যান্ত্রিক এই সভ্যতার ঘুম ভাঙে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে। কিন্তু একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো, হঠাৎ কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন রাস্তায় কোনো গাড়ির শব্দ নেই। বাসের হর্ন, ট্রাকের গর্জন, মোটরসাইকেলের আওয়াজ—সব যেন জাদুমন্ত্রে উধাও হয়ে গেছে। সভ্যতার চাকাকে সচল রাখা যানবাহনের চাকাগুলো যদি সত্যিই কোনোদিন ঘোরা বন্ধ করে দেয়, তবে কী হবে এই পৃথিবীর? এটি কেবল কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার গল্প নয়, বরং জ্বালানি সংকটের চরম মুহূর্তে এটি এক ভয়ংকর বাস্তবতা হতে পারে। গাড়ির চাকা থমকে যাওয়ার অর্থ কেবল রাস্তায় যানজট থেকে মুক্তি নয়, এর অর্থ হলো মানবসভ্যতার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
চাকা ঘোরা বন্ধ হওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে ভয়ংকর আঘাতটি আসবে আমাদের দৈনন্দিন খাবারের প্লেটে। গ্রাম থেকে কৃষকের ঘামে বোনা তাজা শাকসবজি, চাল, ডাল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আর শহরে পৌঁছাতে পারবে না। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যেই শহরের বাজারগুলো শূন্য হয়ে পড়বে। সুপারশপ বা মুদি দোকানগুলোর তাক খাঁ খাঁ করবে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি হবে তখন, যখন পকেটে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা থাকা সত্ত্বেও মানুষ এক মুঠো চাল বা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কিনতে পারবে না। কারণ, টাকা দিয়ে পণ্য কেনা যায় ঠিকই, কিন্তু সেই পণ্য আপনার হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যে পরিবহন ব্যবস্থা দরকার, সেটাই তো তখন অচল। জমানো টাকা তখন কেবল কিছু মূল্যহীন কাগজে পরিণত হবে।
যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ সব অচল হয়ে পড়বে। মানুষ চাইলেও কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবে না। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, করোনার সময়ের মতো ঘরে বসে ইন্টারনেটে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবারের পরিস্থিতি তার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ হবে। কারণ, এই পরিবহন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একের পর এক নিভে যাবে। তখন আপনার ঘরে আর আলো জ্বলবে না, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে চার্জ দেওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। ফলে বাসা থেকে কাজ করার যে বিকল্প চিন্তা, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে।
বিদ্যুৎ না থাকলে সবচেয়ে বড় যে বিপর্যয়টি নেমে আসবে, তা হলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। আমাদের মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল টাওয়ারগুলো মূলত বিদ্যুৎ এবং ব্যাকআপ জেনারেটরের (ডিজেল) ওপর নির্ভরশীল। যখন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ থাকবে না এবং জেনারেটর চালানোর মতো তেলও পাম্প থেকে টাওয়ারে পৌঁছাবে না, তখন একে একে সব মোবাইল টাওয়ার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। আমাদের স্মৃতিতে এখনও করোনা মহামারির ভয়াবহতা জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, চাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই পরিস্থিতি করোনার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শ্বাসরুদ্ধকর হবে। করোনার গৃহবন্দি দিনগুলোতে অন্তত আমরা মোবাইল ফোনে প্রিয়জনের কণ্ঠ শুনতে পেতাম, ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের খবর রাখতাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে সাহস জোগাতাম। কিন্তু এই জ্বালানি খরায় যখন নেটওয়ার্কই থাকবে না, তখন প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবার এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হবে। পাশের এলাকায় থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খবর নেওয়ারও কোনো উপায় থাকবে না।
নাগরিক জীবনে এর প্রভাব হবে আরও মর্মান্তিক। গ্যাস সংকটের কারণে রান্নাঘরের চুলাগুলো নিভে যাবে। একদিকে বাজারে খাবার নেই, অন্যদিকে যেটুকু শুকনো খাবার ঘরে মজুত আছে, তা-ও রান্না করে খাওয়ার উপায় থাকবে না। বহুতল ভবনগুলোতে পাম্প চালানোর বিদ্যুতের অভাবে পানির জন্য হাহাকার শুরু হবে। আধুনিক জীবনের প্রতিটি সুযোগ-সুবিধা মুহূর্তের মধ্যে যেন আমাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এক ফোঁটা তেল, একটুখানি গ্যাস আর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য মানুষের যে হাহাকার, তা যেকোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চেয়ে কম হৃদয়স্পর্শী হবে না।
এই চরম পরিস্থিতির একটি খণ্ডচিত্র আমরা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখতে শুরু করেছি। উদাহরণস্বরূপ ফিলিপাইনের কথা বলা যায়। জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে দেশটির অনেক এলাকায় জীবনযাত্রা কীভাবে থমকে গিয়েছে, তা বিশ্ববাসী দেখছে। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে সেখানে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় চরম খাদ্য সংকট থেকে শুরু করে মারাত্মক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফিলিপাইনের সেই পরিস্থিতি আমাদের সবার জন্য একটি বিশাল সতর্কবার্তা।
আর আমাদের নিজেদের দেশের দিকে তাকালেও আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হতে দেখা যায়। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহৃত উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের দাম নতুন করে বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি এবং সরবরাহের এই টানাপোড়েন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সংকট খুব বেশি দূরে নয়। আধুনিক মানবসভ্যতা আক্ষরিক অর্থেই দাঁড়িয়ে আছে এই জ্বালানি আর গাড়ির চাকার ওপর। এই চাকা ঘোরা বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের বেঁচে থাকার সব রসদ, যোগাযোগ এবং আধুনিকতার সব অহংকার নিমেষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে।