• বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন

ভারতের পানি রাজনীতি: সমাধানে কি চীনের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ?

বিশেষ প্রতিবেদক / ১১৯ Time View
Update : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির দীর্ঘদিনের এক অমীমাংসিত যন্ত্রণার নাম ‘অভিন্ন নদ-নদীর পানি বণ্টন’। গত কয়েক দশক ধরে ভারতের সঙ্গে পানি নিয়ে আলোচনা চললেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান আসেনি। বরং গঙ্গা, তিস্তা থেকে শুরু করে ছোট-বড় ৫৪টি অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজছে। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং উত্তরবঙ্গের পানিশূন্যতা দূর করতে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সম্ভাবনাময় মহাপরিকল্পনা ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট বা ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর নাব্য রক্ষা, ভাঙন রোধ এবং সেচ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির হার সরাসরি ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাবে। উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দেওয়ার পাশাপাশি এটি খাদ্য নিরাপত্তায় এক বিশাল মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে।

কেন থমকে ছিল এই সম্ভাবনা?

প্রশ্ন উঠতে পারে, এত বিপুল সম্ভাবনাময় একটি প্রকল্প কেন এতদিন বাস্তবায়িত হয়নি? এর পেছনে রয়েছে গত ১৫ বছরের গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের প্রশাসন ও নীতি-নির্ধারণী মহলে এক ধরণের ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ (India First) নীতি গড়ে উঠেছিল। অনেক ঊর্ধ্বতন আমলা ও নীতি-নির্ধারক ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ভারতকে অসন্তুষ্ট না করার কৌশলের কারণেই চীনের প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পটি দীর্ঘকাল হিমাগারে পড়ে ছিল। ভারতের পক্ষ থেকে তিস্তা প্রকল্পে চীনের উপস্থিতি নিয়ে সরাসরি ও পরোক্ষ আপত্তি ছিল, যা তৎকালীন সরকার পাশ কাটাতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক আইন বনাম ভারতের একগুঁয়েমি

আন্তর্জাতিক নদ-নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, উজানের দেশ ভাটির দেশের পানির অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে না। যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তবে আলাদা করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিরও প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু ভারত পৃথিবীর সেই বিরল দেশগুলোর একটি, যারা প্রায়ই আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশীর মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে আসছে। ফলে ভারতের সাথে ঢাকাকে বারবার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির টেবিলে বসতে হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, চুক্তি হওয়ার পরও ভারত ক্রমাগত তা লঙ্ঘন করেছে। গঙ্গা পানি চুক্তির শুষ্ক মৌসুমে পানি না পাওয়া কিংবা তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে রাখা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আওয়ামী লীগ-ভারত সখ্য ও প্রাপ্তির খাতা

গত ১৫ বছর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এক টানা ক্ষমতায় ছিল। প্রচার করা হতো যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘উচ্চতায়’ অবস্থান করছে। কিন্তু সেই মধুর সম্পর্কের বিনিময়ে বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারেনি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও কেন একটি কার্যকরী পানি বণ্টন চুক্তি করা সম্ভব হলো না, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে।

চীনের পথে সমাধান?

ভারতের দীর্ঘসূত্রতা ও অনিচ্ছার বিপরীতে চীন এই সমস্যার কারিগরি সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারতের পানির ওপর নির্ভর না করে নদীর ভেতরে ড্রেজিং, বিশাল জলাধার নির্মাণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। ভারত যখন রাজনৈতিক অজুহাতে পানি আটকে দিচ্ছে, চীন তখন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই সংকট সমাধানের পথ দেখাচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি এই পথে হাঁটে, তবে তা হবে দেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষার একটি সাহসী পদক্ষেপ।

📊 পানি সংকট ও মহাপরিকল্পনার তুলনামূলক চিত্র
বিষয় ভারতের অবস্থান/প্রভাব চীনের প্রস্তাব/বিকল্প সমাধান
পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহা ও দীর্ঘসূত্রতা। নদী খনন ও জলাধার নির্মাণে গুরুত্ব।
অর্থনৈতিক প্রভাব শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি ও বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি। জিডিপি (GDP) ১% বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা।
কৌশলগত নীতি দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক সম্পর্কের দোহাই। কারিগরী ও অবকাঠামোগত স্বনির্ভরতা।
“জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প পথে হাঁটার সময় এখনই।”

ভারতের পানি রাজনীতি এখন আর কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভারত যেভাবে পানি নিয়ন্ত্রণ করছে, তাতে বাংলাদেশের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। চীনের পথে হেঁটে যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা কেবল উত্তরবঙ্গকে রক্ষা করবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন একটি দৃঢ় জাতীয় নীতি এবং ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ পলিসি থেকে বেরিয়ে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পলিসি গ্রহণ করা। পানির প্রতিটি ফোঁটার হিসাব বুঝে নিতে এখন প্রযুক্তির সঙ্গে কূটনীতির সঠিক সমন্বয় অপরিহার্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category