রাজধানীর রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইকারীর টানে ছিটকে পড়ে স্কুলশিক্ষিকার করুণ মৃত্যু থেকে শুরু করে মাদক কারবারের দখলদারিত্ব নিয়ে সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ—আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির এক বিপজ্জনক চিত্র ফুটে উঠেছে| গত ৩০ আগস্ট রাতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগ ও মুন্সিরটেক এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বন্দুকযুদ্ধে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন| এর ঠিক একদিন আগেই ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকা আসা বগুড়ার এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন ছিনতাইকারীর শিকার হয়ে প্রাণ হারান| সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং সামগ্রিক জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ধসে পড়ার স্পষ্ট প্রমাণ| রাজধানীসহ সারা দেশে চাঁদাবাজি, প্রকাশ্য ছিনতাই, মাদকের বিস্তার, নারী ও শিশু নির্যাতন, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং কিশোর গ্যাংয়ের সশস্ত্র অপতৎপরতা জনজীবনকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে|
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোতে অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে| এই ছয় মাসে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় এক লাখ (৯৯ হাজার ৯৯২টি) মামলা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু খুনের মামলাই ছিল ১ হাজার ৭৯১টি| তথ্যমতে, প্রতি মাসে গড়ে ১৬ হাজার ৬৬৫টির বেশি এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৩টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে| অপরাধের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা, যেখানে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি| এছাড়া দ্রুত বিচার আইনে ৪০৮টি, ডাকাতির ঘটনায় ২৬৫টি, ছিনতাইয়ের ৯MD৪টি এবং অপহরণের ঘটনায় ৫১২টি মামলা দায়ের করা হয়| চুরি ও সিঁধেল চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে যথাক্রমে ৪ হাজার ৮০৮টি ও ১ হাজার ৫৯১টি| অপরাধীদের প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ হামলার শিকার হওয়ার ঘটনায় ৩১৬টি মামলা হয়েছে এবং অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালান উদ্ধার সংক্রান্ত ধারায় দায়ের হয়েছে ৩৬ হাজার ২৯৮টি মামলা|
পূর্ববর্তী ছয় মাসের (২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি) তুলনায় সামগ্রিক অপরাধের গ্রাফ স্পষ্টতই ঊর্ধ্বমুখী| সেই সময় সারা দেশে মোট মামলা হয়েছিল ৮৯ হাজার ১২টি, যার মধ্যে হত্যা মামলা ছিল ১ হাজার ৭৮০টি| এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১০ হাজার ৯০টি, ডাকাতির ৩২৮টি, ছিনতাইয়ের ৯৬০টি, অপহরণের ৫৬৩টি এবং অন্যান্য চুরির ঘটনায় ৩৮ হাজার ২৪৯টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল| পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ছিল ২৮৫টি এবং উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছিল ২৯ হাজার ৪৮৫টি| দুই মেয়াদের এই তুলনামূলক উপাত্ত প্রমাণ করে যে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অপরাধের সার্বিক সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে|
রাজধানী ঢাকার বাস্তবতায় চোখ রাখলেও অপরাধের মারাত্মক বিস্তার চোখে পড়ে| ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মোট ৮ হাজার ৪৪টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে| এর মধ্যে খুনের ঘটনায় ১২৭টি এবং দস্যুতার ঘটনায় ১৩১টি মামলা হয়েছে| একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৭৭৮টি মামলা রেকর্ড হয়, যার মধ্যে ৩২৮টি ছিল ধর্ষণের মামলা| ডাকাতির ১৮টি, দ্রুত বিচার আইনে ২৯টি, অপহরণের ৯৪টি, সিঁধেল চুরির ২৬২টি এবং গাড়ি চুরির ২২৪টি মামলা নথিবদ্ধ করা হয়েছে| উদ্ধারজনিত ৩ হাজার ২৭টি মামলার মধ্যে মাদকের মামলাই ছিল ২ হাজার ৭৬২টি এবং অস্ত্রের মামলা ৮৪টি| এর আগের ছয় মাসে রাজধানীতে মোট ৮ হাজার ৬৬৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল, যেখানে খুনের মামলা ছিল ১৪৭টি এবং ধর্ষণের মামলা ছিল ৩১৭টি|
আইনশৃঙ্খলার অবনতির মধ্যে চাঁদাবাজির ভয়ংকর ব্যাপ্তি নতুন মাত্রা ধারণ করেছে| শুধু ফুটপাতের খুদে দোকানদার বা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানই নয়, চাঁদাবাজদের লক্ষ্যবস্তু এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়েছে| ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) নিশ্চিত করেছে যে, গত ১৭ ও ১৯ আগস্ট চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অন্তত চারটি দেশের দূতাবাস ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে চাঁদা দাবি করে হুমকি সংবলিত ই-মেইল পাঠিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র| কূটনৈতিক পাড়ায় ভীতি সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার এমন অপতৎপরতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ| ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করতে বিশেষ তদন্ত দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে|
অন্যদিকে দেশের পাইকারি বাজার, পরিবহন খাত ও রিয়েল এস্টেট নির্মাণকাজে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে| চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় হত্যা ও রক্তপাতের মতো ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে| গত ১৫ আগস্ট পুরান ঢাকার সদরঘাটের ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে একজন নিহত হন| চট্টগ্রামের হামজারবাগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন ভবনের ফটকে প্রকাশ্য গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা| এছাড়া পিরোজপুরের কদমতলায় বালু সরবরাহের ঠিকাদারি কাজে চাঁদা না পেয়ে পাইপলাইন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতাসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ| রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগে স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দখল নিয়ে আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করছে|
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবশ্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করছে| ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ ওসমান গণি জানিয়েছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়া তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে| তিনি উল্লেখ করেন, চাঞ্চল্যকর ঘটনার সিংহভাগ রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হলেও জামিনপ্রাপ্ত অপরাধীরা পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রতিটি মামলায় জামিনের জোরালো বিরোধিতা করছে| ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, গোয়েন্দা শাখা ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে সমন্বিত করে নগরীতে টহল বাড়ানো হয়েছে| কিশোর গ্যাংয়ের মূলোৎপাটনে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে শূন্য সহনশীলতা নীতিতে কাজ করছে|
অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতির মুখে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন| তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কিংবা মাদক চক্রের সঙ্গে কোনো আপস করা চলবে না| কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীদের প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করলে বা দায়িত্বে গাফিলতি দেখালে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে| স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার পর সারা দেশে দখলবাজ ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে|