উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক এক রায়ে নিরাপদ ও পানযোগ্য পানিকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে ‘মৌলিক অধিকার’ বা জীবনের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ খোদ রাজধানীতেই এই অধিকার আজ চরমভাবে ভুলুণ্ঠিত। একদিকে কাগজে-কলমে পরিবেশ ও পানির উৎস রক্ষার বড় বড় প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে বাস্তবে এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য নগরবাসীর হাহাকার। গ্রীষ্মের শুরুতেই ঢাকার একটি বিশাল অংশ তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগছে, যা নীতিগত অঙ্গীকার ও রূঢ় বাস্তবতার মধ্যকার বিশাল ফারাককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
২২ এপ্রিল বুধবার ছিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। সারা বিশ্ব যখন এই দিনটিতে পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের অঙ্গীকার নতুন করে স্মরণ করছে, ঠিক তখনই ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাওয়ার খবর আমাদের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে।
গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে মিরপুর ও এর আশপাশের অঞ্চলে পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কল্যাণপুর, পূর্ব মনিপুর, পীরেরবাগ, শেওড়াপাড়া এবং বাড্ডার মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে দিনের পর দিন পানির সরবরাহ বন্ধ থাকছে। রাতে বা দিনের কোনো একসময় সামান্য পানি এলেও তা ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী।
মাটিকাটা বাজারের বাসিন্দা খালিদুর রহমান নিজের চরম ভোগান্তির কথা তুলে ধরে বলেন, “নিয়মিত পানি তো পাওয়াই যাচ্ছে না, আর যখন আসে তখন তা এতই নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত থাকে যে, মুখে দেওয়ার বা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করার কোনো উপায় থাকে না।”
পূর্ব মনিপুরের শিক্ষার্থী তাহমিনা আক্তারের অভিজ্ঞতা আরও করুণ। তিনি জানান, তীব্র সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহ ধরে তারা বাধ্য হয়ে বোতলজাত পানি কিনে দৈনন্দিন কাজ সারছেন। নিত্যপণ্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে পানির পেছনে এই অতিরিক্ত ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে চরম সংকটে ফেলছে।
নগরবাসী যখন পানির অভাবে দিনের পর দিন নির্ঘুম ও দুর্বিষহ সময় পার করছেন, তখন ঢাকা ওয়াসা এই সমস্যাকে স্রেফ ‘লোকালাইজড ক্রাইসিস’ বা নির্দিষ্ট এলাকার সাময়িক সংকট বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দাবি—প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পাম্পিং স্টেশনের মেরামতকাজ এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণেই কিছু কিছু এলাকায় এই সাময়িক সমস্যা হচ্ছে।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। ঢাকায় বর্তমানে আড়াই কোটি মানুষের বাস। এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩১০ কোটি লিটার। এর বিপরীতে ওয়াসা সরবরাহ করতে পারছে ২৯০ থেকে ৩০৫ কোটি লিটার। চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের এই ঘাটতি তো রয়েছেই, তার ওপর নগরীর মোট পানি সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশই সরাসরি তোলা হয় ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে, যা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) কর্মকর্তা কাইয়ুম সাঈদুর রহমান ঢাকা শহরের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর এক ভয়ংকর চিত্র সামনে এনেছেন। তিনি জানান, ঢাকার কিছু এলাকায় প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ১২ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ও অতিদ্রুত নগরায়ণের ফলে ঢাকা এখন একটি কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। শহরের উন্মুক্ত জায়গা ও জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে মাটির নিচে প্রবেশ (রিচার্জ) করতে পারছে না। ফলে মাটির নিচ থেকে যে পরিমাণ পানি প্রতিদিন পাম্প করে তোলা হচ্ছে, শূন্যস্থান পূরণে সেই পরিমাণ পানি আর রিচার্জ হচ্ছে না। ধরিত্রী দিবসের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি ঢাকার মতো দ্রুত নগরায়ণকেন্দ্রিক শহরগুলোর চরম দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নিলে ঢাকার এই ‘মৌসুমি পানিসংকট’ অচিরেই একটি স্থায়ী নগর সংকটে রূপ নেবে, যা শহরটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। এই ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে মেগাসিটি ঢাকাকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন:
ভূ-পৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি: মাটির নিচের পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নদী ও জলাশয়ের পানি শোধন করে তা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting): বহুতল ভবনগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ: ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যত্রতত্র গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।
বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: সিস্টেম লস বা লাইনের ছিদ্র দিয়ে পানির অপচয় রোধ করতে ওয়াসার বিতরণ লাইনগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি।
নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা শুধু উচ্চ আদালতের রায় বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই নয়; বরং পরিবেশগত সুশাসন ও একটি টেকসই নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও। বিশ্ব ধরিত্রী দিবসের অঙ্গীকার শুধু কথার কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই কঠোর হতে হবে। নতুবা পানির অভাবেই একদিন থমকে যাবে এই মেগাসিটির স্পন্দন।