দেশের বিদ্যুৎ খাত এক নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা বকেয়া বিলের পরিমাণ এবার ৫০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝায় পিষ্ট হয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো (আইপিপি) এখন উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। একদিকে ডলার সংকটে জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা না করলে আসন্ন তীব্র গরমে দেশব্যাপী ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে পারে সাধারণ মানুষ।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমানে মার্চ মাসের বিল জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, মার্চের বিল যুক্ত হলে এই অংক আরও অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ বকেয়ার পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকা স্পর্শ করতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই বিল পরিশোধে অনিয়ম শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু অর্থ পরিশোধ করে বকেয়া তিন মাসের সমপরিমাণে নামিয়ে আনা হয়েছিল, কিন্তু গত বছরের জুলাই থেকে পরিস্থিতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বর্তমানে পাওনা বিল ৮ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত বকেয়া পড়ে আছে।
দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে বেসরকারি খাতের ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রের বকেয়া পাওনাই প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। পাওনা টাকা না পাওয়ায় এই কোম্পানিগুলো নতুন করে ফার্নেস অয়েল আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে পারছে না।
এ বিষয়ে ইউনাইটেড গ্রুপের হেড অব রেগুলেটরি শামীম মিয়া বলেন, “বিপিডিবির কাছ থেকে বকেয়া অর্থ না পাওয়ায় ব্যাংক এখন আর নতুন করে এলসি দিচ্ছে না। প্রতিটি কোম্পানির সম্পদের ওপর ভিত্তি করে ঋণের একটি সীমা (এলসি লিমিট) থাকে। ঋণের দায় বাড়ছে কিন্তু আয় নেই, ফলে ব্যাংকগুলো আমাদের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। জ্বালানি আমদানির অর্থ না থাকলে আমরা চাইলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব না।”
একই সুর শোনা গেছে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাতের কণ্ঠে। তিনি জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর হাতে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুদ আছে, তা দিয়ে খুব বেশিদিন কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়। এখন যদি সরকার অর্থ ছাড় করে, তবে সেই তেল আমদানি হয়ে দেশে পৌঁছাতে মে মাসের মাঝামাঝি সময় লেগে যাবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা এখন ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রেশনিং করার কথা ভাবছেন।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে গড় উৎপাদন প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এই ৪ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি মেটানোই হবে বিপিডিবির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিক সময়ে যদি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে যায়, তবে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও আগের চেয়ে অনেক বেশি। এই বহুমুখী চাপ সামাল দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা বিপিডিবির নেই।
বিদ্যুৎ খাতের এই দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে এখন সরকারের কাছে অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অর্থ বিভাগের কাছে পাঠানো এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন উৎপাদন ইউনিটগুলোর বিল পরিশোধ এবং প্রাথমিক জ্বালানি (কয়লা, গ্যাস, তেল) ক্রয়ের ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে বর্তমানে যে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়। এর সঙ্গে মাসিক আরও ২ হাজার কোটি টাকা করে বাড়তি ভর্তুকি প্রয়োজন।
তবে এখানে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত। আইএমএফ বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে। যার ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ৬২ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। একদিকে ভর্তুকি কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে—এই বিপরীতমুখী চাপে বিদ্যুৎ খাত এখন দিশেহারা।
বিদ্যুৎ খাতের এই বকেয়া সমস্যার ঢেউ এখন আছড়ে পড়ছে দেশের ব্যাংকিং খাতেও। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এখন সরকার বিল পরিশোধ না করায় কোম্পানিগুলো ব্যাংকের কিস্তি দিতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া দিন দিন বাড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ ছাড় না হলে ব্যাংক খাতের সংকট আরও ঘনীভূত হবে। দ্রুত আলোচনা করে এই বকেয়া কমানোর ব্যবস্থা না নিলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, তারা নিয়মিতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে কিছু আইনি জটিলতা (এলডি বা লিকুইডেটেড ড্যামেজ সংক্রান্ত মামলা) বর্তমানে আদালতে চলমান। আদালতের নির্দেশনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অর্থের হিসাব-নিকাশ মেলাতে সময় লাগছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ভর্তুকির অর্থ পাওয়া গেলেও মার্চের অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তারা।
বকেয়া বিলের এই সংস্কৃতি গত সরকারের আমলের একটি নেতিবাচক উত্তরাধিকার। ২০২৪ সালের মে মাসেও বকেয়া ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। তখন সরকার নগদ টাকা দিতে না পেরে ব্যাংকগুলোর অনুকূলে ‘বিশেষ বন্ড’ ইস্যু করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। কিন্তু সেই বন্ডের অর্থ দিয়ে সব পাওনা মেটানো সম্ভব হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে এই বিশাল ঋণের বোঝা কাঁধে নিলেও ডলারের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি আমদানির চাপে তারা হিমশিম খাচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত হবে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ৬০ শতাংশ বকেয়া পরিশোধ করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জ্বালানি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া। এছাড়া জ্বালানি মিশ্রণে (Fuel Mix) পরিবর্তন এনে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান নেই।
অন্যথায়, এবারের চৈত্র-বৈশাখের দাবদাহে কেবল তেলের অভাবে লোডশেডিংয়ের অন্ধকার দেখতে হবে দেশবাসীকে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও উসকে দিতে পারে।
একনজরে সংকট চিত্র (সংক্ষিপ্ত বিবরণী):
মোট বকেয়া: ৫০,৩০০ কোটি টাকা (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত)।
অতিরিক্ত ভর্তুকি চাহিদা: ২০,১৩৬ কোটি টাকা।
আইপিপি বকেয়া: ১৪,০০০ কোটি টাকা (তেলভিত্তিক কেন্দ্র)।
গ্রীষ্মের চাহিদা: ১৮,০০০ মেগাওয়াট।
ঝুঁকি: জ্বালানি আমদানিতে ব্যর্থতা ও ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়া।