গোপালগঞ্জের প্রান্তিক মতুয়া সম্প্রদায়ের এক নেত্রী থেকে হঠাৎ করেই জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি! ঘটনাটি প্রথম শুনলে অনেকের কাছেই সিনেমার চিত্রনাট্য বা রূপকথার গল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির অন্দরমহলে এমন গল্পগুলো হঠাৎ করে তৈরি হয় না, এর পেছনে থাকে নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। সুবর্ণা ঠাকুরের এই আকস্মিক উত্থানের গল্পটিও ঠিক তেমনই এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক সমীকরণের ফসল।
শুরুর গল্প: ‘গ্রে জোন’ থেকে উত্থান গল্পটার শুরু বেশ আগে থেকেই। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনে নেতৃত্ব দিতে দিতে সুবর্ণা ঠাকুর হয়ে উঠেছিলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের এক পরিচিত মুখ। তবে তাঁর রাজনৈতিক অতীত কিছুটা জটিল। একসময় তিনি নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের (বিএনপি) কাছে তিনি পুরোপুরি নতুনও ছিলেন না, আবার একদম পুরোনো পরীক্ষিত মুখও ছিলেন না—রাজনীতির ভাষায় যাকে বলা যায় একটি ‘গ্রে জোন’ চরিত্র। তখনো কেউ ভাবেনি, এই পরিচয়ই একদিন তাঁর জন্য জাতীয় রাজনীতির দরজা খুলে দেবে।
৫ আগস্টের পর ও খামারবাড়ির সম্মেলন ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের বদল আসে। চূড়ান্ত বার্তাটি আসে গত ৮ নভেম্বর ঢাকার খামারবাড়িতে আয়োজিত মতুয়া সম্প্রদায়ের এক মহাসম্মেলন থেকে। সেই অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং লন্ডন থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়েছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সম্মেলনে মতুয়া সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একটি জোরালো শর্ত বা দাবি তোলা হয়—তাঁদের সম্প্রদায় থেকে অন্তত একজনকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিতে হবে। বিএনপি হাইকমান্ড তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সরাসরি মেনে না নিলেও, কৌশলে সময় চেয়ে নেয়। রাজনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘পজিশন রিজার্ভ রাখা’।
ভোটের অংক ও মতুয়া ফ্যাক্টর বিএনপির এই কৌশলের পেছনে ছিল ভোটের মাঠের কঠিন বাস্তবতা। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে মতুয়া সম্প্রদায় সামাজিকভাবে অত্যন্ত সুসংগঠিত। জাতীয় পর্যায়ে তাদের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও, নির্দিষ্ট কিছু আসনে তারা বড় একটি ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে কাজ করে। ভোটের সময় তারা একযোগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা রাখে। ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক বৈষম্যের শিকার এই সম্প্রদায় থেকে কাউকে সংসদে নেওয়ার অর্থ শুধু একটি আসন দেওয়া নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়কে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও শেষ চমক নির্বাচনের মাঠে এই সমীকরণের ফল হাতেনাতে পায় বিএনপি। দেশের নানা জায়গায় দলীয় ভাঙন ও অসন্তোষ থাকলেও, সংখ্যালঘু ভোটের একটি বড় অংশ—বিশেষ করে মতুয়াদের সুসংগঠিত ভোট সরাসরি বিএনপির বাক্সে পড়ে।
আর ঠিক এখানেই ঘটে শেষ চমকটি! বিএনপি তাদের পুরোনো সেই পাতাটি আবার খোলে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, কেবল প্রতীকী নয়, এই সম্প্রদায়কে বাস্তব প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে। ফলশ্রুতিতে সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় জায়গা পান সুবর্ণা ঠাকুর।
এক ঢিলে এখানে কয়েকটি লক্ষ্য পূরণ হয়েছে—এটি ছিল বিএনপির একটি দারুণ রাজনৈতিক কৌশল, একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা এবং সময়মতো দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এক হিসেবি পদক্ষেপ। সুবর্ণা ঠাকুরের এমপি হওয়ার এই ঘটনায় নাটক বা চমক থাকতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হলো—এটি ভোটের রাজনীতিতে সুসংগঠিত সম্প্রদায়ের প্রভাব এবং নিখুঁত রাজনৈতিক হিসেবের এক স্পষ্ট উদাহরণ।