• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

আশার আয়নায় গণতন্ত্রের দুই মুখ

Reporter Name / ৮৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

রূপকথার সেই দুঃসাহসী রাজকুমারের গল্পটার কথা ভাবুন। সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে সে গিয়েছিল ঘুমন্ত এক দৈত্যের মুকুট ছিনিয়ে আনতে, যাতে রাজকন্যা আর রাজত্ব দুটোই তার হয়। কিন্তু তাকে বলা হয়নি যে ওই দৈত্যের দুটো মুখ—এক মুখ ঘুমালে অন্য মুখটা জেগে থাকে। ফলে মুকুট ছুঁতে গিয়ে মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সে। গণতন্ত্রের বর্তমান রূপটি যেন ঠিক ওই দুইমুখো দৈত্যের মতোই। এর একটি মুখ আমাদের দেখায় জনগণের ক্ষমতা ও ভোটাধিকারের রঙিন স্বপ্ন, আর অন্য মুখটি অত্যন্ত সুকৌশলে সেই ক্ষমতাকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে বন্দি করে রাখে। আমরা পরিবর্তনের আশায় বারবার ভোট দেই, অথচ কাঙ্ক্ষিত সেই ‘রাজকন্যা’ অর্থাৎ সুশাসন যেন চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। নূর হোসেনের মতো তরুণদের আত্মত্যাগ দেখে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, এই বিভ্রান্তিকর স্বপ্নের জন্যই কি তারা প্রাণ দিয়েছিলেন? তবুও মানুষ আশায় বাঁচে, কারণ স্বপ্ন দেখাই তো জীবনের ধর্ম।

দার্শনিকদের চোখে কাঠগড়ায় গণতন্ত্র

প্রাচীন গ্রিস থেকে উদ্ভূত এই ব্যবস্থাকে আধুনিক বিশ্বের সেরা শাসনতন্ত্র মনে করা হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকেই এর কড়া সমালোচনা করেছেন। খোদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক অ্যারিস্টোটল একে ‘মূর্খের শাসন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তার মতে, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সবার হাতে সমানভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষটি আর একজন সম্পূর্ণ অজ্ঞ মানুষের মতামতের ওজন একদম সমান হয়ে যায়। আর এখানেই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় সংকট। দার্শনিক প্লেটোর শঙ্কা ছিল আরও গভীর। তিনি রাষ্ট্রকে একটি জাহাজের সাথে তুলনা করে বলেছিলেন, এর স্টিয়ারিং যদি দক্ষ নাবিকের বদলে সাধারণ যাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে সবাই নিজের মতো করে টানাহেঁচড়া করবে এবং জাহাজটি নিশ্চিতভাবেই পথ হারাবে। আজকের বিশ্বে তাকালেও এর কিছুটা সত্যতা মেলে। অনেক উন্নত ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের ছায়ায় স্থিতিশীল থাকলেও, বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির দেশগুলোর প্রায় সবই গণতান্ত্রিক। তবুও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো এই ব্যবস্থাকেই অনুন্নত দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে মরিয়া থাকে।

দলীয় স্বার্থ, ভোট কেনাবেচা ও ক্ষমতার মোহ

তাত্ত্বিকভাবে গণতন্ত্রে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এটি রূপ নেয় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা দখলের একচেটিয়া খেলায়। জনগণের আবেগকে পুঁজি করে, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি বা ভয় দেখিয়ে ভোট আদায় করার রেওয়াজ এখন অনেকটাই সাধারণ বিষয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভোট পরিণত হয় স্রেফ একটি কেনাবেচার পণ্যে। মানুষ সাময়িক লাভের আশায় নিজেদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়, যা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। তাছাড়া দলীয় রাজনীতি বা জোট সরকারের নানা আপস এবং দরকষাকষির নিচে জনগণের আসল চাওয়া চাপা পড়ে যায়। শুধু তাই নয়, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলোও বারবার বাতিল হয়ে যায়, যার ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় দেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক

বাংলাদেশের দিকে তাকালে গণতন্ত্রের এক জটিল ও ধোঁয়াশাপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে নিয়মিত নির্বাচন, রাজনৈতিক দল বা ভোটের উৎসব দেখলে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, ভেতরে এটি মূলত এক অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এখানকার রাজনীতি অনেকটা গ্যালারিতে বসে দেখা ক্রিকেট ম্যাচের মতো; দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে দর্শকরা কেবল চিৎকার করে গলা ফাটায়, কিন্তু ম্যাচ শেষে তাদের নিজেদের জীবনে কোনো প্রাপ্তি যোগ হয় না। এর পাশাপাশি রয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রবল আধিপত্য, যেখানে দলের ভেতরেও একজনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। ফলে পরমতসহিষ্ণুতা, বিতর্ক ও মতের বৈচিত্র্যের জায়গাটি সংকুচিত হয়ে আসে। উচ্চশিক্ষিত হলেই যে কেউ জনদরদী নেতা হবেন, এমন ধারণাও এখানে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে।

দিনশেষে গণতন্ত্র কেবলই একটি হাতিয়ার

এতসব ত্রুটির পরও গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই। আসলে গণতন্ত্র নিজে থেকে ভালো বা খারাপ কোনোটিই নয়; এটি স্রেফ একটি হাতিয়ার মাত্র। এই হাতিয়ার দিয়ে যেমন একটি সুন্দর ও মজবুত ঘর তৈরি করা যায়, তেমনি অসতর্ক হলে নিজের হাতটাও কেটে যাওয়ার ভয় থাকে। বাংলাদেশের মতো রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা এই হাতিয়ারটি কীভাবে ব্যবহার করছি তার ওপর। যদি সাধারণ জনগণ আবেগের বদলে যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেদের ভোটের সঠিক মূল্য বুঝতে শেখে এবং নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে, তবেই এই ব্যবস্থা সফল হবে। কারণ দিনশেষে, একটি সমাজ যেমন, তার গণতন্ত্রের চেহারাও ঠিক তেমনই হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category