দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত এখন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চরম সংকটে পড়ে কার্যত অচল হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে| রোগমুক্তির যে আশ্রয়স্থল মানুষের শেষ ভরসা, সেই হাসপাতালগুলোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে ডুবে থাকায় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন| রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে বিদ্যুৎ চলে গেলে নেমে আসছে এক ভীতিকর পরিস্থিতি| বিকল্প হিসেবে থাকা জেনারেটর কিংবা আইপিএস ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় অনেক ক্ষেত্রে অপারেশন থিয়েটারে মোবাইল ফোন ও টর্চের ক্ষণস্থায়ী আলো জ্বেলে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা| এমন বাস্তবতায় অস্ত্রোপচার টেবিল থেকে শুরু করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন যেকোনো মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় স্বজনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছে|
বিশেষায়িত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে| জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে| বিদ্যুৎ না থাকলে স্বয়ংক্রিয় রেডিওথেরাপির মতো সংবেদনশীল চিকিৎসাযন্ত্র সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে| একই সঙ্গে ব্লাড ব্যাংকের জীবনরক্ষাকারী রক্ত ও প্লাজমা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর যন্ত্রপাতিতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে| সংশ্লিষ্টদের মতে, সেখানে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলেও তা বিশাল হাসপাতালের সার্বিক লোড সামলানোর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল| ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে সব জরুরি যন্ত্র একসঙ্গে সচল রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে| জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, রেডিওথেরাপির মতো জটিল মেশিন যদি আধা ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎহীন থাকে, তবে পুরো কারিগরি ব্যবস্থাই স্থায়ী শাটডাউনে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ক্যানসার রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে|
ঢাকার বাইরের জেলা ও মফস্বলের চিত্রটি আরও বেশি করুণ ও উদ্বেগজনক| চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রতিদিনের ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার দায়িত্ব পালনের মধ্যে গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টাই কাটাতে হয় লোডশেডিংয়ের কবলে| সম্প্রতি হাসপাতালটির মূল জেনারেটরের স্বয়ংক্রিয় ম্যাগনেটিক এটিএস সুইচ বিকল হয়ে পড়ায় প্রায় ২৫ দিন ধরে কোনো বিকল্প বিদ্যুৎ ছাড়াই চিকিৎসাকার্যক্রম চালানো হয়েছে| পরে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে মেরামত করা হলেও নতুন করে তৈরি হয়েছে জ্বালানি সংকট| বিশাল এই জেনারেটর চালাতে ঘণ্টায় প্রায় ১৭ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সরকারি বাজেটে জ্বালানি তেলের বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত| ফলে নিরুপায় হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেবল সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বহির্বিভাগ ও জরুরি অস্ত্রোপচারের পিক-আওয়ারে জেনারেটর চালু রাখে এবং বাকি সময় চিকিৎসকদের মোমবাতি বা মোবাইলের আলোতেই জরুরি সেবা চালিয়ে যেতে হয়| তীব্র গরমে বাতাসহীন গুমোট পরিবেশে ভর্তি থাকা রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন, যাদের স্বজনদের দিনরাত হাতপাখা নেড়ে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়|
বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক ওঠানামায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে হাসপাতালের আধুনিক রোগ নির্ণয় গবেষণাগার বা প্যাথলজি ল্যাবগুলো| নিয়মিত বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং ভোল্টেজের তীব্র ওঠানামার ফলে ল্যাবে সংরক্ষিত কোটি টাকার অত্যন্ত সংবেদনশীল কেমিক্যাল ও রিএজেন্ট নষ্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়োকেমিক্যাল অ্যানালাইজারসহ স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিক মেশিনগুলো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে মাঝপথে থেমে গেলে বিভিন্ন জটিল পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের গরমিল বা ভুল রিপোর্ট আসার প্রবল ঝুঁকি থাকে| ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুল চিকিৎসা শুরু হলে তা রোগীর জন্য মারাত্মক জীবনঘাতী হয়ে উঠতে পারে| এছাড়া অস্ত্রোপচার চলাকালে হঠাত বিদ্যুৎ চলে গেলে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা স্টেরিলাইজেশন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা পোস্ট-অপারেটিভ রোগীদের ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়|
বিদ্যুৎহীনতায় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে দুর্বল রোগীদের জীবনপ্রদীপ যেকোনো সময় নিভে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকেন চিকিৎসকরা| বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ কিংবা পিআইসিইউর প্রতিটি জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম শতভাগ বিদ্যুৎনির্ভর| কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেন্টিলেটর, শরীরে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ প্রবেশের সিরিঞ্জ পাম্প, নবজাতকের জন্য ব্যবহৃত ফটোথেরাপি ও বেবি ওয়ার্মার চালাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ বাধ্যতামূলক| এছাড়া এসব বিশেষায়িত ইউনিটের নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয়| দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে নবজাতক ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক অবস্থা অতি দ্রুত অবনতির দিকে চলে যায়| বেসরকারি পর্যায়ের অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য পরিচালকরাও বলছেন, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রাণ হলো বিদ্যুৎ, আর সেখানে সামান্য বিঘ্নও অনেক ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়|
এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে জরুরি সমন্বয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর| অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম জানান, মাঠপর্যায়ে বিশেষ করে রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ প্রভাব তারা প্রত্যক্ষ করেছেন| পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু করা হয়েছে, যাতে জটিল অস্ত্রোপচার কিংবা স্পর্শকাতর জরুরি সেবার সময় স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ লোডশেডিং থেকে হাসপাতালগুলোকে মুক্ত রাখতে পারে| একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, সব হাসপাতালে বিকল্প ব্যাকআপ সমান না থাকলেও ন্যূনতম সেবা ও জরুরি বিভাগ যেন কখনোই পুরোপুরি থমকে না যায়, সে বিষয়ে জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে| তবে বাস্তবতার নিরিখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হোয়াটসঅ্যাপ সমন্বয়ের মতো সাময়িক মলম দিয়ে এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়; বরং দেশের প্রতিটি হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন আলাদা ডেডিকেটেড বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি|