একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে টেনে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশ গড়ার প্রত্যয়ে দায়িত্ব নিলেও গত ১৮ মাসে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতি এবং একই সময়ে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থসিদ্ধির এক দীর্ঘ তালিকা এখন জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ‘আগে দেশ না আগে ইউনূস?’—এই বিতর্ক এখন রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে তুঙ্গে।
দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে যেখানে ২০টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে, সেখানে ড. ইউনূসের মালিকানাধীন ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ পেয়েছে নজিরবিহীন সুবিধা। আবেদন করার মাত্র তিন মাসের মাথায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে যায়। ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীন নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ‘রকেট গতিতে’ অনুমোদন নেওয়াকে বিশেষজ্ঞরা ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
দেশের অর্থনীতি যখন চরম সংকটে, রাজস্ব আদায়ে যখন ভাটা, ঠিক তখনই গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে বিশাল কর সুবিধা। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জারি করা একটি গেজেট অনুযায়ী, ২০২৯ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংককে সকল প্রকার আয়কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা এবং ৫ বছরে অন্তত ১০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। সাধারণ মানুষ যখন চড়া মূল্যে নিত্যপণ্য কিনছে, তখন একটি বিশেষায়িত ব্যাংককে এই বিশাল কর মওকুফ দেওয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূস নিজের বিরুদ্ধে থাকা প্রায় ৬০টি মামলা থেকে দ্রুতই নিষ্কৃতি পেয়েছেন। এর মধ্যে বহুল আলোচিত শ্রম আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতির মামলাগুলোও রয়েছে। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড’ এবং ‘সামাজিক সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে রিক্রুটিং ও ইয়ালেট লাইসেন্স পেয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতার প্রভাব ছাড়া কি এই দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা কাজগুলো এত দ্রুত সম্ভব হতো?
ড. ইউনূসের শাসনামলের গত ১৮ মাসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী:
আর্থিক খাত: খেলাপি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
শিল্প ও কর্মসংস্থান: শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম আস্থাহীনতা।
আইন-শৃঙ্খলা: জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ড. ইউনূসের এই ১৮ মাসে একদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার থমকে গেছে, অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিগত ও আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। ক্ষমতার চেয়ারে বসে নিজের মামলার নিষ্পত্তি এবং নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় লঙ্ঘন।
শান্তির দূত হিসেবে ড. ইউনূস যখন বিশ্বমঞ্চে পরিচিত, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ‘আখের গোছানোর’ এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। সাধারণ জনগণের প্রশ্ন—সংস্কারের নামে এই ১৮ মাস কি তবে কেবল একটি গোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম ছিল? দেশের অর্থনীতির ‘বারোটা বাজলেও’ নিজের ‘ষোলোআনা’ বুঝে নেওয়ার এই প্রবণতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৈতিক ভিত্তিকেই আজ বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।