ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে চলা তুমুল বিতর্ক ও নানামুখী কেলেঙ্কারির ঘটনা বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে সামনে এসেছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত এই মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা হাজারো অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে বর্তমান বিএনপি সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্পষ্ট করেছেন যে, নগদ এখনই পুরোপুরি বিক্রি করা হচ্ছে না, বরং প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের জঞ্জাল পরিষ্কার করে এটিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যম ও বিভিন্ন তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নগদের আড়ালে প্রায় ২,৩০০ কোটি টাকার ভয়ংকর দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে দেখা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতারা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ডাক বিভাগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই ‘নগদ’ সেবা চালু করেছিলেন।
হাসিনা সরকারের সাবেক উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন, সাবেক সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, রাজি মোহাম্মদ ফখরুলসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে জড়িত ছিলেন। এমনকি নগদের পর্দার আড়ালের মালিকানা ও সুবিধাভোগী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামও আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর নগদের যাবতীয় জালিয়াতি ও লুকিয়ে রাখা তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে বাংলাদেশ ব্যাংক এর বিরুদ্ধে গভীর অনুসন্ধান চালায়। সেই প্রেক্ষিতে আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর এ মিশুকসহ ২৪ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নগদকে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের নির্দেশে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও, পরবর্তীতে সংস্কারের নামে উল্টো প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন করে দখলদারিত্ব কায়েমের অভিযোগ ওঠে।
নগদের সিইও তানভীর মিশুক বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক তথা উপদেষ্টার পিএ আতিক মুর্শেদ নগদের ছয় তলার একটি কক্ষে বসে প্রতিদিন অফিস করতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা জুইকে নগদের ‘ম্যানেজার কমপ্লায়েন্স’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের রেফারেন্সে আরও অনেককে চাকরি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি কোনো কাজ না করেই, এমনকি কয়েক বছর আগে শেষ হয়ে যাওয়া প্রজেক্ট বা ইভেন্টের ভুয়া নাম ব্যবহার করে নগদ থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছে।
সেই সময় নগদ কিনে নেওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আরমান। তবে নানা আইনি জটিলতায় ইউনুস সরকারের আমলে নগদ বিক্রির সেই প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া ও কিছু গণমাধ্যমে প্রচার শুরু হয় যে, বর্তমান বিএনপি সরকার নগদকে মাত্র ১,৫০০ কোটি টাকায় খুব সস্তায় বিক্রি করে দিচ্ছে। এই গুঞ্জনের প্রেক্ষিতে নগদের সিইও তানভীর মিশুক নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে দাবি করেন, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে একটি আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম নগদের অফিশিয়াল বাজারমূল্য (ভ্যালুয়েশন) নির্ধারণ করেছিল ১৬,৩৭৮ কোটি টাকা। তিনি সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের তীব্র সমালোচনা করে লেখেন, তারা এত সস্তা নেশাগ্রস্ত মানুষ নন যে ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রতিষ্ঠান মাত্র ১,৫০০ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেবেন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, তানভীর মিশুক নগদের বিশাল বাজারমূল্যের রেফারেন্স দিলেও, প্রতিষ্ঠানটির ঘাড়ে চেপে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ ও দায়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। একই সাথে তাঁর বিরুদ্ধে চলা দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মামলা এবং অর্থ পাচারের তদন্তের বিষয় নিয়েও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর, নগদকে বিগত আমলের দুর্নীতি ও অনিয়মের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করার চ্যালেঞ্জ সরকারের কাঁধে এসে পড়ে। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, নগদকে এখনই বিক্রি বা পুরোপুরি মালিকানা হস্তান্তর করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
তবে সরকার স্বীকার করেছে যে, নগদের বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ধস নেমেছে এবং এর উন্নয়ন জরুরি। এই উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ সরকার নিজে করবে, নাকি তৃতীয় কোনো আন্তর্জাতিক বা দেশীয় পক্ষকে দায়িত্ব দেবে—তা নিয়ে বর্তমানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সেই সূত্রেই মূলত নগদের শেয়ার বিক্রি বা নতুন বিনিয়োগের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা কোনোভাবেই সস্তায় প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেওয়া নয়। সরকারের লক্ষ্য, সব আইনি ও আর্থিক তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নগদকে দেশের একটি নিয়মতান্ত্রিক ও শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করা।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪