• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন
Headline
বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী সংসদে সরকারি দলের এমপিদের অঙ্গভঙ্গি: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জামায়াত আমিরের ‘সরকার জ্বালানি সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে’: সংসদে রুমিন ফারহানা কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট মেক্সিকো, স্পেন ও ব্রাজিল ইসরায়েলের অকুণ্ঠ প্রশংসায় ট্রাম্প, ঘনাচ্ছে নতুন বিতর্ক ‘ইরানকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ট্রাম্প কে?’: পেজেশকিয়ান

উত্তরের আইসিইউ সংকট: ধুঁকছে আট জেলা, প্রবল চাপে রাজশাহী মেডিকেল

Reporter Name / ২৪ Time View
Update : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

দেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি বাইরে থেকে যতটা উন্নত মনে হয়, ভেতরের বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি করুণ। রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় বসবাসকারী প্রায় দেড় কোটি মানুষের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ (ICU) সুবিধা বলতে গেলে একটি বড় শূন্যতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গুরুতর অসুস্থ বা মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানোর শেষ ভরসা এই আইসিইউ। অথচ পুরো বিভাগের কোটি কোটি মানুষের জন্য সরকারিভাবে ভরসা কেবল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৪০টি এবং বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের ৮টি শয্যা। বিভাগের বাকি ছয়টি জেলা সদর হাসপাতালে কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো তৈরি করা হলেও, শুধু দক্ষ জনবলের অভাবে সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ফলে প্রতিদিন বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসংখ্য মানুষ, আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হচ্ছে হাসপাতালের বাতাস।

বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ও স্বজনদের আর্তনাদ

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যখন মুমূর্ষু রোগীর জীবন প্রদীপ নিভে আসে, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা মহামূল্যবান সময়টি অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আইসিইউর খোঁজে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অ্যাম্বুলেন্সে ছুটতে ছুটতেই অনেক রোগীর মৃত্যু হয়। বগুড়ার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী সঞ্জু রায়ের আকুতি যেন এই পুরো অঞ্চলের অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবি। গত শনিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি চরম হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে লিখেছেন, “এত পরিচিতি, এত শুভাকাঙ্ক্ষী, অথচ আমি তার অপারগ ছেলে। বগুড়া মেডিকেলে বাবার জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করতে পারিনি, পাইনি একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ। বাঁচার জন্য ছটফট করতে করতে আমার বাবা আমাদের বুকেই প্রাণ ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।”

সঞ্জু রায়ের এই কষ্ট কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি উত্তরের প্রতিটি সাধারণ পরিবারের নিত্যদিনের আতঙ্কের চিত্র। যাঁদের কিছুটা পরিচিতি বা সামর্থ্য আছে, তাঁরাই যখন এমন নিরুপায়, তখন প্রান্তিক পর্যায়ের একজন কৃষক বা শ্রমিকের অবস্থা কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই অনুমেয়। আইসিইউর অভাবে শুধু বয়স্করাই নন, শিশুদের অবস্থাও শোচনীয়। সম্প্রতি উত্তর ও দক্ষিণের জেলাগুলো থেকে আসা রোগীদের চাপে রামেক হাসপাতালে আইসিইউর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মাত্র ১১ দিনে ৩৩ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

অবকাঠামোর প্রহসন এবং জেলা হাসপাতালগুলোর বেহাল দশা

করোনা মহামারির সময় স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা সামনে এলে সরকার তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন জেলায় আইসিইউ শয্যা ও ভেন্টিলেটর সরবরাহ করেছিল। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম হলো, কেবল দামি যন্ত্র কিনলেই আইসিইউ চলে না; এর জন্য প্রয়োজন ক্রিটিক্যাল কেয়ার স্পেশালিস্ট (ইনটেনসিভিস্ট), অ্যানেসথেটিস্ট, রেসপিরেটরি থেরাপিস্ট, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স। একজন সাধারণ নার্স দিয়ে আইসিইউ পরিচালনা করা অসম্ভব। এই জনবল সংকটের কারণেই উত্তরের জেলাগুলোতে অবকাঠামোর এক চরম প্রহসন চলছে।

জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ২০২২ সালে বেশ ঘটা করে ১০ শয্যার একটি আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও সাধারণ নাগরিকরা সেখান থেকে একদিনের জন্যও সেবা পাননি। হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানান, শুধুমাত্র জনবলের অভাবেই এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, নওগাঁ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আবুজার গাফফার জানান, করোনাকালে তাদের দুটি বেড দেওয়া হলেও জনবল না থাকায় সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। পাবনা জেনারেল হাসপাতালেও তিনটি আইসিইউ বেড বরাদ্দ ছিল, যা বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ। বাধ্য হয়ে সেখানকার রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ১০ শয্যার সিসিইউ (কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট) থাকলেও কোনো আইসিইউ নেই। নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল নামেই ‘আধুনিক’, সেখানে আইসিইউর কোনো অস্তিত্বই নেই। আবাসিক চিকিৎসক ডা. সম্রাট স্বীকার করেন, এটি কেবল নামেই জেনারেল হাসপাতাল, সেবার মান আগের মতোই রয়ে গেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর অবস্থা বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে। সেখানে নিজস্ব কোনো আইসিইউ বেড নেই। পুরো জেলার সরকারি ভরসা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের মাত্র ৮টি শয্যা।

রামেক হাসপাতালের লড়াই এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা

পুরো উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের একাংশের মুমূর্ষু রোগীদের শেষ গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রোগীর এই প্রবল চাপ সামলাতে হাসপাতালটিতে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০টি এবং শিশুদের জন্য ২০টি শয্যা নির্ধারিত। কিন্তু অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয় হলো, এই বিশাল আইসিইউ কমপ্লেক্সটি আজও সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি!

রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম জানান, বর্তমানে ৪০ শয্যার যে আইসিইউ চলছে, তা সম্পূর্ণ হাসপাতালের নিজস্ব উদ্যোগে এবং ব্যবস্থাপনায় জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। সরকার আজ পর্যন্ত এই ইউনিটের জন্য একজন চিকিৎসক বা নার্সও নিয়োগ দেয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্যান্য ওয়ার্ড থেকে জনবল এনে বিশেষ ব্যবস্থায় ৪০টি শয্যা চালু রেখেছে, যার মধ্যে ১২টি যুবকদের, ১৬টি বয়স্কদের এবং ১২টি শিশুদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টেকনিশিয়ান না থাকায় শিশুদের জন্য নির্ধারিত আলাদা ২০টি শয্যা প্রস্তুত থাকার পরও চালু করা যাচ্ছে না, অথচ শিশুদের আইসিইউর চাহিদা বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

সংকটের ভৌগোলিক বিস্তার ও বেসরকারি চিকিৎসার ফাঁদ

আইসিইউ সংকট এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নেই। রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, রাজশাহী ও রংপুর তো বটেই, এমনকি খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলো থেকেও এখানে মুমূর্ষু রোগী পাঠানো হচ্ছে। গত ১৯ মার্চ আইসিইউ সিরিয়ালে থাকা সর্বশেষ রোগীর ঠিকানা ছিল ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী জেলা! এর মানে হলো, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একটিমাত্র আইসিইউ শয্যার আশায় শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রাজশাহীতে ছুটে আসছেন, যা চরম অমানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ।

সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে নিরুপায় হয়ে মানুষ ছুটছেন বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজে ১০টি এবং পাবনার অ্যাসোর্ট স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি এসব হাসপাতালের প্রতিদিনের বিল মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে প্রিয়জনকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু হয়ে পড়ছেন।

সমাধানের রূপরেখা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ হলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম কেন্দ্রীকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা। জরুরি ভিত্তিতে রামেক হাসপাতালের আইসিইউ কমপ্লেক্সটির সরকারি অনুমোদন দিয়ে সেখানে স্থায়ী ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে, জেলা পর্যায়ের আইসিইউগুলোর তালা খুলে সেখানে শুধু চিকিৎসক নয়, বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্রিটিক্যাল কেয়ার টিম পদায়ন করতে হবে। উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে রোগী স্থানান্তরের এই নির্মম সংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারলে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসবে না। মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, যা কোনোভাবেই অবহেলার সুযোগ নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category