বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, সার উৎপাদন এবং আবাসিক রান্নার কাজে এই জ্বালানির কোনো বিকল্প এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং ভূতাত্ত্বিক উপাত্তগুলো এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের ভূগর্ভে গচ্ছিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত এবং দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা—উভয়ই ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত ছয় অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা এবং পুরোনো কূপগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশীয় জ্বালানি খাতের ওপর এক প্রকার অন্ধকারের ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকেও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের বিগত ছয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের গ্যাস কূপের সংখ্যা এবং উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে সচল গ্যাস উৎপাদন কূপ ছিল ১১২টি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ১১০টিতে। মাঝখানের বছরগুলোতে এই সংখ্যা ১০৪ থেকে ১১৩-এর মধ্যে ওঠানামা করলেও প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা কিন্তু বাড়েনি, বরং আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ২০১৯-২০ সালে যেখানে দৈনিক গড়ে ২৪২৩.৩১ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ১৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়েছে বাংলাদেশ।

মজুতের চিত্রটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। খনি থেকে নিয়মিত গ্যাস উত্তোলনের ফলে অবশিষ্ট মজুত দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে গ্যাসের মজুত ছিল ১২.২৬ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট), যা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮.১৫ টিসিএফ-এ। যদিও খাতা-কলমে এই মজুত দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভূগর্ভে থাকা এই ৮.১৫ টিসিএফ গ্যাসের পুরোটা কখনোই উত্তোলন করা সম্ভব হবে না। সাধারণত একটি গ্যাসক্ষেত্রের মোট মজুতের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হয়। রিজার্ভারের ভেতরের চাপ কমে গেলে অবশিষ্ট গ্যাস বের করে আনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমান উৎপাদন হার (বছরে ০.৬ থেকে ০.৭ টিসিএফ) বিবেচনা করলে দেখা যায়, নতুন কোনো বড় খনি আবিষ্কৃত না হলে বর্তমান মজুত দিয়ে বড়জোর আগামী ৮ থেকে ১০ বছর সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব।
দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে গত এক দশকে বাংলাদেশের ঝোঁক ছিল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি-র দিকে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন করা হয়। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে কাতার ও ওমানের কাছ থেকে গ্যাস কেনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এই পথকে অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। ডলার সংকটের কারণে তখন বাংলাদেশ সাত মাস গ্যাস আমদানি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে এলএনজি-র দাম আবারও লাগামহীন হয়ে পড়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে ১১০০ কোটি টাকায় কেনা দুটি এলএনজি কার্গোর বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংকটের মুহূর্তে বাংলাদেশকে দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। এই বিশাল পরিমাণ ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমদানিনির্ভর এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিদেশি শক্তির মর্জির ওপর জিম্মি করে ফেলেছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিশাল গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা থাকলেও গত এক দশকে সেখানে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। ২০১২ ও ২০১৪ সালে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে (গভীর ও অগভীর মিলিয়ে) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার মতো সময়োপযোগী চুক্তি বা পিএসসি (উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি) তৈরিতে ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। মার্কিন কোম্পানি শেভরন ও এক্সনমবিলসহ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সময় আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত তারা বিনিয়োগ করেনি। বর্তমানে অগভীর সমুদ্রের মাত্র দুটি ব্লকে ভারতের ওএনজিসি কাজ করছে, বাকি ২৪টি ব্লক অলস পড়ে আছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করে নিজেদের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, আগামী দুই বছর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত সংকটময়। তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত অন্য সব খাত থেকে প্রয়োজন হলে অর্থ সরিয়ে এনে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ করা। কারণ একবার যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় গ্যাস নেই, তবেই কেবল অন্য বিকল্প বা আমদানির পথে স্থায়ীভাবে হাঁটা যৌক্তিক হবে। কিন্তু কোনো ধরণের জোরালো অনুসন্ধান না চালিয়ে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করা আত্মঘাতী।
পেট্রোবাংলা অবশ্য ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খনন ও সংস্কারের (ওয়ার্কওভার) একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং সাফল্যের হার নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ অতীতেও অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেগুলো থমকে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল স্থলভাগ নয়, বরং দ্রুততম সময়ের মধ্যে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন যদি এলএনজি আমদানির চেয়ে কিছুটা বেশি ব্যয়বহুলও হয়, তবুও সেটি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী।
পরিশেষে, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত যেভাবে ফুরিয়ে আসছে, তাতে আগামীর দিনগুলোতে শিল্পায়ন বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে দেশ। ২০২৬ সাল নাগাদ ওমান ও কাতারের সাথে নতুন চুক্তির এলএনজি আসা শুরু হলেও সেটি কেবল সাময়িক সমাধান দেবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদ উত্তোলনে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।