পকেটে রাখা একটি সাধারণ কলম যে প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র হতে পারে, তা ভাবাটাও সাধারণ মানুষের জন্য দুষ্কর। কিন্তু বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ‘পেন গান’ (Pen Gun) বা কলম-পিস্তল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে অত্যন্ত সহজ ও টার্গেট কিলিংয়ের জন্য নিখুঁত এই ক্ষুদ্র মারণাস্ত্র এখন দুর্ধর্ষ চরমপন্থি এবং মাদক সিন্ডিকেটের হাতে পৌঁছে গেছে। সম্প্রতি রাজধানীতে প্রথমবারের মতো এই অস্ত্র উদ্ধারের পর নড়েচড়ে বসেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
দেখতে হুবহু সাধারণ লেখার কলমের মতো এই যন্ত্রটি আসলে একটি এক রাউন্ডের ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র। এর ক্লিপ সদৃশ অংশটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। আকারে ছোট হওয়ায় এটি পকেটে, ব্যাগে বা কলমদানিতে সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়। ফলে তল্লাশির সময় পুলিশের হাত থেকে পার পাওয়া সন্ত্রাসীদের জন্য সহজ হয়ে পড়েছে। গোয়েন্দাদের মতে, খুব কাছ থেকে এই অস্ত্র দিয়ে গুলি করলে লক্ষ্যবস্তুর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।
রাজধানীর তাঁতীবাজারের প্রসন্ন পোদ্দার লেনে গত মঙ্গলবার মো. রাসেল নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায় একদল সন্ত্রাসী। এই মামলার তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সোহেল ওরফে কাল্লু ও সাইমন হোসেন নামে দুইজনকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকেই উদ্ধার করা হয় দেশের ইতিহাসে প্রথম ‘পেন গান’। গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে যে, এই কলম-পিস্তল দিয়েই তারা রাসেলকে গুলি করেছিল। বর্তমানে ওই ব্যবসায়ী সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই ক্ষুদ্র মারণাস্ত্রের প্রধান উৎস পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। বিশেষ করে ভারতের ছত্তিশগড়ের মাওবাদী বিদ্রোহীদের নিজস্ব কারিগরি দল এসব পেন গান তৈরি করে থাকে। যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্ত দিয়ে এসব অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। খুলনা অঞ্চলের এক সময়ের দুর্ধর্ষ চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়াকে ২০২৪ সালে সাভার থেকে গ্রেফতারের পর প্রথম এই অস্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পায় পুলিশ। শিমুল ভূঁইয়ার মোবাইলে পেন গানের ভিডিও পাওয়া গিয়েছিল এবং তিনি জানিয়েছিলেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই অস্ত্রের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। শুধু পেশাদার অপরাধী নয়, অনেক অসাধু রাজনৈতিক নেতাও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নামে এই গোপন অস্ত্র কিনতে আগ্রহী।
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া কাল্লু জানিয়েছেন, একটি পেন গানের দাম বাজারে প্রায় ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। প্রতিটি বিক্রিতে কাল্লুর মতো মধ্যস্বত্বভোগীরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়। তাঁতীবাজারের ঘটনার দিন অভিযুক্তরা ইয়াবা সেবন করে পরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়ী রাসেলকে ডেকে এনে বুকের দিকে পেন গান তাক করে গুলি চালায়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্মকমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম এই অস্ত্রটিকে ‘সম্পূর্ণ ইউনিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “অপরাধীরা এই ধরনের অস্ত্র আগে ব্যবহার করেছে এমন নজির আমাদের কাছে নেই। এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। আমরা এর রুট এবং এর পেছনের মূল হোতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”
উদ্ধারকৃত পেন গানটি বর্তমানে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এর কার্যকারিতা, কত দূর থেকে এটি নিখুঁত আঘাত হানতে পারে এবং এর যান্ত্রিক গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে কলমসদৃশ পিস্তল দিয়ে গুলি করার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন, অপরাধী চক্রের হাতে আরও বিপুল পরিমাণ পেন গান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাজধানী ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের আস্তানায় এই মারণাস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।