• বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪১ অপরাহ্ন
Headline
গ্রামে মারাত্মক লোডশেডিং: জ্বালানি সংকট উত্তরণে মন্ত্রীদের আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান রিজভীর আরও ১০০০ মাদ্রাসায় কারিগরি ট্রেড কোর্স চালুর ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর বিবি আছিয়া: নারী সমাজের এক অনন্য অনুপ্রেরণা যুদ্ধের প্রভাবে ইরানে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর সবার মনোনয়ন বৈধ আদর্শের লড়াইয়ে বিজেপিকে কেবল কংগ্রেসই হারাতে পারে: রাহুল গান্ধি বিধানসভা নির্বাচন: পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির বিশেষ বার্তা দুই দশক পর গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে পৌর নির্বাচন হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়: ইরানের কোষাগারে জমা হলো প্রথম আয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্ব: অন্তর্বর্তী সরকার ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

Reporter Name / ২৬ Time View
Update : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে নতুন করে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সম্প্রতি দাবি করেছেন, ‘ডিপ স্টেট’ এই অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার একটি রোডম্যাপ ও স্ট্র্যাটেজি দিয়েছিল। তাঁর ভাষ্যমতে, সরকার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে নির্বাচনের পথে হেঁটেছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএনপির পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে নির্বাচনের জোরালো দাবি এবং আন্দোলনের হুঁশিয়ারি আসতে থাকে। ফলশ্রুতিতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ড. ইউনূস ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বা আগস্টের মধ্যে নির্বাচনের একটি রূপরেখা দিতে বাধ্য হন। কাজেই, ডিপ স্টেটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করাটি কেবল সরকারের সদিচ্ছা ছিল, নাকি বিরোধী দলগুলোর প্রবল রাজনৈতিক চাপের কাছে আত্মসমর্পণ—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর সংশয় রয়েছে।

শেখ হাসিনার পতন: কেবলই কি বিদেশি ষড়যন্ত্র?

ডিপ স্টেট মূলত এমন একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ধারণা, যেখানে নির্বাচিত সরকারের বাইরে অদৃশ্য ও শক্তিশালী ব্যক্তিবর্গ বা রাষ্ট্রকাঠামো কলকাঠি নাড়ে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পেছনে এমন শক্তির হাত থাকার গুঞ্জন রয়েছে এবং স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের বরাতে বাংলাদেশে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের কথাও শোনা যায়। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে যদি কেবলই ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, তবে তা এই আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া শত শত ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে চরম অপমান করার শামিল হবে। গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদী শাসন এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি দলীয়করণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে অর্থহীন করে ফেলার কারণেই জনরোষ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান কেবল এই পতনের ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করেছে।

সেন্ট মার্টিন, আরাকান আর্মি ও মার্কিন স্বার্থ

ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতারা বারবার তাঁদের পতনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা স্বয়ং অভিযোগ করেছিলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি করতে না দেওয়ার কারণেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। যদিও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে এর সাথে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সমীকরণটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে রাখাইন বা আরাকান প্রদেশের ১৭টি জেলার মধ্যে ১৫টির নিয়ন্ত্রণই স্বাধীনতাকামী আরাকান আর্মির হাতে। সেন্ট মার্টিনের পাশ দিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের চলাচল এবং আরাকানে মার্কিন সাহায্য পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের মহড়া, সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং আরাকান আর্মিকে ‘মানবিক করিডোর’ দেওয়ার আলোচনা একই সূত্রে গাঁথা কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সন্দেহ রয়েছে। ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের প্রবেশ নিয়েও ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন

প্রক্সি ওয়ারের এই যুগে বাংলাদেশের মতো একটি ছোট দেশের পক্ষে পরাশক্তিগুলোর স্বার্থকে পুরোপুরি অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, ড. ইউনূসের সরকার কি ডিপ স্টেটের স্বার্থ রক্ষায় এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে যা সরাসরি বাংলাদেশের বিপক্ষে যায়? আপাতদৃষ্টিতে সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি এবং বোয়িংয়ের মতো যাত্রীবাহী বিমান কেনার আলোচনা চলছে, অন্যদিকে চীনকে খুশি রাখতে অর্থনৈতিক জোন (যা আগে ভারতকে দেওয়ার কথা ছিল), অস্ত্র কারখানা তৈরি এবং তিস্তা প্রকল্পের মতো বড় চুক্তিগুলো সম্পন্ন করা হচ্ছে।

‘কালার রেভল্যুশন’, সুশীল সমাজ ও মাইনাস ফর্মুলা

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে সমালোচিত দিকটি হলো ‘কালার রেভল্যুশন’ বা রঙধনু বিপ্লবের অভিযোগ। মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস এবং তাঁর ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনকে এই প্রক্রিয়ার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক বলে মনে করেন অনেকেই। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুশীল সমাজ ও তরুণদের একটি অংশকে ক্ষমতায় বসিয়ে মূলধারার রাজনীতিকদের (বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতকে) কোণঠাসা করার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে, যা অনেকটাই এক-এগারোর (১/১১) ‘মাইনাস ফর্মুলা’র কথা মনে করিয়ে দেয়। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গঠিত ১১টি কমিশনের কার্যক্রমে এমন অনেক পশ্চিমা বা আদর্শিক সংস্কারের প্রস্তাব আসতে থাকে, যা জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলো এবং বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই আদর্শিক বিরোধ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল আপত্তির কারণেই শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ও এনসিপির সংস্কারপন্থি অংশ দ্রুত নির্বাচনের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়।

তারেক রহমানের সামনে কি চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার যখন দায়িত্ব পালন করছে, তখন ডিপ স্টেটের এই অদৃশ্য প্রভাব মোকাবিলা করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

  • ভারসাম্য রক্ষা: একদিকে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ (বোয়িং কেনা বা ১৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি) রক্ষা করা, অন্যদিকে চীনের সাথে তিস্তা প্রকল্প ও অর্থনৈতিক জোনের ভারসাম্য বজায় রাখা হবে চরম মুন্সিয়ানার কাজ।

  • দেশীয় স্বার্থ বনাম আন্তর্জাতিক চাপ: চট্টগ্রাম বন্দর লিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে বিদেশি কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। অনির্বাচিত সরকার জবাবদিহিহীনভাবে যা করতে পেরেছে, একটি নির্বাচিত সরকারকে জনগণের কাছে তার কৈফিয়ত দিতে হবে।

  • ডিপ স্টেটের প্রভাব এড়ানো: ডিপ স্টেট সবসময় চায় একটি অনুগত বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য সরকার। তারেক রহমান যদি শক্তিশালী জনভিত্তি এবং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন, তবেই এই অদৃশ্য শক্তির প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত রাখা সম্ভব।

আগামীর চ্যালেঞ্জ

আসিফ মাহমুদের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশকে একটি ভিন্ন ট্র্যাকে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থান সেই পরিকল্পনাকে পূর্ণতা পেতে দেয়নি। এখন তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জ হলো—এই ভূ-রাজনৈতিক প্রক্সি ওয়ারের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং নিশ্চিত করা যে, দেশের ক্ষমতা যেন কোনো অদৃশ্য শক্তির হাতে না থেকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই থাকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category