মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে দেশের জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তেলের সংকটের ‘গুজব’ ও সরকারি ‘রেশনিং’ পদ্ধতির কারণে শনিবার রাজধানী ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংগ্রহের নজিরবিহীন হিড়িক দেখা গেছে। কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র দুই লিটার তেলের জন্য আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের, যা চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও মতিঝিল এলাকার পাম্পগুলোতে গিয়ে দেখা যায় যানবাহনের উপচে পড়া ভিড়। কল্যাণপুরের খালেক পারম্পে দুই লিটার তেলের জন্য আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ী আল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অধিকাংশ ছোট পাম্প বন্ধ। বড় পাম্পগুলোতে এক কিলোমিটারের বেশি লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুয়েল পুড়িয়েই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।”
একই চিত্র দেখা গেছে শাহবাগ ও পরিবাগ এলাকায়। সেখানে লাইনের শেষ প্রান্ত সায়েন্সল্যাব মোড় পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষকে বোতল ও কন্টেইনার নিয়ে ভিড় করতে দেখা গেছে, যা নিয়ে পাম্প কর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা লেগেই আছে।
সরকার নির্ধারিত রেশনিং পদ্ধতি অনুযায়ী, বর্তমানে মোটরসাইকেলের জন্য সর্বোচ্চ ২ লিটার (বা ৩০০ টাকা), প্রাইভেটকারের জন্য ১০ লিটার এবং বড় গাড়ির জন্য ২০-২৫ লিটার জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে চালকদের একদিন পরপরই পাম্পে আসতে হচ্ছে।
পাঠাও চালক সামির আক্ষেপ করে বলেন, “৩০০ টাকার তেলে আমার সারাদিন চলে না। বাধ্য হয়ে এক পাম্প থেকে তেল নিয়ে আবার অন্য পাম্পের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।” অনেক চালকের অভিযোগ, সরকার রেশনিং করে মূলত মজুতদারি সিন্ডিকেটকে সহায়তা করছে এবং জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অতিরিক্ত চাহিদার কারণে রাজধানীর অনেক পাম্পের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে গেছে। মহাখালীর ‘ক্লিন ফুয়েল’ এবং বিমানবন্দর এলাকার ‘ডি এল ফিলিং স্টেশন’-এ ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাধারণ সময়ে যে তেল তিন দিন চলত, আতঙ্কে সবাই ‘ফুল ট্যাংক’ করতে চাওয়ায় তা একদিনেই শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া আজ শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় ডিপো থেকে তেলের গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আজ জানিয়েছেন, দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, “আগামী ৯ মার্চ (সোমবার) তেলের আরও দুটি বড় জাহাজ (ভেসেল) দেশে পৌঁছাবে। কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রোধে আগামীকাল রোববার থেকে সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) কাজ শুরু করবে।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, আগামী ৬ মাসের জন্য সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। যুদ্ধের প্রভাবে এখনই সংকট হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
পাম্প কেন্দ্রিক দীর্ঘ লাইনের কারণে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যানজট নিরসনের পাশাপাশি এখন তাদের ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং হাতাহাতি থামাতে বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে।