• শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২:২৫ অপরাহ্ন

আদালতে ঝুলছে দুদকের ৮ হাজারেরও বেশি মামলা, কমছে নিষ্পত্তির হার

Reporter Name / ১০১ Time View
Update : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
প্রতীকী ছবি

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাজট দেশজুড়ে চরম আকার ধারণ করেছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ পর্যন্ত বর্তমানে দুদকের ৮ হাজার ৩৩০টি দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন। নিষ্পত্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় গত পাঁচ বছরেই আদালতে নতুন করে প্রায় দুই হাজার মামলার বিশাল স্তূপ জমেছে।

দুই দশকের পুরোনো মামলা ও বিচার স্থগিত

দুদকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে (২০০৪ সাল) চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই বিপুল সংখ্যক মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে বিলুপ্ত ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’র আমলের ৩৩৫টি মামলা গত দুই দশক ধরে বিচারাধীন। এছাড়া, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনায় স্থগিতাদেশ থাকায় ৪৮৪টি মামলার বিচার কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

পরিসংখ্যানে মামলাজট ও নিষ্পত্তির নিম্নমুখী হার

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছরই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়ছে এবং এর বিপরীতে নিষ্পত্তির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিচারাধীন মামলা ছিল ৬,৩৭৩টি। এরপর ২০২২ সালে ৬,৬৬৭টি, ২০২৩ সালে ৭,২৭৮টি, ২০২৪ সালে ৭,৬৮৯টি এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮,৩০৬টিতে।

অন্যদিকে, পাঁচ বছর আগে মামলা নিষ্পত্তির হার প্রায় ১০ শতাংশের ওপরে থাকলেও বর্তমানে তা ৭ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে নিষ্পত্তির হার ছিল ১০.০৮ শতাংশ, যা কমতে কমতে ২০২৫ সালে ৭.৬৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

কেন বাড়ছে এই মামলাজট?

আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:

  • বিচারকদের অগ্রাধিকার: দুর্নীতির মামলা পরিচালনার জন্য ‘বিশেষ জজ আদালত’ থাকলেও বিচারকরা অনেক সময় চেক ডিজঅনার (এনআই অ্যাক্ট) ও মাদক মামলাগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেন। কারণ, এসব মামলা তুলনামূলক দ্রুত নিষ্পত্তি করে ভালো পারফরম্যান্স দেখানো যায়।

  • প্রভাবশালীদের কৌশল: এসব মামলায় অভিযুক্তদের বেশিরভাগই প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তারা বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে হাইকোর্টে রিট দায়েরসহ নানা আইনি ফাঁকফোকরের আশ্রয় নেন।

  • সাক্ষীর অনুপস্থিতি: সাক্ষীদের সময়মতো আদালতে হাজির না হওয়া মামলা পেছানোর আরেকটি বড় কারণ বলে জানিয়েছেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম।

রাজনৈতিক নিয়োগ ও জবাবদিহির অভাব

বিশেষজ্ঞরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, দুদক একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও বিভিন্ন সময় সরকার মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে আইনজীবী নিয়োগ দেয়। ফলে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব আইনজীবীর জবাবদিহির চরম অভাব থাকে এবং তারা অনেক সময় কমিশনের অবস্থানের চেয়ে সরকারি স্বার্থের দিকেই বেশি নজর দেন।

উত্তরণের উপায়

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম জানান, দুর্নীতির মামলার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও ডেডিকেটেড কোনো আদালত না থাকাই এই জটের মূল কারণ। বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিতে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট বিশেষ আদালতের বিচারকদের প্রতি মাসে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিলেও তা অনেকাংশেই উপেক্ষিত হচ্ছে।

এই সংকট সমাধানে তিনি দুদকের মামলার জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আদালত গঠন, দক্ষ আইনজীবীদের নিয়ে একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট তৈরি এবং হাইকোর্টের কঠোর নজরদারির ওপর জোর দিয়েছেন। আইনজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো বিচার শেষ না হলে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ে এবং এর ফলে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category