• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
মতুয়া চমক: ভোটের অংকে সংরক্ষিত আসনে এমপি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: ৫৬ হাজার কোটির দায় কেন জনগণের কাঁধে? লোগো নকল, দাম আকাশছোঁয়া: সংসদের কেনাকাটায় এ কোন জাদুকরি হিসাব? তীব্র গরমে হঠাৎ ঘাম বন্ধ? হিট স্ট্রোক নয় তো! অবশেষে বোনদের পথ ধরে হজে যাচ্ছেন চম্পা অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলে দ্রুত বিচার আইনে ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী ইরানের তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ অচল করার কড়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কি কৌশল না ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা ‘অবৈধ যুদ্ধ’ আড়াল করতেই হুমকি: ইরানি-মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তিদূত’ পাকিস্তান: আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার আড়ালে ধুঁকছে ঘরোয়া রাজনীতি

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কি কৌশল না ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ সংঘাতের মাঝে কিছুটা হলেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং মধ্যস্থতাকারী ইসলামাবাদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাবনিকাশ। ইরান এই সিদ্ধান্তকে সময়ক্ষেপণ ও আকস্মিক হামলার কৌশল হিসেবে আখ্যা দিলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন বিশ্ব অর্থনীতির চাপ ও ঘরোয়া রাজনীতির কারণেই ট্রাম্প এই সংযত অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।

ট্রাম্পের আকস্মিক ঘোষণা ও নেপথ্যের কারণ

বুধবার (২২ এপ্রিল) যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে দিন শুরু হয়েছিল ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনার জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইসলামাবাদে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়। এর পরপরই ট্রাম্প তাঁর প্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর এই আকস্মিক ঘোষণা দেন।

ট্রাম্প দাবি করেন, পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উচ্চপর্যায়ের অনুরোধের প্রেক্ষিতেই তিনি সামরিক হামলা স্থগিত রাখার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, “বর্তমান ইরান সরকার ভেতর থেকেই দুর্বল এবং মারাত্মকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান অনুরোধ করেছে যেন আমরা এখনই আক্রমণ না করি, যাতে ইরানের নেতা ও প্রতিনিধিরা একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারেন।”

তবে সামরিক হামলা স্থগিত থাকলেও ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং সব ধরনের সামরিক প্রস্তুতি পূর্ণমাত্রায় বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে যৌক্তিক কোনো প্রস্তাব না আসা পর্যন্ত এই অবরোধ চলবে।

ইরানের কড়া প্রতিক্রিয়া: ‘পরাজিত পক্ষ শর্ত দিতে পারে না’

ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণাকে ‘অর্থহীন’ ও ‘কৌশল মাত্র’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “পরাজিত পক্ষ কখনোই কোনো শর্ত আরোপ করতে পারে না।” তাঁর মতে, বন্দর অবরোধ অব্যাহত রাখা আর বোমাবর্ষণ করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, এবং এর জবাব অবশ্যই সামরিকভাবেই দেওয়া উচিত। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি আকস্মিক হামলার জন্য সময় নেওয়ার কৌশল মাত্র।

এর আগে মঙ্গলবার সকালেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “ইরান ভালো করেই জানে কীভাবে এসব বিধিনিষেধ অকার্যকর করতে হয় এবং কীভাবে দাদাগিরি প্রতিরোধ করতে হয়।”

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে তেহরান পরে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবে।

নেতৃত্বের সংকট নাকি ঐক্যবদ্ধ ইরান?

ট্রাম্প তাঁর বার্তায় দাবি করেছেন যে, ইরানের নেতৃত্ব চরমভাবে বিভক্ত। তবে আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি আলী হাশেম এই দাবিকে ‘ভুল ধারণা’ বলে মন্তব্য করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তেহরানের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো ভাঙন দেখা যায়নি।

আলী হাশেমের মতে, আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং তাঁর চারপাশের দলটি গত ১৫ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছে, ফলে নেতৃত্ব এখনো অত্যন্ত ঐক্যবদ্ধ। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) শক্ত হাতে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও আশার আলো

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোয় ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইসলামাবাদ তাদের মধ্যস্থতা চালিয়ে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেন, “আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং ইসলামাবাদে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় একটি ব্যাপকভিত্তিক শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।” পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারও বারবার সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে আসছেন।

কী চান ট্রাম্প? মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ চাপ

বিশ্লেষকরা বলছেন, মঙ্গলবার ট্রাম্পের দেওয়া অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধবিরতির বিবৃতিটি ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর অতীতের আক্রমণাত্মক পোস্টগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সংযত ছিল। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান কাটুলিস এটিকে একটি ‘বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন।

মূলত এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের ওপর। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা)-এর হস্তক্ষেপ-বিরোধী অংশটিও এই যুদ্ধের বিপক্ষে। ফলে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক কষ্ট ও রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই ট্রাম্প কিছুটা পিছু হটে সময় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছেন।

ইরাক ও তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস জেফ্রি বলেন, “ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি একদিকে টেবিলে ভালো প্রস্তাব রাখছেন, আবার অন্যদিকে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুমকি দিচ্ছেন। এর আগেও এমন হয়েছে।”

অমীমাংসিত ‘রেড লাইন’ ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি টেকসই শান্তি চুক্তির জন্য আরও কিছুটা সময় পেল ঠিকই, কিন্তু মূল সংকটগুলো এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল নৌ-অবরোধের ফলে তেহরান নতি স্বীকার করবে, কিন্তু তা হয়নি। উল্টো ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা বা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করার কোনো লক্ষণ দেখায়নি, যা ট্রাম্পের চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে নির্ধারিত। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তেহরান ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে, কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা ইউরেনিয়াম কিছুতেই দেশের বাইরে যেতে দেবে না।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে নিজের জন্য সময় কিনে নিলেও, নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এবং পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশ একমত না হওয়া পর্যন্ত এই সংঘাতের কোনো দ্রুত ও টেকসই সমাধান এই মুহূর্তে অনেকটাই অধরা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category