২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিতর্কিত ও কলঙ্কিত অধ্যায়। ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে উচ্ছেদ করা হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই রুদ্ধদ্বার অভিযানের নেপথ্য কারিগর ও কুশীলবদের নাম মুখ খুলতে শুরু করেছেন সে সময়ের প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। রিমান্ডে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের কার কী ভূমিকা ছিল, তার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।
শেখ মামুন খালেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়েছিল অভিযানের আগের দিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ বাহিনীর সদর দপ্তরে। সেই গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা। বৈঠকেই সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল কার দায়িত্ব কী হবে। পরিকল্পনার মূল তদারকি বা সরাসরি মনিটরিং করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জিজ্ঞাসাবাদে মামুন খালেদ জানান, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান কুশীলব ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর। এছাড়াও সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) সেই বৈঠকে বিস্তারিত ব্রিফিং করেন। উল্লেখ্য, এই সিজিএস গত ২৪ ডিসেম্বর সস্ত্রীক দেশত্যাগের চেষ্টা করলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেয়।
২০১০ সালের সেই শীতের সকালে মঈনুল রোডের ৬ নম্বর বাড়িটি ঘিরে ফেলেছিল র্যাব, পুলিশ ও সামরিক গোয়েন্দাদের একটি বিশেষ অংশ। শেখ মামুন খালেদ জানান, অভিযানে সশরীরে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।
পুরো উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার প্রতিটি মুহূর্ত ভিডিও ধারণ করার জন্য ‘মু’ আদ্যাক্ষরের একজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও আইএসপিআর-এর তৎকালীন পরিচালক এবং ডিজিএফআই-এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পুরো বিষয়টি সমন্বয় করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়িতে ৩৮ বছর বসবাস করার পর খালেদা জিয়াকে অনেকটা জোর করেই বের করে দেওয়া হয়, যা তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
শেখ মামুন খালেদ নিজে এক-এগারো সরকারের সময় ডিজিএফআই-এর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে পদোন্নতি দিয়ে ডিজিএফআই প্রধানের দায়িত্ব দেয়। কেবল মামুন খালেদই নন, বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন এক-এগারোর আরও দুই প্রভাবশালী কুশীলব—লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. আফজাল নাছের।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী: মানব পাচার ও চাঁদাবাজির মামলায় রিমান্ডে থাকা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এক-এগারোর সময় ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠনের নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে এবং অনেক ভুক্তভোগী এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
আফজাল নাছের: তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এক-এগারোর সময় তিনি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্যাতন চালিয়ে অর্থ আদায় এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রিমান্ডে অমানুষিক নির্যাতনের সাথে যুক্ত ছিলেন। যদিও জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে ‘ভিক্টিম’ দাবি করেছেন এবং তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের নির্দেশ পালনের দোহাই দিয়েছেন।
শেখ মামুন খালেদ বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় ৬ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তারকৃত এই কর্মকর্তাদের জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে আসছে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও অনেক ভুক্তভোগী এখনো লোকলজ্জা বা আইনি জটিলতার ভয়ে মামলা করতে সামনে আসছেন না, তবে গোয়েন্দারা তাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
খালেদা জিয়ার বাড়ি উচ্ছেদের সেই ঘটনা কেবল একটি উচ্ছেদ ছিল না, বরং সেটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ এক যুগ পর সেই ঘটনার নেপথ্যের কারিগরদের একে একে আইনের আওতায় আসা এবং চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হওয়াকে দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মঈনুল রোডের সেই বাড়িটি ছিল জিয়া পরিবারের আবেগের জায়গা। ১৯৮১ সালে জিয়ার শাহাদাতের পর তৎকালীন সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় বাড়িটি খালেদা জিয়াকে লিজ দিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেই লিজ বাতিল ও জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের নেপথ্যে যারা ছিলেন, তাদের মুখোশ এখন উন্মোচিত হচ্ছে। রিমান্ডে থাকা সাবেক জেনারেলদের জবানবন্দি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শিগগিরই আরও অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্যভেদ হবে বলে আশা করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।