ভোর চারটায় যখন পুরো শহর ঘুমে বিভোর, তখন এক বুক আশা নিয়ে মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার নিয়ে বের হন হাজার হাজার রাইড শেয়ারিং চালক। কিন্তু সেই আশা এখন রূপ নিয়েছে হতাশায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রভাবে রাজধানীর পাম্পগুলোতে তেলের জন্য কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। এই সংকটের সরাসরি বলি হচ্ছেন তারা, যাদের আয়ের একমাত্র উৎস রাইড শেয়ারিং।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পগুলোতে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে চালকদের। আগে যেখানে একজন চালক দিনে ১০-১২ ঘণ্টা রাইড দিয়ে অনায়াসেই ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় করতে পারতেন, এখন তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ফলে কার্যকর কাজের সময় কমে আসায় তাদের দৈনন্দিন আয় নেমে এসেছে অর্ধেকে।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একজন পেশাদার চালকের সারা দিনের রাইডিংয়ের জন্য যেখানে ৪-৫ লিটার তেলের প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য তেল মিলছে। এতে কয়েকটা ছোট ট্রিপ দিতেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং পুনরায় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে সরাসরি যাত্রী সেবার ওপর। উবার বা পাঠাও-এর মতো অ্যাপগুলোতে রাইড রিকোয়েস্ট আসলেও অনেক চালক তা গ্রহণ করতে পারছেন না স্রেফ জ্বালানি নেই বলে। আবার অনেকে জ্বালানি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় কল পেলেও যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই রাইড বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফলে চালক ও যাত্রী—উভয় পক্ষই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
রাইড শেয়ারিং করে যারা সংসার চালান, তাদের অবস্থা এখন সবচেয়ে শোচনীয়। বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এবং নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম মেটাতে গিয়ে তারা এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এমনকি গেল ঈদুল ফিতরেও অনেক চালক পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কেনা তো দূরে থাক, ঠিকমতো সেমাই-চিনির ব্যবস্থাও করতে পারেননি। অনেকের মতে, কয়েক বছর ধরে এই পেশায় থাকলেও এবারের মতো সংকট তারা আগে কখনো দেখেননি।
বিশেষ করে যারা কিস্তিতে বা লোন নিয়ে গাড়ি বা মোটরসাইকেল কিনেছেন, তাদের অবস্থা আরও করুণ। আয়ের সিংহভাগ লোনের কিস্তি দিতেই চলে যাচ্ছে, ফলে পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সংকট কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানি বা বৈদ্যুতিক যানের প্রসারে জোর দেওয়ার দাবি তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। আপাতত সরকারি পর্যায় থেকে জ্বালানি আমদানির নতুন চুক্তির খবর পাওয়া গেলেও মাঠ পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে। ততক্ষণ পর্যন্ত রাজপথের এই ‘যোদ্ধাদের’ জীবন কাটবে তেলের লাইনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তায়।