একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার সুস্থ ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই যদি সচেতনভাবে প্রাণঘাতী রোগের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তাকে নিছক অব্যবস্থাপনা বলা চলে না; এটি এক ধরনের কাঠামোগত অপরাধ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে ঠিক এমনই এক নীরব অথচ ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে। যে শিশুদের সুরক্ষিত রাখার কথা ছিল, তাদের জীবন আজ চরম ঝুঁকির সম্মুখীন। হাম, পোলিও, যক্ষ্মা থেকে শুরু করে ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের মতো অন্তত ২৬টি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী রোগ এখন দেশজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের এই করুণ পরিণতির জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি আঙুল তুলেছেন বিগত দুই সরকারের দিকে। তিনি এই চরম অব্যবস্থাপনাকে নিছক ব্যর্থতা না বলে ‘জীবনবিনাশী ও ক্ষমা অযোগ্য অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কী ঘটেছিল স্বাস্থ্য খাতের নেপথ্যে? কেন আজ কোটি কোটি মানুষের জীবন খাদের কিনারে? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব স্বাস্থ্য খাতের সেই ভয়াবহ সংকটের পেছনের অজানা গল্প।
যেভাবে শুরু এই বিপর্যয়ের: একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমগুলো ১৯৯৮ সাল থেকে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছিল। ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ বা ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি)-এর মাধ্যমে সারা দেশে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো। এর আওতায় ছিল শিশুদের টিকাদানসহ অন্তত ৩৮টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মসূচি, যার কারণে বাংলাদেশ একসময় বিশ্বজুড়ে টিকাদানে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।
কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত হয় ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে। ওই সময় স্বাস্থ্য খাতের চতুর্থ এইচপিএনএসপি (HPNSP) বা ‘হেলথ পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম’-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পঞ্চম ধাপটি নির্বিঘ্নে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চরম বিস্ময়ে ফেলে দিয়ে, কোনো প্রকার পূর্ববর্তী জরিপ, মাঠপর্যায়ের গবেষণা বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই হুট করে ওপি (অপারেশন প্ল্যান) কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে হাম, রুবেলা, ডেঙ্গু, যক্ষ্মা এবং টাইফয়েডের মতো অন্তত ২৬টি ভয়াবহ রোগের দেশব্যাপী প্রতিরোধ কর্মসূচি মুহূর্তের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে। পঞ্চম ধাপে উত্তরণের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে যে রশি টানাটানি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা চলে, তাতে নষ্ট হয় মূল্যবান কয়েকটি মাস। আর এই আমলাতান্ত্রিক ইগোর লড়াইয়ের চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় দেশের সাধারণ জনগণকে।
টিকাহীন শৈশব: ব্যাহত ইপিআই (EPI) কর্মসূচি
এই হটকারী সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসে পড়ে দেশের কোমলমতি শিশুদের ওপর। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই (EPI), যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় অর্জন ছিল, তা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশজুড়ে টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়। হাজার হাজার শিশু তাদের নির্ধারিত সময়ে টিকার ডোজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।
বিশেষ করে শিশুদের যক্ষ্মা প্রতিরোধের বিসিজি (BCG) টিকা এবং পাঁচটি মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষাকারী পেন্টাভ্যালেন্ট (Pentavalent) টিকার মারাত্মক মজুত সংকট দেখা দেয়। সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এ প্রসঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “বিগত দুই সরকারের এই জীবনবিনাশী ব্যর্থতা একটি ক্ষমা অযোগ্য অপরাধ। শিশুদের সুচিকিৎসা এবং টিকাদান নিশ্চিত করা কোনো রাষ্ট্রের করুণা নয়, এটি নাগরিকদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার।” তিনি দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থবির হয়ে পড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মসূচি
কেবল শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিই নয়, ওপি বন্ধ হওয়ার প্রভাবে জনস্বাস্থ্যের আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ভেঙে পড়েছে। নিচে এর কয়েকটি ভয়াবহ দিক তুলে ধরা হলো:
ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ: শিশুদের রাতকানা রোগ প্রতিরোধ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পরিচালিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশের লাখ লাখ শিশু আবারও রাতকানা রোগ ও অপুষ্টির মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে ধস: দেশের স্কুলগামী শিশুদের জন্য ২৭ বছর ধরে অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসা জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গত এক বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ম্যালেরিয়ার নীরব প্রত্যাবর্তন: প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেশের পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ফের মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচিতে কুঠারাঘাত: সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়টি ঘটেছে কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচির ক্ষেত্রে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এই সফল কর্মসূচিটি ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দেশের প্রায় ৩৮ মিলিয়ন বা পৌনে চার কোটি মানুষকে পুনরায় এই ভয়ংকর পরজীবীঘটিত রোগের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
পঙ্গুত্ব বরণের পথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং কর্মীদের কান্না
যেকোনো স্বাস্থ্য কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি হলেন মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা। অথচ, এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে যক্ষ্মার ওষুধ ও টিকা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া ২৫ হাজারেরও বেশি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীর বেতন দীর্ঘ দুই বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে।
বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা এই কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে না লাগিয়ে, উল্টো নতুন জনবল নিয়োগের একটি হঠকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। সংশ্লিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে স্রেফ ‘প্রশাসনিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূলত পূর্ববর্তী ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই দেশের গোটা জনস্বাস্থ্য খাতকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। অভিজ্ঞ কর্মীদের বাদ দিয়ে এমন একটি স্পর্শকাতর খাত পরিচালনার এই সিদ্ধান্ত পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করে দেওয়ার শামিল।
বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ ও ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ
জনস্বাস্থ্যের এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, স্থবির হয়ে পড়া প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলো পুনরায় চালু করার জন্য নতুন ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফর্মা) প্রস্তুতের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। খুব শিগগিরই টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং আটকে পড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতনের বিষয়েও সম্মানজনক সমাধান করা হবে।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে এই যে ছিনিমিনি খেলা হলো, এর দায়ভার আসলে কার? এই চরম বিশৃঙ্খলার দায় কি কেবল ফাইলের স্তূপে আটকে থাকা আমলাদের, নাকি তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতার? এই প্রশ্নগুলো আজ দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিগত দুই সরকারের এই ক্ষমা অযোগ্য অপরাধ ও চরম অবহেলার যে গভীর ক্ষত জনস্বাস্থ্য খাতে তৈরি হয়েছে, রাতারাতি তার উপশম সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার তাদের সদিচ্ছা ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ক্ষত মুছে ফেলে কত দ্রুত দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আবারও তার গৌরবময় ও সুরক্ষিত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এমন ভয়ংকর প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো যেন ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।