নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক টানা তিনবারের মেয়র এবং জেলার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে কারামুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৫টি পৃথক মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের ফলে সাবেক এই মেয়রের কারামুক্তিতে আইনি আর কোনো বাধা রইল না বলে নিশ্চিত করেছেন তার আইনজীবীরা।
রোববার (১০ মে) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ শুনানি শেষে এই যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করেন। এর ফলে গত এক বছর ধরে চলা তার কারাবাসের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
রোববার সকালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালতে আইভীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তারা।
শুনানি শেষে আইভীর অন্যতম আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, “হাইকোর্ট আইভীকে যে ৫টি মামলায় জামিন দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপক্ষ তা বাতিল চেয়ে আপিল করেছিল। কিন্তু আজ আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের জামিন আদেশই বহাল রেখেছেন। এর বাইরে আরও যে দুটি মামলায় তাকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, সেগুলোতেও তিনি ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেছেন। ফলে আইনগতভাবে তার মুক্তিতে এখন আর কোনো ধরনের বাধা নেই। আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছালেই তিনি মুক্তি পাবেন।”
সাবেক মেয়র আইভীকে মূলত হত্যা, নাশকতা এবং সরকারি কাজে বাধাদানের মতো গুরুতর অভিযোগে দায়ের করা একাধিক মামলায় জড়ানো হয়েছিল। আপিল বিভাগে যে পাঁচটি মামলার জামিন বহাল রাখা হয়েছে, সেগুলো হলো:
ফতুল্লা মডেল থানার ৪টি হত্যা মামলা:
১. বাসচালক আবুল হোসেন মিজি হত্যা মামলা।
২. আব্দুর রহমান হত্যা মামলা।
৩. মো. ইয়াছিন হত্যা মামলা।
৪. পারভেজ হত্যা মামলা।
সদর মডেল থানার ১টি মামলা:
৫. নারায়ণগঞ্জের সদর মডেল থানায় হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা নাশকতা মামলা।
সেলিনা হায়াৎ আইভীর এই কারাবাস এবং আইনি লড়াইয়ের পথটি বেশ দীর্ঘ ও নাটকীয়তায় ভরপুর ছিল:
নাটকীয় গ্রেপ্তার: গত বছরের (২০২৫ সাল) ৯ মে ভোররাত ৩টার দিকে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত আইভীর পৈতৃক বাসভবন ‘চুনকা কুটির’-এ অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেখান থেকেই তাকে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নানা মামলায় তাকে একের পর এক গ্রেপ্তার দেখানো হতে থাকে।
হাইকোর্টের প্রথম জামিন ও আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ: গ্রেপ্তারের পর হাইকোর্ট তাকে ৫টি মামলায় জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আপিল বিভাগ তা স্থগিত করে দেন। ফলে তার মুক্তি আটকে যায়।
নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো: কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেই গত বছরের ১৮ নভেম্বর তাকে আরও ৫টি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার (শোন অ্যারেস্ট) দেখানো হয়।
হাইকোর্টের পুনরায় জামিন: দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই ৫ মামলায় তাকে জামিন প্রদান করেন।
চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশ: হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ পুনরায় আপিল বিভাগে গেলে গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের জামিনাদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন এবং বিষয়টি চূড়ান্ত শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।
চূড়ান্ত মুক্তিলাভ: চেম্বার আদালতের পাঠানো সেই আবেদনের ওপরই আজ (১০ মে) আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে চূড়ান্ত শুনানি হয় এবং আদালত আইভীর পক্ষে রায় দেন।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী একটি সুপরিচিত নাম। গত এক বছর ধরে তিনি কারাগারে থাকায় জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। তার মুক্তির খবরে দেওভোগের চুনকা কুটির এবং তার অনুসারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখন কেবল আপিল বিভাগের আদেশের কপি এবং রিলিজ অর্ডার (মুক্তির পরোয়ানা) কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছানোর অপেক্ষা। সব প্রক্রিয়া ঠিক থাকলে আগামী দু-একদিনের মধ্যেই তিনি কারাগার থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।