• শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১৫ পূর্বাহ্ন
Headline
গ্রামে মারাত্মক লোডশেডিং: জ্বালানি সংকট উত্তরণে মন্ত্রীদের আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান রিজভীর আরও ১০০০ মাদ্রাসায় কারিগরি ট্রেড কোর্স চালুর ঘোষণা শিক্ষামন্ত্রীর বিবি আছিয়া: নারী সমাজের এক অনন্য অনুপ্রেরণা যুদ্ধের প্রভাবে ইরানে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর সবার মনোনয়ন বৈধ আদর্শের লড়াইয়ে বিজেপিকে কেবল কংগ্রেসই হারাতে পারে: রাহুল গান্ধি বিধানসভা নির্বাচন: পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির বিশেষ বার্তা দুই দশক পর গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে পৌর নির্বাচন হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়: ইরানের কোষাগারে জমা হলো প্রথম আয়

জ্বালানি সংকটে চতুর্মুখী চাপে বাংলাদেশ—ঝুঁকিতে অর্থনীতি ও জনজীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ১৬ Time View
Update : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারের অস্থিরতার ঢেউ এখন আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের উপকূলে। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘কৃত্রিম সংকট’ বলা হলেও বাস্তবে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্পোদ্যোক্তা ও কৃষকদের। চাহিদামতো জ্বালানি না মেলায় দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাক খাত যেমন ঝুঁকির মুখে পড়েছে, তেমনি বোরো আবাদ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। পণ্য পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি এবং মৎস্য শিকারে স্থবিরতা সব মিলিয়ে দেশ এখন এক চতুর্মুখী সংকটের আবর্তে।


১. পোশাক খাতে উৎপাদন বিপর্যয় ও রপ্তানি ঝুঁকি

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস পোশাক খাত এখন জ্বালানি সংকটের কারণে চরম অস্তিত্ব সংকটে। অনেক কারখানায় উৎপাদন সচল রাখতে নিজস্ব জেনারেটর বা বয়লারের জন্য প্রয়োজনীয় তেলের চাহিদার অর্ধেকও মিলছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের হাতে পণ্য পৌঁছে দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

নিট পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, অন্তত ১৪১টি কারখানার দৈনিক ৬২ হাজার লিটার জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। শিল্প এলাকার কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহের জন্য তারা সরকারের কাছে বিশেষ তালিকা জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সময়মতো সমাধান না হলে পোশাক রপ্তানি ব্যাপকহারে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

২. বোরো আবাদে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ

দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি বোরো আবাদ এখন জ্বালানি তেলের অভাবে হুমকির মুখে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে, বিশেষ করে বগুড়া ও গাইবান্ধায় সেচ পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল মিলছে না।

  • কৃষকের হাহাকার: পাম্পে তেল না পেয়ে অনেক কৃষক খোলাবাজার থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৮০ টাকা দরে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

  • উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি: তেলের চড়া দামের কারণে সেচ খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চললে ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না এবং চাষিরা লাভের বদলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।

৩. পণ্য পরিবহন ভাড়া ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংকট

সড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাম্পগুলোতে তেলের রেশনিং চলায় একটি গাড়ি একবারে পূর্ণ ট্যাংক তেল পাচ্ছে না। ফলে একটি ট্রিপ শেষ করতে বারবার তেলের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, যা সময় ও খরচ—উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধি: আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাজীপুর বা ঢাকার শিল্প এলাকায় যে ট্রিপ আগে ২০ হাজার টাকায় সম্পন্ন হতো, এখন তার ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এই বাড়তি ভাড়ার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে নিত্যপণ্যের দামের ওপর।

৪. মৎস্যজীবীদের হাহাকার ও সমুদ্রে স্থবিরতা

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সমুদ্রগামী মৎস্য শিকারি জাহাজগুলোর ওপর। মার্চ মাসে রেশনিংয়ের কারণে চাহিদার অর্ধেক তেল পাওয়ায় অনেক জাহাজ সমুদ্রে নামতে পারেনি।

  • আর্থিক ক্ষতি: একটি বড় জাহাজ সমুদ্রে মাছ শিকারে পাঠাতে দিনে ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হয়, যার বড় অংশই জ্বালানি ব্যয়। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ট্রিপ বাতিল করতে হয়েছে।

  • বেতন-ভাতা সংকট: আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে দুই মাস সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। তার আগে পর্যাপ্ত মাছ শিকার করতে না পারায় জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আটকে গেছে, যা মৎস্যজীবী পরিবারগুলোতে চরম দারিদ্র্য ডেকে এনেছে।

৫. অর্থনীতির ওপর সামগ্রিক চাপ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির এই সংকট কেবল যাতায়াতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি দেশের উৎপাদনশীল খাতকে আঘাত করছে। একদিকে পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়া—এই দুই মিলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে।


 জ্বালানি তেলের এই সংকট যদি দ্রুত সমাধান না করা হয়, তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে। পণ্য পরিবহন ভাড়া বাড়লে বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে। সরকারের উচিত ‘কৃত্রিম সংকট’ ও ‘মজুতদারদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিল্প ও কৃষি খাতে জ্বালানি সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা। নতুবা এই চতুর্মুখী চাপ সামলানো দেশের অর্থনীতির জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category