েছে| মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নাগরিকের বন্ধু হওয়ার বদলে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষা, ক্ষমতার অপব্যবহার, হেফাজতে নির্যাতন এবং ঘুষের সংস্কৃতির কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এই বাহিনীর মান এত নিচে নেমে গেছে| সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, বাহিনীর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের স্বচ্ছতা তৈরি না করে কেবল অন্ধের মতো সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে চললে বাহিনীতে অস্থিরতা বাড়বে বৈ কমবে না|
জনবল কাঠামোর তৃতীয় শীর্ষ স্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যেখানে কর্মরত আছেন ৭৯ হাজার ৮৫৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী| কিন্তু এই বিশাল বাহিনীর উপস্থিতিও দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রোগ সারাতে পারছে না| সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, জরুরি ওষুধের সংকট, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির বিকল অবস্থা এবং দালাল চক্রের অবাধ দৌরাত্ম্য সাধারণ নাগরিকের জন্য এক দুঃসহ অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ ইনডেক্সে ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্জন মাত্র ৫৪, যা প্রমাণ করে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী ন্যূনতম মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত| ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ প্রায় সাত কোটি নাগরিক নিজেদের পারিবারিক চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কায় চরম আর্থিক অনটন ও দারিদ্র্যের শিকার হয়েছেন| রোগীকে নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার সিংহভাগ খরচ মেটাতে বাধ্য হওয়ার এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো কতটা অকার্যকর|
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়াই স্বাস্থ্য খাতে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ ও অবকাঠামো গড়ার কারণেই এই বিপর্যয় নেমে এসেছে| আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জনসংখ্যা ও ভবিষ্যৎ রোগের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত ১০ বছর মেয়াদি মানবসম্পদ রূপরেখা তৈরি না করায় চিকিৎসকদের সঠিক পদায়ন ও ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না| দেশের আনাচে-কানাচে পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব ও শয্যা ছাড়া যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তাতে চিকিৎসার মানসম্মত শিক্ষা ধ্বংস হয়ে মানহীন ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বেড়েছে| তৃণমূলের গ্রামীণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনিশিয়ান নেই, আর যেখানে চিকিৎসক আছেন সেখানে অস্ত্রোপচারের কোনো পরিবেশ নেই| ফলে সাধারণ সর্দি-জ্বর ছাড়া সামান্য জটিল রোগের জন্যও রোগীকে ছুটে আসতে হয় রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজগুলোতে, যার পরিণতিতে টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের মেঝেতে ও বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়|
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অদক্ষতার সমান্তরালে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অবস্থাও বর্তমানে চরম নাজুক| ৩৬ হাজার ৯৩৬ জনবলের এই সংস্থায় বর্তমানে তীব্র সরবরাহ সংকট ও নীতিগত বিভ্রান্তি চলছে| সাবেক সরকারগুলোর সময় থেকে শুরু হওয়া গাফিলতির কারণে চলতি বছরের শুরু থেকেই সারা দেশের মাঠপর্যায়ে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর হাহাকার তৈরি হয়েছে| অধিদপ্তরের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৩৯৪টি উপজেলায় সরকারি কনডম, ৩৩৫টি উপজেলায় খাবার বড়ি এবং ৩৯৫টি উপজেলায় দীর্ঘমেয়াদি আইইউডি পদ্ধতির সরবরাহে মারাত্মক সংকট দেখা গেছে| এক বছরের ব্যবধানে মাঠপর্যায়ে কনডম বিতরণ প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার থেকে নেমে মাত্র ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে এবং খাবার বড়ি বিতরণ আড়াই লাখ থেকে অর্ধেকে নেমে গেছে| এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও জাতীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের ওপর| জাতিসংঘ শিশু তহবিল ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক যৌথ জরিপে দেখা গেছে, দীর্ঘ এক দশক পর দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার বা টিএফআর ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে, যা অতিরিক্ত জনসংখ্যার এই দেশে এক বিরাট অশনিসংকেত|
তালিকার পঞ্চম বৃহৎ সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে, যার পে রোলে নিয়মিত কর্মরত রয়েছেন ২৫ হাজার ৫২২ জন কর্মী| গণপরিবহন হিসেবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ভরসা হওয়ার কথা থাকলেও রেলওয়ে এখন অব্যবস্থাপনা, লোকসান ও চরম দুর্নীতির সমার্থক হয়ে উঠেছে| বিগত দেড় দশকে নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণ, বিদেশি ঋণে বিলাসবহুল ইঞ্জিন-কোচ ক্রয় এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা রেল খাতে ঢালা হয়েছে| কিন্তু এই পর্বতপ্রমাণ বিনিয়োগের বিপরীতে নাগরিক সেবা উন্নত হওয়া তো দূরের কথা, ট্রেনের নিয়মিত সিডিউল বিপর্যয়, ঘন ঘন ইঞ্জিন বিকল হওয়া, জরাজীর্ণ লাইনে একের পর এক প্রাণঘাতী লাইনচ্যুতি, ট্রেনের অভ্যন্তরে নোংরা পরিবেশ এবং কাউন্টারের টিকিট নিমেষেই উধাও হয়ে কালোবাজারিদের হাতে চলে যাওয়ার মতো সংকটের কোনো সমাধান হয়নি|
রেলওয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতটি দৃশ্যমান হয়েছে এর পরিচালন দক্ষতা বা অপারেটিং রেশিওতে| ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে যেখানে এক টাকা আয় করতে রেলওয়ের খরচ হতো মাত্র ৯৫ দশমিক ৯ পয়সা, সেখানে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে ১ টাকা আয় করতে রেলের পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সায়| সর্বশেষ অর্থবছরে রেলের পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা, অথচ আয় নেমে এসেছে মাত্র ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকায়| অর্থাৎ আয় ৮০ কোটি টাকা কমে গেলেও ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ছয়শ কোটি টাকার বেশি| বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বের আধুনিক দেশগুলো রেলকে যোগাযোগের মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলে মুনাফায় চললেও বাংলাদেশে অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প ও কেনাকাটায় দুর্নীতির কারণে রেল কেবল দেনার বোঝা বাড়াচ্ছে| প্রতিষ্ঠানের জনবলের কাজের মান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি না করে ঢালাওভাবে বেতন বাড়িয়ে দিলে এই আর্থিক রক্তক্ষরণ থামানো যাবে না|
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন ভঙ্গুর অবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না| প্রাথমিক শিক্ষার ক্লাসরুম থেকে শুরু করে রেলের প্ল্যাটফর্ম কিংবা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় সাধারণ নাগরিক যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তার মূল কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ কর্তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংস্কারমুখী মানসিকতার অভাব| জনবল কিংবা বেতন কাঠামো বাড়ানো কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু সেই ব্যয়ের সমপরিমাণ দায়িত্বশীলতা ও সেবার মান যদি নাগরিক না পায়, তবে তা রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের এক প্রকার প্রতারণার শামিল| এই পাঁচ প্রধান খাতকে অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে হবে| মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে পারফরম্যান্স বোনাস ও শাস্তির ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং সেবাপ্রদানের প্রতিটি স্তরকে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে| প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যদি নিজেদের ‘সেবক’ না ভেবে কেবল সুযোগ-সুবিধাভোগী একটি বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে ধরে রাখেন, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শতভাগ বেতন বাড়িয়েও এই ভঙ্গুর ও ক্ষয়ে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক কঙ্কালটিকে রক্ষা করতে পারবে না|

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category