গত ১৭ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপন রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের অনুপস্থিতিতে কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ধারণ করে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন—হঠাৎ কেন এমন প্রজ্ঞাপন? নেপথ্যে কি কোনো বিশেষ কারণ রয়েছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক চমক নয়, বরং রয়েছে সংসদীয় কার্যক্রমকে নিরবচ্ছিন্ন ও গতিশীল রাখার একটি সুচিন্তিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের প্রায়শই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বা দ্বিপাক্ষিক সফরে ঢাকার বাইরে বা বিদেশে অবস্থান করতে হয়। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে সংসদে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশ্নোত্তর পর্বে জবাবদিহির ক্ষেত্রে একধরনের শূন্যতা দেখা যেত। কিন্তু নতুন এই প্রজ্ঞাপনের ফলে সংসদে জবাবদিহির একটি নিশ্ছিদ্র ‘ব্যাকআপ সিস্টেম’ বা বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত হলো।
শীর্ষ নেতৃত্বে আস্থার বিকেন্দ্রীকরণ
প্রজ্ঞাপনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার বদলে কাজের সুষ্ঠু বণ্টনে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসদীয় দায়িত্ব পালনের জন্য অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বিকল্প নির্ধারণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংসদীয় কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর সংসদীয় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওপর। এটি মূলত রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কাজের বিকেন্দ্রীকরণ এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতাদের ওপর প্রধানমন্ত্রীর আস্থার একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
নিরবচ্ছিন্ন সংসদীয় চর্চা
প্রজ্ঞাপনে আরও একটি চমৎকার স্তর রাখা হয়েছে। যদি কোনো কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং তাঁর বিকল্প—উভয়েই একই সঙ্গে সংসদে অনুপস্থিত থাকেন, তবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সেই দায়িত্ব পালন করবেন। আর তিনিও যদি অনুপস্থিত থাকেন, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে ওই সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশ্নোত্তর প্রদান এবং সংসদীয় কার্যাবলি সম্পাদন করবেন।
এর ফলে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব কখনোই মুখ থুবড়ে পড়বে না। জনগণের জনপ্রতিনিধিরা যেকোনো সময় যেকোনো মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তার উত্তর দিতে প্রস্তুত থাকবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত এই আদেশটি প্রমাণ করে যে, সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সংসদে কোনো কাজ যেন এক মুহূর্তের জন্যও আটকে না থাকে, সেই লক্ষ্যে এমন একটি সুপরিকল্পিত কাঠামো তৈরি করা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।