• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
Headline
‘অবৈধ যুদ্ধ’ আড়াল করতেই হুমকি: ইরানি-মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি ইরানের তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ অচল করার কড়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তিদূত’ পাকিস্তান: আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার আড়ালে ধুঁকছে ঘরোয়া রাজনীতি ওয়াসার ‘লোকালাইজড ক্রাইসিস’-এর আড়ালে নগরবাসীর সীমাহীন ভোগান্তি যুদ্ধবিধ্বস্ত ৭৭৫টি স্কুল মেরামত করল ইরান পাম্পে তালা, মাঠে ফাটল: তেলের অভাবে ধুঁকছে কৃষি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আঁচে নতুন ফ্রন্ট: ইরাকি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সৌদি আরবের ‘ছায়াযুদ্ধ’ ইরান ও ইসরায়েলের উত্থান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দিশেহারা ও নতুন পথের সন্ধানে সৌদি আরব জ্বালানি ফুরিয়ে অচল ১৮ বিদ্যুৎ কেন্দ্র:, লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস করছে গ্রামবাংলা চালক যখন তেলের লাইনে: গন্তব্যে পৌঁছানোর এক অন্তহীন যুদ্ধ

জ্বালানি ফুরিয়ে অচল ১৮ বিদ্যুৎ কেন্দ্র:, লোডশেডিংয়ে হাঁসফাঁস করছে গ্রামবাংলা

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

দেশে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হতে না হতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশেই লোডশেডিং ফিরে এসেছে। তবে লোডশেডিংয়ের এই আঘাত শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে অনেক বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে দিন দিন বাড়ছে গরমের তীব্রতা, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জনজীবন। বিশেষ করে সেচ মৌসুম এবং আসন্ন এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে বিদ্যুতের এই সংকট কৃষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে এখন বিদ্যুতের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি, যার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতাই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সংকটের নেপথ্যে: আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি

বিগত কয়েক বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও, উৎপাদন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকটের ঝুঁকি সবসময়ই ছিল। বিগত বছরে গ্রীষ্মে লোডশেডিং সেভাবে দৃশ্যমান না হলেও, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। চলতি বছরের শুরুতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নতুন উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের চেইন (Supply Chain) ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে ফার্নেস তেল, কয়লা এবং এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস)-এর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

এই আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ফার্নেস তেলের দাম বাড়িয়েছে, তারপরও ডলার সংকট ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায়, সরকার আপাতত গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেখানেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ, ৩৫টির উৎপাদন ব্যাহত

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের কারণে এই উৎপাদন ক্ষমতার একটি বড় অংশ অলস বসে আছে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৮৮ শতাংশই তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। বর্তমানে জ্বালানির অভাবেই দেশের ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি গ্যাসভিত্তিক এবং ৮টি তেলভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে।

বন্ধ থাকা গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো হলো:

  • ঘোড়াশাল (রিপাওয়ার্ড ইউনিট ৪, টিপিপি ইউনিট ৫, ৩৬৫ মেগাওয়াট এবং ১০৮ মেগাওয়াট)

  • মেঘনাঘাট (৩৩৫ মেগাওয়াট, ৫৮৩ মেগাওয়াট এবং জেরা ৭১৮ মেগাওয়াট)

  • সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট

  • বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট

  • সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট

বন্ধ থাকা তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো হলো:

  • গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট

  • মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট

  • জুলদাহ (১০০ মেগাওয়াট এবং ২ নম্বর ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট)

  • জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট

  • ফেনী লঙ্কা পাওয়ার

  • রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট

  • নাটোর ৫২ মেগাওয়াট

শুধু বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোই নয়, জ্বালানি অপ্রতুলতার কারণে আরও অন্তত ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি গ্যাসভিত্তিক, ২৪টি তেলভিত্তিক এবং ২টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত রাখা হয়েছে। তবে আমরা গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছি, আশা করছি লোডশেডিং খুব বড় আকার ধারণ করবে না।”

লোডশেডিংয়ের চিত্র: শহর বনাম গ্রাম

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অধিবাসীরা। বিপিডিবির ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ এপ্রিল দিনে-রাতে বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং করা হয়েছে। পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) চাহিদা যখন ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, তখন উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। সোমবার (২০ এপ্রিল) বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।

আঞ্চলিক হিসেবে দেখা যায়, পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের তুলনায় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বেশি। ঢাকা অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় সরবরাহের বড় অংশ সেখানেই দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৮ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল গ্রিডে ১০ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি, ৫৬১৮ মেগাওয়াট দেওয়া হয়েছে শুধু ঢাকাতেই। অন্যদিকে, সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে (খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর) সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৪২৯৫ মেগাওয়াট, যা ঢাকার চেয়েও কম।

এর ফলে ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৪-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে-রাতে ৬ থেকে ৮ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করছে।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎ কখন যায় কখন আসে বোঝা যায় না। এখনো সেভাবে গরম শুরুই হয়নি, অথচ তার আগেই যেভাবে দিনে ৭-৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে, তা অনেকটা অসহনীয়। এতে আমাদের কৃষিকাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বাড়ির দৈনন্দিন কাজ করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”

রাজশাহীর নগরের বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা বাবু বলেন, “সকালের দিকেও অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। রাত ১০টার পর বিদ্যুৎ গিয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর আসে। গভীর রাতেও কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। গরমে রাতে ঘুমাতে বেশ কষ্ট হয়।”

তবে জেলা শহরগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয়। রংপুর নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর কবির জানান, শহরে এখনো লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে আছে। তবে সামনে এসএসসি পরীক্ষা, তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত জরুরি।

প্রশাসনের উদ্যোগ ও ঘাটতির হিসাব

বিদ্যুৎ ও বিতরণ বিভাগ নেসকোর (রংপুর অঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) শাহাদৎ হোসেন সরকার জানান, বর্তমানে রংপুর বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা ৯০০ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ২৫-৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা এখনও কম। পল্লী বিদ্যুতের প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমও জানান, তাদের এলাকায় ঘাটতি ১৫-২০ মেগাওয়াট এবং তারা গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মখলেসুর রহমান জানান, রাজশাহীতে সকালের দিকে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় লোডশেডিং হচ্ছে না। তবে রাতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানগুলো রাত ৮টার পর বন্ধ করার নির্দেশ দিলেও, প্রশাসনের তদারকির অভাবে অনেক স্থানেই তা মানা হচ্ছে না। রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় রাত ৯টার পরও দোকানপাট খোলা থাকতে দেখা যায়।

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে এসে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ) প্রসারে বিনিয়োগ না বাড়ালে এই সংকট থেকে দীর্ঘমেয়াদি উত্তরণ সম্ভব নয়। আপাতত আসন্ন সেচ মৌসুম ও পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি অচিরেই বড় ধরনের অসন্তোষে রূপ নিতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category